
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে।
স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় একের পর এক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সামরিক অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান এবং রাষ্ট্রীয় অস্থিরতা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। এমন এক সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বরের ঘটনা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে অস্থিরতা বাড়তে থাকে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন।
পরবর্তী সময়ে ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর সদস্য ও সাধারণ মানুষের অভ্যুত্থানে তিনি মুক্ত হন এবং পুনরায় সেনাপ্রধানের দায়িত্ব পান। এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আসেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৬ সালের নভেম্বরে তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বরের তাৎপর্য শুধু ক্ষমতার পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর পরবর্তী সময়ে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্র পরিচালনার উদ্যোগ এবং নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন ধারার বিকাশ ঘটে। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকে রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার উদ্যোগ নেন।
তার শাসনামলে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম পুনরায় চালু, নির্বাচনী রাজনীতির প্রসার এবং বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিকাশ ঘটে। একজন সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার পর নির্বাচনী ও সাংবিধানিক রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের উদ্যোগ তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ প্রসঙ্গে বলা যায়, যদিও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ এক নয়। তবে উভয় ঘটনাই বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল হিসেবে বিবেচিত। ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ তৎকালীন রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার মধ্যে দিকনির্দেশনাহীন ও শঙ্কিত জনগণের সামনে নতুন রাজনৈতিক প্রত্যাশার জন্ম দেয়। সেই সঙ্কটময় সময়ে জিয়াউর রহমান জাতীয় ঐক্য, স্থিতিশীলতা ও নতুন রাষ্ট্রীয় অভিযাত্রার প্রত্যাশায় অনেকের কাছে আস্থার প্রতীক হয়ে ওঠেন।
তার নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে জাতি এক নতুন রাজনৈতিক ঠিকানা ও ভবিষ্যৎ পথরেখার সন্ধান পেতে শুরু করে। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, বৈষম্য, অধিকারহীনতা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে সাধারণ মানুষের ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়।
দু’টি ঐতিহাসিক ঘটনার পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করা কেবল রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় নয়; বরং টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্র পরিচালনায় অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
স্বাধীনতাযুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, খাদ্যসঙ্কট ও দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তি নিয়ে বাংলাদেশ তখন কঠিন সময় পার করছিল। এ পরিস্থিতিতে কৃষি, গ্রামীণ অর্থনীতি, শিল্পায়ন ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি উন্নয়ন কর্মসূচী গ্রহণ করেন। তার সরকারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ ছিল খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচী। সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষিজমিতে পানির সরবরাহ বৃদ্ধি এবং গ্রামীণউৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষিকে অর্থনীতির শক্ত ভিত্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ ভূমিকা রাখে।
বিদেশে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং রফতানিমুখী পোশাকশিল্পের বিকাশেও তার শাসনামলের নীতিগত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাংলাদেশে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম সত্তরের দশকের মাঝামাঝি থেকে সম্প্রসারিত হতে থাকে। ১৯৭৬ সালে এ খাতের প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের সূচনা ঘটে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণের ফলে পরবর্তী সময়ে প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
একইভাবে সত্তরের দশকের শেষ দিকে রফতানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয়। ১৯৭৮ সালে দেশ গার্মেন্টস ও দক্ষিণ কোরিয়ার দেউউয়ের সহযোগিতায় দক্ষতা ও প্রযুক্তি স্থানান্তররের উদ্যোগ এ শিল্পের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি তৎকালীন সরকারের নীতিগত সহায়তাও এ খাতের বিকাশে সহায়ক হয়েছিল।
আজ তৈরি পোশাক রফতানি ও প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক দর্শনের মূল লক্ষ্য ছিল উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করা। তার সময়ের এসব উদ্যোগ পরবর্তী সরকারগুলোর নীতি ও উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে বিস্তৃত হয়েছে। ফলে আজকের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে মূল্যায়ন করতে গেলে সেই সময়ের নীতিগত ভিত্তি ও উদ্যোগগুলোর কথাও স্মরণ করতে হয়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সামনেও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও সমৃদ্ধির বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরকারের ঘোষিত পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রফতানি বহুমুখীকরণ এবং শিল্পায়নের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
২০৩০ সালের মধ্যে এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যও সামনে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন এবং কৃষি ও ক্ষুদ উদ্যোক্তাদের সহায়তার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। দেশব্যাপী খাল খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচী, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা ও গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
তবে আর্থিক খাতের সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। উন্নয়নের সুফল যেনো সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তি একে অপরের পরিপূরক। জনগণের অধিকার নিশ্চিত হলে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বাড়ে, আর সুশাসন ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হলে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারিত হয়। আজকের তরুণ শিক্ষার্থীদের নিকট ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাৎপর্য যথাযথভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। একই সাথে ইতিহাসের বিভিন্ন ব্যাখ্যা ও অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দেশ গঠনে তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, জাতীয় ঐক্য ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান নেতৃত্বকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, জনগণের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং উৎপাদনমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছাড়া পূর্ণতা পায় না; আবার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও জনগণের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত না হলে টেকসই হয় না।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির এই সমন্বিত পথেই গড়ে উঠতে পারে একটি আত্মমর্যদা, স্বাধীন, সমৃদ্ধ ও উন্নত বাংলাদেশ। ইতিহাসের যথাযথ মূল্যায়ন, জাতীয় ঐক্য এবং জনগণের প্রত্যাশার প্রতি দায়বদ্ধতাই হোক ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বরের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার ভিত্তি।
লেখক : অধ্যাপক ড. মো: হাছান উদ্দীন, কোষাধ্যক্ষ, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








