
‘কুমিল্লায় চাকরি করতে এসেছি এটা কি আমার অপরাধ? আমার ছেলেকে কেন হত্যা করা হলো? আমি এর জবাব চাই। আমি এখন কীভাবে বাঁচব?’ একমাত্র সন্তান ইশায়েক শাহরিয়ার অপ্রতিমের (১৩) লাশ উদ্ধারের পর নিজ বাসায় এভাবে আহাজারি করছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই অবস্থিত সানন্দা এলাকার একটি জঙ্গল থেকে তার রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) মনিরুল হক চৌধুরী নিহত অপ্রতিমের বাসায় সমবেদনা জানাতে গেলে ভুক্তভোগীর মা অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমার একটি মাত্র ছেলে, তাকে কেন এভাবে হত্যা করা হলো?’
এর আগে, শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সদর দক্ষিণ থানাধীন ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সাথে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতিম। এরপর সে আর বাসায় ফেরেনি।
‘আমার ছোট্ট ছেলেটা কী অন্যায় করেছিল? আমি এটার জবাব চাই। আমি অন্য কোনো বিচার মানি না, আমাকে শুধু এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে’ নিহত ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম এভাবেই বুকফাটা আর্তনাদে নিজের তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন।
এমপি মনিরুল হক চৌধুরী শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিতে এসে সন্তানহারা মায়ের হৃদয়বিদারক বিলাপ দেখে নিজেই নির্বাক হয়ে যান।
নাহিদা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘আমি কোন দেশে বাস করি? একটা অবুঝ শিশু বাইরে বের হলেই কি তাকে মেরে ফেলতে হবে? আমার তো আর কেউ নেই, একটাই ছেলে ছিল। এখন আমি কীভাবে বাঁচব, কীভাবে বাকি জীবনটা পার করব?’
এ সময় নিহত শিশুর বাবাও কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘কেবল মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেয়ার জন্যই তাঁর একমাত্র ছেলেকে এভাবে হত্যা করা হয়েছে।’
পরিবারের এমন মর্মস্পর্শী দৃশ্য দেখে উপস্থিত সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীও নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। সন্তানহারা পিতা-মাতার আহাজারি শুনে তাকে অশ্রুসিক্ত ও স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
পুলিশের সুরতহাল প্রতিবেদনে নিহতের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
পুলিশ ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক ধারণা, মায়ের কাছ থেকে নিয়ে আসা আইফোনটি ছিনিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এ ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না এবং কার এ হত্যার সাথে জড়িত এসব বিষয় খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
লাশ উদ্ধারের খবরে কুবির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অপ্রতিমের মা-বাবাকে সান্ত্বনা দিতে বাসায় ছুটে যান। এ সময় বাবা-মায়ের বুক ফাটা কান্না ও আহাজারি দেখে সহকর্মীরা সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেন। অপ্রতিমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিবার, সহপাঠী ও স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
পুলিশ ও ভুক্তভোগীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার সাড়ে ৩টার দিকে দিকে বন্ধুদের সাথে ছবি তোলার উদ্দেশ্যে মায়ের আইফোন নিয়ে কোটবাড়ির বাসা থেকে বের হয় অপ্রতিম। এরপর থেকে সে আর ঘরে ফেরেনি। বেশ কিছুক্ষণ পার হয়ে যাওয়ার পর, পরিবার তার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ফোন বন্ধ পায়। একপর্যায়ে প্রযুক্তির সহায়তায় তার মোবাইল ফোনের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করা হলে দেখা যায়, শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকায় ফোনটি সচল ছিল। এলাকাটি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদম কাছেই অবস্থিত। এরপর থেকেই ফোনটি বন্ধ রয়েছে।
পরে, বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও সন্ধান না পেয়ে ওইদিন সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। নিখোঁজের পর থেকেই স্বজনদের পাশাপাশি পুলিশও তাকে উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করে।
পুলিশ অপ্রতিমের সর্বশেষ অবস্থান শনাক্তের পাশাপাশি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করছিল।
সদর দক্ষিণ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম জানান, ‘খবর পাওয়ার পর থেকেই পুলিশ বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান শুরু করে। শনিবার দুপুরে কুবি ক্যাম্পাস সংলগ্ন দক্ষিণ মোড় এলাকার দক্ষিণ পাশের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের লাশ উদ্ধার করা হয়। ময়নাতদন্তের জন্য অপ্রতিমের লাশ কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।’
ওসি জানান, ‘নিহত অপ্রতিমের মাথায় আঘাতের চিহ্ন দেখে প্রাথমিকভাবে এটিকে হত্যাকাণ্ড বলেই মনে হচ্ছে। অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং হত্যাকাণ্ডের পেছনের রহস্য উন্মোচনে একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও প্রযুক্তির সহায়তায় খুব দ্রুতই অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হবে।’







