
সারের জন্য কৃষকের দীর্ঘ লাইন। কোনো ডিলারের দোকানে সার আছে, আবার কোথাও গিয়ে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে কৃষককে। কোথাও বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ, কোথাও আবার সার মজুত করে রাখার অভিযোগ। সার নিয়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভের পাশাপাশি মহাসড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে। প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতির পুরোপুরি উন্নতি হয়নি।
এমন পরিস্থিতিতে সার বিক্রির পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনতে ‘পবা সার ডটকম’ নামে একটি ওয়েবসাইট চালু করেছে রাজশাহীর পবা উপজেলা প্রশাসন। ওয়েবসাইটটির ঠিকানা pabasaar.com।
এর মাধ্যমে কোন ডিলারের কাছে কত সার মজুত আছে, কত বিক্রি হয়েছে এবং কত সার অবশিষ্ট রয়েছে— এসব তথ্য অনলাইনে দেখা যাবে। একইসাথে একজন কৃষক কোথা থেকে কত সার কিনেছেন এবং তার জমি ও ফসল অনুযায়ী কত সার পাওয়ার কথা, সেই তথ্যও সংরক্ষণ করা হবে।
উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন কৃষক একাধিক ডিলারের কাছ থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কিনছেন কি-না, তা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। একইসাথে কোনো ডিলারের কাছে সার থাকার পরও তিনি ‘সার নেই’ বলে কৃষককে ফিরিয়ে দিচ্ছেন কি-না, সেটিও যাচাই করা যাবে।
পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: ইবনুল আবেদীনের উদ্যোগে তৈরি হয়েছে ওয়েবসাইটটি। কারিগরি সহায়তায় রয়েছে সিল্কোরা কনসালটেন্সি লিমিটেড। ইতোমধ্যে ডিলারসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এ ব্যবস্থার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
ইউএনও মো: ইবনুল আবেদীন বলেন, ‘বাজারে সার থাকার পরও কেন সঙ্কট তৈরি হচ্ছে, তা বুঝতে কৃষক, ডিলার ও কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলা হয়েছে। সেখানে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কেনা ও আগাম মজুতের বিষয়টি সামনে এসেছে।’
তিনি বলেন, ‘একজন কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সার কিনলে অন্য কৃষক তার প্রাপ্য সার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এ কারণে কৃষকের জমির পরিমাণ ও ফসলের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার বিক্রির একটি ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’
সম্প্রতি পবায় অভিযানে এক কৃষকের বাড়ি থেকে ১২৯ বস্তা টিএসপি ও ইউরিয়া সার জব্দ করা হয়েছে বলেও জানান ইউএনও। তার ভাষ্য, ‘ওই কৃষক আলু চাষের জন্য আগাম সার মজুত করেছিলেন। পরে জব্দ করা সার সরকারি নির্ধারিত দামে স্থানীয় কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়। এ ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত ওই কৃষককে জরিমানা করে।’
নতুন ব্যবস্থায় পবার প্রায় ২৫-৩০ জন সার ডিলারের বিক্রির তথ্য একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হবে। কোনো কৃষক জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য দিয়ে সার কিনলে তার কেনার তথ্য সংরক্ষিত থাকবে। ফলে পরবর্তী সময়ে তিনি অন্য কোনো ডিলারের কাছ থেকে কত সার কিনেছেন, সেটিও দেখা যাবে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, এতে একজন কৃষক প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার কিনছেন কি-না, তা শনাক্ত করা সহজ হবে। এমন তথ্য পাওয়া গেলে মাঠপর্যায়ে গিয়ে তা যাচাই করা হবে।
মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের সুপারিশ অনুযায়ী জমির পরিমাণ ও ফসলের ধরন বিবেচনায় নিয়ে সার দেয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার ব্যবহারের প্রবণতা কমার পাশাপাশি মাটির গুণাগুণ রক্ষায়ও সহায়ক হবে বলে আশা করছে উপজেলা প্রশাসন।
ওয়েবসাইটে ডিলারদের জন্য আলাদা পেজ থাকবে। সেখানে কৃষকের নাম, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ঠিকানা, কোন ফসলের জন্য সার নেয়া হচ্ছে এবং কী পরিমাণ সার নেয়া হচ্ছে— এসব তথ্য দিতে হবে। ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপি ও জিপসামসহ বিভিন্ন সারের পরিমাণ দেয়ার পর নির্ধারিত মূল্যে মোট দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এতে নির্ধারিত মূল্যের বাইরে সার বিক্রির সুযোগ কমবে। একইসাথে ডিলারের মজুত, বিক্রি ও অবশিষ্ট সার প্রশাসনের ড্যাশবোর্ডে দেখা যাবে। ফলে কোনো ডিলারের কাছে সার থাকার পরও তিনি ‘সার নেই’ বলে কৃষককে ফিরিয়ে দিচ্ছেন কি-না, সেটিও যাচাই করা সম্ভব হবে।
তবে ব্যবস্থা শুধু অনলাইন তথ্য সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ডিলারের দোকান সরেজমিনে পরিদর্শন করবেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। তাদের জন্য ওয়েবসাইটে আলাদা আইডি থাকবে।
পরিদর্শনের সময় মজুত খাতা ঠিক আছে কি-না, সরকারি মূল্য তালিকা দৃশ্যমান কি-না, নির্ধারিত দামে সার বিক্রি হচ্ছে কি-না, কৃষককে রসিদ দেয়া হচ্ছে কি-না এবং ডিলারের লাইসেন্স ও বরাদ্দপত্র হালনাগাদ আছে কি-না— এসব তথ্য যাচাই করা হবে।
পরিদর্শনের সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবস্থানও সংরক্ষণ করা হবে। এতে তিনি বাস্তবে মাঠে গিয়ে পরিদর্শন করেছেন কি-না, পরে তা যাচাই করা সম্ভব হবে।
ইউএনও জানান, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কাজ কৃষি কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ও ১০ জন ট্যাগ কর্মকর্তা পর্যবেক্ষণ করবেন। এর ওপর উপজেলা প্রশাসনের একটি দল পুরো ব্যবস্থাটি তদারক করবে।
পবা সার ডটকমে চার স্তরের মনিটরিং ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রথম স্তরে কৃষক ও সাধারণ মানুষ কোনো লগইন ছাড়াই ডিলারদের সার মজুত ও মূল্য দেখতে পারবেন। দ্বিতীয় স্তরে ডিলার, সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার প্রতিটি বিক্রি ও মজুতের তথ্য ডিজিটালি সংরক্ষিত হবে।
তৃতীয় স্তরে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে বিক্রি পর্যবেক্ষণ ও পরিদর্শন করবেন। কৃষি কর্মকর্তা ও ট্যাগ কর্মকর্তারা তাদের কাজ তদারক করবেন। চতুর্থ স্তরে উপজেলা প্রশাসন কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ড থেকে পুরো ব্যবস্থাটি পর্যবেক্ষণ করবে।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, এতে সার সরবরাহের শুরু থেকে কৃষকের কাছে বিক্রি পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপের তথ্য এক জায়গায় পাওয়া যাবে। ফলে কোথায় কত সার বরাদ্দ হয়েছে, কত বিক্রি হয়েছে এবং কত সার অবশিষ্ট রয়েছে— তা দ্রুত জানা সম্ভব হবে।
কৃষকদের জন্যও রাখা হয়েছে সরাসরি অভিযোগ জানানোর সুযোগ। এজন্য তাদের আলাদা করে নিবন্ধন বা লগইন করতে হবে না। অভিযোগের সময় কৃষক তার জমির পরিমাণ, আগে সার পেয়েছেন কি-না, চলতি মাসে কত সার প্রয়োজন, কোন ডিলারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং অভিযোগের ধরন উল্লেখ করতে পারবেন।
সার দিতে অস্বীকৃতি, ওজনে কম দেয়া, রসিদ না দেয়া কিংবা বেশি দামে সার বিক্রির মতো অভিযোগ জানানো যাবে। প্রয়োজনে অভিযোগের সাথে ছবিও যুক্ত করা যাবে। ইউনিয়নের নাম দিয়ে কৃষকরা জানতে পারবেন, কোন ডিলারের কাছে কী পরিমাণ সার মজুত রয়েছে।
পবার হরিয়ান ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার মো: সাইদুর রহমান বলেন, কিছু কৃষক জমি না থাকলেও অতিরিক্ত টিএসপি চাওয়ার ঘটনা রয়েছে। নতুন পদ্ধতিতে সার বিক্রির হিসাব অনলাইনে থাকায় ডিলারদের ওপরও চাপ কমবে বলে মনে করেন তিনি। এ কাজে ব্যবহারের জন্য ইতোমধ্যে তিনি মোবাইলফোন কিনেছেন।
তিনি আরো বলেন, সব তথ্য মোবাইলে সংরক্ষিত থাকবে। কেউ এসে জোর করে বেশি সার নিতে পারবেন না। ডিলারদের জন্যও এটি ভালো হবে এবং চাপ কমবে।
পবার কসবা এলাকার কৃষক আকবর আলী বলেন, তাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ডিলারের দোকানে দাঁড়িয়ে সার নিতে হয়েছে। মোবাইলের মাধ্যমে আগে থেকেই কোন ডিলারের কাছে সার আছে, তা জানা গেলে কৃষকদের ভোগান্তি কমবে বলে আশা করেন তিনি।
