
সুনামগঞ্জের ছাতকে পুলিশের হেফাজত থেকে উধাও হওয়া আওয়ামী লীগ নেতা স্বপন মিয়াকে ঢাকার রমনা এলাকা থেকে পুনরায় গ্রেফতার করা হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) রমনা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। পরে মঙ্গলবার দুপুরে তাকে সুনামগঞ্জ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুরে নয়া দিগন্তকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ছাতক থানার ওসি মিজানুর রহমান।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছাতক থানায় ২০২৫ সালের ২২ জুলাই দায়েরকৃত একটি মামলায় তার বিরুদ্ধে দ্য স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট, ১৯৭৪-এর ১৫(৩)/২৫-ডি ধারায় অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
কথিত এই আওয়ামী লীগ নেতা স্বপন মিয়া দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের শারপিন নগর গ্রামের মরহুম আব্দুল মন্নানের ছেলে এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ও বর্তমানে ছাতক পৌর শহরের লেবারপাড়া এলাকার বাসিন্দা।
এর আগে প্রথমবার রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) রাতে ছাতক পৌর শহরের তাহির প্লাজার সামনে থেকে স্থানীয়রা তাকে আটক করে থানা পুলিশে সোপর্দ করেন। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য প্রথমে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এবং সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। তবে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেয়ার পর স্বপন মিয়ার অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশি পাহারায় অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিলেটে নেয়া হলেও পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। এরপর তার অবস্থান সম্পর্কে পুলিশও স্পষ্ট কোনো তথ্য দেয়নি বলে অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোমবার সন্ধ্যায় ছাতক পৌর শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন স্থানীয় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সমাবেশে স্বপন মিয়াকে পুলিশ পাহারায় পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন ছাতক থানার ওসি মিজানুর রহমান—এমন অভিযোগে ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমানকে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। একই সাথে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দাবি বাস্তবায়ন না হলে আরো কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।
বিক্ষোভকারীদের ভাষ্য, রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে স্বপন মিয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ছাতক শহরের তাহির প্লাজার সামনে আসছিলেন। এ সময় স্থানীয় শতাধিক মানুষ তাকে সিএনজি থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে মারধর করেন। খবর পেয়ে ওসি মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে হেফাজতে নেয়। পরে আহত অবস্থায় তাকে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য পুলিশি পাহারায় অ্যাম্বুলেন্সযোগে তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় বলে দাবি করেন বিক্ষোভকারীরা।
এরপর থেকেই স্বপন মিয়ার অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। তিনি গ্রেফতার হয়েছেন কি না, হয়ে থাকলে কোন মামলায় এবং কোথায় রাখা হয়েছে—এসব বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেয়নি পুলিশ। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
বিক্ষোভকারীদের দাবি, রোববার রাত থেকে সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা একাধিকবার ছাতক থানার ওসির সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও স্বপন মিয়ার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাননি। এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিকে কেন্দ্র করেও আলোচনা শুরু হয়। ছবিতে পুলিশ সদস্যদের সহযোগিতায় স্বপন মিয়াকে ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে বের করে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার দৃশ্য দেখা যায়। তবে ছবিটি কখন তোলা হয়েছে এবং এরপর তিনি কোথায় গেছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিক্ষোভকারীরা স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের মামলা-হামলা দিয়ে হয়রানি, জমি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল এবং চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ তোলেন। সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তে চোরাচালান, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি এবং নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সাথেও তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেন তারা।
তবে বিক্ষোভের একদিন পর ঢাকা থেকে তাকে গ্রেফতারের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে রহস্যের নতুন মোড় নিয়েছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় আরও একাধিক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, এসব বিষয়ে থানার ওসিকে একাধিকবার অবহিত করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এমনকি স্বপন মিয়াকে গ্রেফতার না করার কারণ হিসেবে পুলিশ বিভিন্ন সময় তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছে বলেও দাবি করেন বিক্ষোভকারীরা। তবে স্বপন মিয়ার বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের স্বাধীন কোনো প্রমাণ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বপন মিয়ার বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
এদিকে সোমবারের বিক্ষোভ ও সমাবেশে বক্তারা পুলিশ হেফাজতে নেয়ার পর একজন ব্যক্তির অবস্থান নিয়ে এমন ধোঁয়াশা তৈরি হওয়াকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেন। তারা ঘটনার তদন্ত করে স্বপন মিয়ার অবস্থান ও তাকে কোথায় নেয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট করার দাবি জানান। পাশাপাশি দায়িত্বে অবহেলা বা কোনো ধরনের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি করেন তারা।







