চরাঞ্চলে মহিষ পালনে সম্ভাবনার পাশাপাশি সঙ্কট
লালমোহনের একটি চরে ঘাস খাচ্ছে মহিষ ছবি: নয়া দিগন্ত

মাকসুদুর রহমান পারভেজ লালমোহন (ভোলা) 
সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত ভোলার লালমোহন উপজেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে দিন দিন বাড়ছে মহিষ পালন। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন উপকূলীয় জনপদের মানুষগুলো। তবে সম্ভাবনাময় এ খাতে নানা সঙ্কটও রয়েছে। জোয়ার ও বন্যার সময় মহিষ ভেসে যাওয়া, লবণাক্ত পানি পান করে রোগাক্রান্ত হওয়া, পর্যাপ্ত চারণভূমির অভাব এবং পশু চিকিৎসক সঙ্কটে মাঝে মধ্যেই বিপাকে পড়তে হচ্ছে মহিষ মালিকদের। তাদের দাবি, চরাঞ্চলে কিল্লা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা ও নিয়মিত পশু চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা হলে মহিষ পালন আরো লাভজনক ও সম্প্রসারিত হতে পারে। 
লালমোহন উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৮-১০টি চর রয়েছে। এসব চরের আয়তন কয়েক হাজার একর। বিস্তীর্ণ চরজুড়ে সবুজ ঘাসের মধ্যে দেখা যায় শত শত মহিষের বাথান। ভাটার সময় আশপাশের এলাকার মহিষ মালিকদের রাখালরা নদীর ও খালের পাড়ঘেষা চরাঞ্চলে মহিষ ছেড়ে দেন। সারা দিন ঘাস খাওয়ার পর বিকেলে খোলা আকাশের নিচেই রাত কাটায় মহিষের পাল। রাখালরা এ সময় নদী-খালে জাল পেতে মাছও ধরেন। 
মেঘনা নদীর মাঝে জেগে ওঠা ৮ নম্বর চর মহিষ পালনের অন্যতম বড় বিরানভূমি। স্থানীয় মহিষ মালিক ফয়েজ আহমেদ বেপারি, শ্রীধাম দাস, আবুল কাশেম গৌয়াল, ইসলাম গৌয়াল, শাহাবুদ্দিন মাঝি, কাঞ্চন মাল ও শিহাব মালসহ কয়েকজনের মিলে আড়াই থেকে তিন হাজার মহিষ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, শুধু এ চরেই প্রতিদিন পাঁচ থেকে সাত মণ দুধ সংগৃহীত হয়। প্রতি মণ দুধ প্রায় তিন হাজার টাকা দরে বিক্রি করছেন তারা। 
মহিষ মালিক ফয়েজ আহমেদ বেপারী বলেন, তার রয়েছে দেড় শ’ মহিষ। তাদের মধ্য থেকে ৩০টি মহিষ বাচ্চা দিয়েছে। গত বছর জোয়ারের পানিতে তার ১০টি মহিষ ভেসে যায়। তিনি বলেন, ৮ নম্বর চরে বিপুলসংখ্যক মহিষ পালন করা হলেও সেখানে কিল্লা না থাকায় জোয়ার ও বন্যার সময় মহিষ নদীতে ভেসে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফয়েজ বেপারি আরো বলেন, শীতের শেষে প্রায় চার-পাঁচ মাস নদীর পানি লবণাক্ত থাকে। ওই পানি পান করে মহিষ অসুস্থ হয়ে যায়। পাতলা পায়খানা, খুরা রোগ, গলা ফুলা, পশম ঝরে যাওয়া ও উকুনসহ বিভিন্ন রোগ দেখা দেয় তখন। অনেক সময় রোগাক্রান্ত মহিষের বাছুর মারা যায়। চরে পশু চিকিৎসক না আসায় চিকিৎসা করাতেও বিপাকে পড়তে হয় তাদের। 
মহিষ রাখাল শাকিল, আরিফ, শামিম ও নুর ইসলাম জানান, গ্রামাঞ্চলে মহিষ পালন সম্ভব নয়। কারণে সেখানে পর্যাপ্ত ঘাস পাওয়া যায় না। তাই চরে এসে মহিষ পালন করতে হয়। তবে চরাঞ্চলে নিরাপদ আশ্রয় ও মিঠা পানির ব্যবস্থা না থাকায় মহিষ পালনে কিছুটা ঝুঁকি রয়েছে।
মহিষ মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিটি মহিষের পেছনে বছরে প্রায় ৩৩-৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়। তবে বাচ্চা ও দুধ বিক্রি করে বছর শেষে ভালো আয় করতে পারেন তারা। লালমোহনে মহিষ পালনে উপযোগী চরগুলোর মধ্যে ৮ নম্বর চর ছাড়াও বৈষ্যার চর, ১২ নম্বর চর, উড়ির চর, বাদশা মিয়ার চর, চর সৈয়দপুর ও চর কচুয়াখালী উল্লেখযোগ্য। 
স্থানীয়দের অভিযোগ, চরগুলোর হাজার হাজার হেক্টর জমি প্রভাবশালী মহল ও বন বিভাগের দখলে থাকে। এসব জমিতে গবাদিপশু চরাতে কোথাও কোথাও মাসোয়ারা দিতে হয়। এ ছাড়া চরাঞ্চলের খালগুলোতে বাঁধ দিয়ে বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করে মাছ ধরা হয়। ওই পানি পান করে মহিষ মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
মহিষ মালিক ও দুধ-দধি ব্যবসায়ীরা আট নম্বর চরসহ উপযোগী সব চরাঞ্চলে জরুরি ভিত্তিতে কিল্লা ও নলকূপ স্থাপন এবং নিয়মিত পশু চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানান।