
গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান আন্দোলনে এবার সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
রোববার (১ নভেম্বর) কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় দীপ্ত টেলিভিশনের জেলা প্রতিনিধি জাহাঙ্গীর আলমের ওপর হামলা চালিয়ে তার ক্যামেরাসহ ব্যাগে থাকা মালামাল ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে শ্রমিকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় জেলা সাংবাদিক নেতারা নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
একইদিন শ্রমিকদের সাথে সংঘর্ষে পুলিশের আট থেকে ১০ জন সদস্য আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার। দিনভর অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় গাজীপুরের শতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করে। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় শ্রমিকদের সড়ক থেকে সরিয়ে নেয়া হলে যান চলাচল ও নাগরিক জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হয়।
এদিকে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবিকে পুঁজি করে কোনো মহল যাতে শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যকরী সভাপতি মো: সালাহ উদ্দিন সরকার।
তিনি বলেন, ‘পোশাকশ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি যৌক্তিক। শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান করতে হবে। তবে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিকে পুঁজি করে কোনো মহল যেন শিল্পাঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি, কারখানা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা সাংবাদিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার সুযোগ না পায়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও দাবি আদায়ের অধিকার রয়েছে। একইসাথে শিল্পকারখানা, কর্মসংস্থান ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে সহিংসতা পরিহার করতে হবে।’ শ্রমিকদের বিভ্রান্ত না হয়ে সতর্ক থাকার এবং কোনো উসকানিতে পা না দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
রোববার সকাল থেকে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে মৌচাক, সফিপুর ও চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেন তারা। পরে রতনপুর, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, ভোগড়া বাইপাস ও বোর্ডবাজারসহ আশপাশের এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। হাজারো শ্রমিক সড়কে অবস্থান নেয়ায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে সীমাহীন দুর্ভোগে পড়েন যাত্রীরা।
অবরোধ চলাকালে কালিয়াকৈর পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় যমুনা ব্যাংক ও কয়েকটি কারখানার ফটকে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। মৌচাকের কাতার এলাকায় ট্রাফিক পুলিশের বক্স ভাঙচুর ও মালামাল লুটের অভিযোগ পাওয়া যায়। কোনাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচে পুলিশের বক্সে আগুন দেয়া হয়। আনসার অ্যাকাডেমির সামনে পুলিশের একটি গাড়িতেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
এদিকে কালিয়াকৈরের চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ট্রপিক্যাল নিটেক্স লিমিটেডের ঝুটের গুদামে আগুন লাগে। অবরোধ ও যানজটের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। পরে বিজিবি ও পুলিশের সহায়তায় ফায়ার সার্ভিসের একটি ইউনিট সেখানে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
আগুনের সূত্রপাত কিভাবে হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কেউ আগুন দিয়েছে কি-না, সেটিও নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ।
শ্রমিক আন্দোলনে রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের কিছু নেতাকর্মী শ্রমিকদের সাথে মিশে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেয়ার চেষ্টা করেছেন।
বিভিন্ন ভুয়া ও বেনামি ফেসবুক আইডি থেকে উসকানিমূলক পোস্ট দিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। এসব পোস্টে ‘খেলা শুরু হয়ে গেছে’ এমন বক্তব্য ছড়ানোর কথা জানা গেছে।
গাজীপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির মোরলের নামেও উসকানিমূলক স্ট্যাটাস দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। অভিযুক্তদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যান। শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের দেশে ফেরার পরিকল্পনা এবং আগামী ডিসেম্বরকে ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতার কথাও আলোচনায় এসেছে।
বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে নভেম্বর থেকে দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনার অভিযোগ উঠেছে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের আন্দোলনও এ পরিকল্পনার লক্ষ্য হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে শ্রমিকদের কোনো ধরনের উসকানিতে পা না দিয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি ও আন্দোলনে রাজনৈতিকভাবে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগকে পৃথকভাবে বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলেও শ্রমিক সংগঠনগুলো মনে করে।
শিল্প পুলিশ-২ গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন জানান, শ্রমিকদের সাথে সংঘর্ষে পুলিশের আট থেকে ১০ জন সদস্য আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে এবং শ্রমিকদের বুঝিয়ে সড়ক থেকে সরানোর চেষ্টা চালায়। পরে বিজিবি ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় বিভিন্ন স্থান থেকে শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়া হয়।
শিল্প পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, বোর্ডবাজার, কোনাবাড়ী, শফিপুর ও চন্দ্রাসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে শ্রমিকরা সড়কে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন গাজীপুরের সব সড়ক যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত। বিভিন্ন কারখানার গেট ভাঙচুরের চেষ্টা ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা থেকেও শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে। শ্রমিকরা যার যার মতো ঘরে ফিরে গেছেন। যান চলাচল ও নাগরিক জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রয়েছে।
তার দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এদিন গাজীপুরের শতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছিল।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো: নুরুল করিম ভূঁইয়া জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এক সপ্তাহের জন্য পাঁচ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বাহিনী মাঠে থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে কাজ করেছে।
শ্রমিকদের দাবি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বর্তমান মজুরিতে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। পাশাপাশি ওভারটাইমের সুযোগ কমে যাওয়ায় তাদের আয়ও কমেছে। এ অবস্থায় ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নিলেও আন্দোলন অব্যাহত ছিল।
গতকাল শনিবারও চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ ও আনসার অ্যাকাডেমির ৩ নম্বর গেট এলাকায় দীর্ঘ সময় মহাসড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








