শেখ রবিউল আলম, নৌ-পরিবহনমন্ত্রী, বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি, বিশ্ব নৌ-দিবস, সামুদ্রিক খাত, চট্টগ্রাম বন্দর, মেরিটাইম সেক্টর
মেরিন একাডেমির অনুষ্ঠানে নৌ-মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশের সামুদ্রিক খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও এ খাত এখনো সম্ভাবনার শতভাগ কাজে লাগাতে পারেনি বলে মন্তব্য করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

Advertisement

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বাংলাদেশ মেরিন একাডেমিতে বিশ্ব নৌ-দিবস ও প্রতিষ্ঠানটির ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশ জলভাগ। এই বিশাল জলভাগকে ঘিরে বিশ্ব অর্থনীতি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের বড় একটি অংশ পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশেরও সামুদ্রিক খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। দক্ষতা, সাহস ও বিশেষ জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে এ সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।

তিনি বলেন, দেশে মেরিন একাডেমি, নৌ-পরিবহন অধিদফতর, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, বন্দর কর্তৃপক্ষ, বিআইডব্লিউটিএ ও বিআইডব্লিউটিসিসহ প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ঘাটতি না থাকলেও প্রত্যাশিত অর্জন নিশ্চিত করা যায়নি। কেন কাঙ্ক্ষিত অর্জন হচ্ছে না, তা নিয়ে নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, ‘যত সম্ভাবনা থাকার পরও আমাদের দেশে এই খাতটি সম্ভাবনার শতভাগে বিকশিত হয়েছে বলে আমি মনে করি না। যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল, আমরা সেটা কাজে লাগাতে পারিনি। তবে পারিনি বলে পারবো না—এভাবে আর ভাবছি না। আমরা এগিয়ে যেতে চাই।’

সামুদ্রিক খাতের বিভিন্ন অসংগতির বিষয়ে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি কিছু অসংগতি সম্পর্কে জেনেছেন ও চিহ্নিত করেছেন। এসব সমস্যা দ্রুত দূর করতে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সহযোগিতার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, জাহাজ পরিচালনা, ব্যবস্থাপনা ও বাণিজ্য বিষয়ে অভিজ্ঞ সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর ও চীনের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। তাদের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। দেশের সামুদ্রিক খাতের উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব আরো বাড়ানো প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বন্দরের প্রসঙ্গ তুলে শেখ রবিউল আলম বলেন, বন্দর ও কনটেইনার ব্যবস্থাপনায় আরো দক্ষতা প্রয়োজন। কনটেইনার পরিচালনা ও বন্দর ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করে সেবার মান বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চট্টগ্রামকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বন্দরকেও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে।

তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি পরস্পরের সাথে যুক্ত হচ্ছে এবং দেশে বিদেশী বিনিয়োগও আসছে। এ অবস্থায় সেবার মান ও দক্ষতা বাড়াতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি সম্ভব হবে না। তাই সামুদ্রিক খাতে আরো মনোযোগ ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

মেরিন ক্যাডেটদের প্রশিক্ষণ শেষে জাহাজে ওঠার সুযোগের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার বিষয়েও কথা বলেন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী।

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করে এসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়া হবে। বাংলাদেশী মেরিনারদের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের সুযোগ আরো বাড়ানোর বিষয়েও কাজ করা হবে।

তিনি আরো বলেন, সামুদ্রিক বাণিজ্য ও বিশ্ব অর্থনীতির বিশাল অংশ দক্ষ মেরিনারদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে মেরিটাইম খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতে সরকারের আরো বেশি মনোযোগ ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি দক্ষ ক্যাডেট তৈরি করে আসছে। দেশ-বিদেশের মেরিটাইম খাতে একাডেমির প্রশিক্ষিত লোকবল গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। চট্টগ্রামের জন্য এ প্রতিষ্ঠান ঐতিহ্য ও গৌরবের প্রতীক। আধুনিক যন্ত্রপাতি, অবকাঠামো ও সরকারি সহযোগিতার মাধ্যমে একাডেমিকে আরো আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ মেরিন একাডেমিকে সমুদ্র ও বন্দরভিত্তিক অর্থনীতির একটি শক্তিশালী মেরিটাইম হাব হিসেবে গড়ে তুলতে সবাইকে আরো সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। একাডেমির ক্যাডেটরা দেশের বাইরে যেখানেই দায়িত্ব পালন করবেন, সেখানেই বাংলাদেশের পরিচয় ও মর্যাদা বহন করবেন। পরিবর্তিত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করাই আমাদের প্রত্যাশা।

বাংলাদেশ মেরিন একাডেমির কমান্ড্যান্ট ক্যাপ্টেন কাজী এবিএম শামীম স্বাগত বক্তব্যে বলেন, নীতি থেকে বাস্তবায়ন এবং সম্ভাবনা থেকে উৎকর্ষের পথে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমেই বাংলাদেশের সামুদ্রিক সম্ভাবনাকে টেকসই অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব। তিনি দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নিরাপদ নৌ-চলাচল, পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়াসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন। এছাড়া বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মহাপরিচালক কমান্ডার মো: শফিউল বারীসহ ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, মেরিটাইম খাতের বিশিষ্ট ব্যক্তি, সরকারি কর্মকর্তা, প্রশিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, ক্যাডেট ও আমন্ত্রিত অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন।

দিবসটি উপলক্ষে ক্যাডেটদের অংশগ্রহণে প্রধান অতিথিকে গার্ড অব অনার প্রদান, প্যারেড পরিদর্শন, র‌্যালি, বেলুন উড্ডয়ন, বিনোদন পাহাড়ে বৃক্ষরোপণ এবং আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এবারের বিশ্ব নৌ-দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল-‘নীতি থেকে বাস্তবায়ন : সামুদ্রিক উৎকর্ষের পথে অগ্রযাত্রা’। প্রতিপাদ্যের আলোকে সামুদ্রিক নীতিমালা ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে নিরাপদ, দক্ষ, টেকসই ও উৎকর্ষভিত্তিক সামুদ্রিক খাত গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি দীর্ঘ ৬৪ বছর ধরে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন সামুদ্রিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে আসছে। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় জুলদিয়ায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ করে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

একাডেমির প্রশিক্ষিত পাঁচ হাজারের বেশি মেরিনার বর্তমানে দেশী-বিদেশী বাণিজ্যিক জাহাজ ও বিশ্বের বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ও ঊর্ধ্বতন পদে কর্মরত রয়েছেন। তাদের অর্জিত বৈদেশিক আয় ও প্রেরিত অর্থ দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পাশাপাশি ১২৫ জনের বেশি নারী মেরিনার প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে দেশী-বিদেশী বাণিজ্যিক জাহাজে দায়িত্ব পালন করছেন।