তবে নতুন এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে তথ্য নিয়মিত ও সঠিকভাবে হালনাগাদ করা এবং মাঠপর্যায়ের তদারকি কতটা কার্যকর হয় তার ওপর। ডিলারদের মজুত ও বিক্রির তথ্য যথা সময়ে হালনাগাদ না হলে অনলাইন ব্যবস্থায় প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন হতে পারে। একইভাবে কৃষকের জমি, ফসল ও সার ব্যবহারের তথ্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।
ইউএনও মো: ইবনুল আবেদীন জানান, ওয়েবসাইট তৈরি, প্রশিক্ষণ ও প্রচারসহ এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে। আরো কিছু প্রচার ব্যয় হতে পারে। সরকারি ডোমেইন pabasaar.gov.bd পাওয়া গেলে খরচ আরো কমবে। এসএমএস ব্যবস্থার খরচ কমানো গেলে বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও কমে আসবে। একটি উপজেলার জন্য বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় হতে পারে বলে জানান তিনি।
রাজশাহী জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার পরও অনেক সময় কৃত্রিম সঙ্কট তৈরির চেষ্টা করা হয়— এমন অভিযোগ তারা পেয়েছেন। সার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে পবা উপজেলায় এ উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, একজন ডিলার কত সার বরাদ্দ পেলেন, কত বিক্রি করলেন এবং কত সার অবশিষ্ট থাকল—এসব তথ্য ওয়েবসাইটে দেখা যাবে। এতে সার ব্যবস্থাপনায় নজরদারি ও স্বচ্ছতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
জেলা প্রশাসক জানান, ‘পবা সার ডটকম’ বর্তমানে পাইলট ভিত্তিতে চালু করা হয়েছে। উদ্যোগটি সফল হলে রাজশাহী জেলার অন্যান্য উপজেলায় এবং পর্যায়ক্রমে জেলার বাইরেও এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।
বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী বলেন, কৃষির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ সার। ফসলের বৃদ্ধি, ফুল ও ফল ধারণসহ উৎপাদন বাড়াতে সারের প্রয়োজন রয়েছে। তাই সারের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ওয়েবসাইটে শুধু ডিলারদের মজুতের তথ্য থাকলেই হবে না; কৃষকের সংখ্যা, চাষযোগ্য জমির পরিমাণ, কোন মৌসুমে কোন ফসল চাষ হচ্ছে এবং ওই ফসলের জন্য কী পরিমাণ সার প্রয়োজন— এসব তথ্যও যুক্ত করা প্রয়োজন। এসব তথ্য পাওয়া গেলে নির্দিষ্ট এলাকার সম্ভাব্য সারের চাহিদা আগেই নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
বিভাগীয় কমিশনার আরো বলেন, আমন মৌসুমে কোন ব্লকে কতজন কৃষক কতটুকু জমিতে চাষ করছেন, সে তথ্য জানা থাকলে ওই এলাকার জন্য প্রয়োজনীয় ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি ও অন্যান্য সারের চাহিদা নির্ধারণ করা যাবে। একইসাথে নির্দিষ্ট এলাকার কৃষকদের জন্য নির্দিষ্ট ডিলার নির্ধারণ করে দেয়া হলে কে কোন ডিলারের কাছ থেকে সার নেবেন, তা কৃষকরাও সহজে জানতে পারবেন।
তিনি বলেন, কৃষকদের তালিকা, তাদের চাষযোগ্য জমি, ফসলের ধরন ও সারের চাহিদার তথ্য ওয়েবসাইটে যুক্ত করা গেলে সার বিতরণ ব্যবস্থাপনায় আরো স্বচ্ছতা আনা সম্ভব হবে। এতে সার নিয়ে কৃষকের বিভ্রান্তি কমার পাশাপাশি সুষম বণ্টনের সুযোগ তৈরি হবে।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) দুপুর ২টার দিকে পবা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পবা সার ডটকম’ ওয়েবসাইটের উদ্বোধন করা হয়।
প্রধান অতিথি হিসেবে ওয়েবসাইটটির উদ্বোধন করেন রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী। পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: ইবনুল আবেদীনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহী জেলা প্রশাসক (ডিসি) কাজী শহিদুল ইসলাম ও কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পবা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রায় দুই শতাধিক কৃষক উপস্থিত ছিলেন।








