
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল লঞ্চ টার্মিনালে মুকবিল-২ লঞ্চ থেকে নামার সময় মেঘনা নদীতে পড়ে নিখোঁজ হওয়া সেই অজ্ঞাত যুবকের পরিচয় মিলেছে। তার নাম রবিন। নদীতে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া তার ব্যাগে থাকা মোবাইলফোনের সিম কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করে পরিচয় শনাক্ত করে বেলতলী নৌ-পুলিশ।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে চাঁদপুরগামী মকবুল-২ লঞ্চটি ষাটনল লঞ্চঘাটে যাত্রী নামাচ্ছিল। এ সময় আনুমানিক ৩০ বছর বয়সী রবিন লঞ্চ থেকে নামেন। পরে নিজের ব্যাগ লঞ্চে রেখে যাওয়ার কথা মনে পড়ে আবার লঞ্চে ওঠেন।
পরে ফের লঞ্চ থেকে নামার সময় লঞ্চটি পেছনের দিকে চালিয়ে দেয়া হলে ঘাটে লাফ দিয়ে নামার চেষ্টা করেন রবিন। এ সময় তিনি মেঘনা নদীতে পড়ে নিখোঁজ হন। ঘটনার পর মকবুল-২ লঞ্চটি মোহনপুর লঞ্চঘাটে চলে যায়। পরে মোহনপুর নৌ-পুলিশ লঞ্চটিসহ দুই স্টাফকে আটক করে। আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন মোহনপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো: রুহুল আমিন।
এদিকে, নিখোঁজ রবিনের পরিচয় শনাক্ত করতে গিয়ে নদীতে ভাসমান অবস্থায় তার ব্যাগ পাওয়া যায়। ব্যাগের ভেতর থাকা মোবাইলফোনের সিম কার্ড অন্য একটি ফোনে সেট করে বেলতলী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি থেকে একটি নম্বরে যোগাযোগ করা হয়। কলটি রিসিভ করেন রবিনের স্ত্রী নাসরিন আক্তার।
তিনি জানান, নম্বরটি তার স্বামী রবিনের। পরে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর নৌ-পুলিশ তার স্ত্রীকে ঘটনাটি জানায় এবং সান্ত্বনা দেয়। স্বামীর নিখোঁজের খবর পেয়ে আহাজারি করতে করতে ষাটনল লঞ্চঘাটে ছুটে আসেন নাসরিন। সেখানে স্বামীর সন্ধানে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিখোঁজ রবিনের জন্মস্থান শরীয়তপুর। বর্তমানে তিনি নারায়ণগঞ্জে মা-বাবার সাথে বসবাস করছেন। তার শ্বশুরবাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার বাগানবাড়ী ইউনিয়নের নবীপুর গ্রামের মোল্লা বাড়িতে। রবিনের সাড়ে চার বছর বয়সী একটি মেয়েসন্তান রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সৈকত বলেন, লঞ্চ চালকদের ভুলের কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ষাটনল লঞ্চঘাটে আগে এমন ঘটনা ঘটেনি উল্লেখ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান তিনি। লঞ্চযাত্রীরাও যাত্রী ওঠা-নামার সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
ষাটনল লঞ্চঘাটের ইজারাদার মো: ইমন জানান, ঘটনার পরপরই বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছে এবং নিখোঁজ যুবকের সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা চলছে।
বেলতলী নৌ-পুলিশের ইনচার্জ মোজাম্মেল হক জানান, নিখোঁজ যুবকের সন্ধানে নৌ-পুলিশ ও স্থানীয়দের সহায়তায় নদীতে উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।
নিখোঁজ যুবকের সন্ধানে বেলতলী নৌ-পুলিশ, মোহনপুর নৌ-পুলিশ ও মতলব উত্তর থানা পুলিশের সদস্যরাও স্থানীয়দের সহায়তায় নদীতে তৎপরতা চালান।
এদিকে, ঘটনার প্রায় ৪৫ মিনিট পর দুপুর পৌনে ১২টায় খবর পায় চাঁদপুর নদী ফায়ার সার্ভিস। এরপর আবহাওয়া ও নদীর পরিস্থিতির কারণে সড়কপথে ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয় ফায়ার সার্ভিসের দল। নিখোঁজের প্রায় তিন ঘণ্টা পর চাঁদপুর বিআইডব্লিউটিএ ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে।
চাঁদপুর বিআইডব্লিউটিএর সহকারী পরিচালক সঞ্জয় দেবনাথ জানান, খবর পাওয়ার পর চাঁদপুর থেকে ডুবুরি দল নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। নদীতে স্রোত থাকায় প্রয়োজনে ভাটির দিকেও তল্লাশি চালানোর কথা জানান তিনি।
চাঁদপুর নদী ফায়ার স্টেশনের স্টেশন অফিসার মো: রাকিবুল ইসলাম জানান, দুপুর পৌনে ১২টায় নিখোঁজের খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। আবহাওয়া প্রতিকূল থাকায় কিছুটা বিলম্ব হলেও পরিস্থিতি অনুকূলে আসার পর ডুবুরি দল উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করে।
ঘটনার খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি ঘটনাস্থল ষাটনল লঞ্চঘাট পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, বিষয়টি জানার পর আমি বিকেলে ঘটনাস্থলে এসেছি। নৌ-পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলের সাথে কথা বলেছি। নিখোঁজ যুবককে উদ্ধারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
তবে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে উদ্ধার অভিযান চালিয়েও রবিনের কোনো সন্ধান পাননি ডুবুরিরা। একদিকে মিলেছে নিখোঁজ যুবকের পরিচয়, অন্যদিকে স্বামীকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় ষাটনল ঘাটে আহাজারি করছেন স্ত্রী নাসরিন আক্তার।








