পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশ মোতায়েন, (ডানে) পুলিশ ভ্যানে অগ্নিসংযোগ
পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনে পুলিশ মোতায়েন, (ডানে) পুলিশ ভ্যানে অগ্নিসংযোগ। নয়া দিগন্ত

ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণসহ বিভিন্ন দাবিতে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ক্রমেই সহিংস রূপ নিচ্ছে। শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনে অনুপ্রবেশকারীদের তৎপরতায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

Advertisement

সোমবার (২ নভেম্বর) আন্দোলন চলাকালে পুলিশের একটি ভ্যানে অগ্নিসংযোগ, পুলিশের দু’টি গাড়িসহ শতাধিক যানবাহন ভাঙচুর এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েনের পাশাপাশি ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া গতকাল রোববার থেকে আজ সোমবার পর্যন্ত আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ৩০ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

সোমবার সকালে কালিয়াকৈরের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় প্রায় এক থেকে দেড় হাজার শ্রমিক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন। এতে মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

এছাড়া ভোগড়া, সফিপুর, কোনাবাড়ী, মালেকের বাড়ি ও নাওজোরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নাওজোর এলাকায় পুলিশের একটি ভ্যানে আগুন দেয় বিক্ষোভকারীরা। কালিয়াকৈরেও একটি কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগের খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে।

এদিকে আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সোমবার নাওজোর এলাকায় হামলার শিকার হয়েছেন যমুনা টেলিভিশনের একজন রিপোর্টার ও ক্যামেরাম্যান।

অভিযোগ রয়েছে, সাংবাদিকদের দেখলেই আন্দোলনে অনুপ্রবেশকারীদের একটি অংশ তাদের ওপর চড়াও হচ্ছে। অন্যদিকে শ্রমিক নন এমন যুবক ও কিশোরদের ১৫ থেকে ২০ জনের দল বিভিন্ন বন্ধ কারখানায় গিয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সোমবার কালিয়াকৈরের পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় হামলায় আহত এক বিজিবি সদস্যকে উদ্ধার করে গাড়িতে তুলে হাসপাতালে নিতে দেখা গেছে। এদিকে আন্দোলনকারীদের সহিংসতা ও হামলার ঘটনায় শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২, গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকরা জড়ো হয়ে আন্দোলনের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এ সময় পুলিশের একটি ভ্যানে অগ্নিসংযোগ ও বিভিন্ন যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।

তিনি আরো জানান, গতকাল থেকে এ পর্যন্ত আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ৩০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ততা ও দলীয় পরিচয় যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। নাওজোরে পুলিশের ভ্যানে আগুন দেয়ার ঘটনায় ঘটনাস্থল থেকে একজনকে আটক করা হয়েছে।

গাজীপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো: নূরুল করিম ভূঁইয়া জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলায় ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। ২১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

এদিকে শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে সরকার, বিজিএমইএ, গার্মেন্টস মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে আলোচনায় ঐকমত্য হয়েছে বলে জানিয়েছেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: শওকত হোসেন সরকার।

তিনি বলেন, গতকাল নতুন মজুরি কমিশন গঠন করা হয়েছে। আগামী জানুয়ারি থেকে বর্ধিত বেতন কার্যকর হওয়ার আশা করা হচ্ছে। গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংস ও অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কিছু দুষ্কৃতকারী তৎপরতা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তার দাবি, বিদেশী ইন্ধনে কিছু লোক কারখানায় গিয়ে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে শ্রমিকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।

সিটি প্রশাসক শ্রমিকদের ধৈর্য ধারণ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, শ্রমিকদের দাবির সাথে তিনিও একমত এবং সরকার এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। গার্মেন্টস শিল্প সচল থাকলে শ্রমিক ও দেশ উপকৃত হবে।

অন্যদিকে মহাসড়কে বিশৃঙ্খলা ও জনদুর্ভোগ ঠেকাতে ভোগড়া বাইপাস থেকে নাওজোর পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছেন বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। গাজীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে একদল নেতাকর্মী মহাসড়কের পাশে অবস্থান নেন।

অন্যদিকে মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকারের নেতৃত্বে কোনাবাড়ী ও কাশিমপুর এলাকাতেও নেতাকর্মীরা অবস্থান করেন।

গাজীপুর মেট্রো বাসন থানা বিএনপির সভাপতি তানভীর সিরাজ বলেন, যানবাহন চলাচল সচল রাখা, যাত্রীদের দুর্ভোগ কমানো এবং বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে তারা মাঠে রয়েছেন।

এর আগে, রোববার সকাল থেকে কালিয়াকৈরের মৌচাক, সফিপুর, চন্দ্রা ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে হাজার হাজার শ্রমিক মহাসড়কে অবস্থান নিলে প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ থাকে। দুপুর আড়াইটার দিকে পুলিশ ও বিজিবির তৎপরতায় যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

ওই দিন পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় কয়েকটি কারখানার ফটকে ভাঙচুর, একটি কারখানার গুদামে অগ্নিকাণ্ড, মৌচাকে ট্রাফিক পুলিশ বক্স ও কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে পুলিশ বক্স ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। আনসার অ্যাকাডেমির সামনে পুলিশের একটি পিকআপ ভ্যানে আগুন দেয়া হয়। সংঘর্ষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, শ্রমিক ও সাংবাদিক আহত হন।

আন্দোলনের প্রভাবে রতনপুর, কোনাবাড়ী ও কাশিমপুরসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়। শিল্প পুলিশের হিসাবে, রোববার দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত গাজীপুরে ১০০টি পোশাক কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।

অন্যদিকে বিজিএমইএর হিসাবে, ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুর ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল মিলিয়ে ছুটির আওতায় আসে ৫২৯টি কারখানা।

শ্রমিকদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত কাজের সুযোগ কমে যাওয়ায় আয়ও কমেছে। এ অবস্থায় মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, চাকরিচ্যুত শ্রমিকদের পুনর্বহাল এবং শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে রোববার সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেয়।