রাবিতে নির্মাণাধীন বিজয় ৭১ হল, (ডানে) ২০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবন
বিজয় ৭১ হল, (ডানে) ২০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবন। নয়া দিগন্ত

শিক্ষার্থীদের আবাসন সঙ্কট নিরসনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) নেয়া অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন হলগুলোর কাজ সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও তা হয়নি। ইতোমধ্যে তিন দফা মেয়াদ বাড়িয়ে প্রকল্পটি প্রায় ১০ বছরে গড়িয়েছে।

হলগুলো চালু না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে মেসে ভাড়া থেকে পড়াশোনা করতে হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের আবাসন সঙ্কট আরো প্রকট হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দফতর সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য ৩৬৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। প্রকল্পের আওতায় অপরাজিতা হল (শেখ হাসিনা হল), বিজয়-৭১ হল, ১০ তলা শিক্ষক কোয়ার্টার, ২০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবন, ড্রেন নির্মাণ, শেখ রাসেল মডেল স্কুলসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়।

পরে দ্রব্যমূল্য ও নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় বিবেচনায় প্রকল্পটির সংশোধিত বাজেট অনুমোদন করা হয়। ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটির জন্য ৫১০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করে।

পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দফতর সূত্রে আরো জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন স্থাপনাগুলোর কাজ শেষ করার জন্য প্রাথমিকভাবে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে করোনা মহামারি, এক শিক্ষার্থী ও দুই শ্রমিকের মৃত্যু এবং নির্মাণকাজে ধীরগতিসহ বিভিন্ন কারণে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। পরে প্রথম দফায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়।

এরপরও প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। বর্ধিত সময়ের মধ্যেও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ হয়নি। পরে আবার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করা হলে সর্বশেষ তৃতীয় দফায় প্রকল্পের মেয়াদ আবারো বাড়ানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার (ভারপ্রাপ্ত) পরিচালক প্রকৌশলী এস এম ওবায়দুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নতুন মেয়াদ অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ শেষ করার সময়সীমা ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে প্রকল্পের আওতায় শেখ রাসেল মডেল স্কুল ও কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনের সংস্কারকাজ শেষ হলেও আবাসিক হল, অ্যাকাডেমিক ভবন ও শিক্ষক কোয়ার্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থাপনার নির্মাণকাজ এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে তিন দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

বিজয়-৭১ হল
বিজয়-৭১ আবাসিক হলের প্রায় ৯৬ শতাংশ নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার (ভারপ্রাপ্ত) পরিচালক প্রকৌশলী এস এম ওবায়দুল ইসলাম।

তিনি বলেন, হলটির সামান্য কিছু কাজ বাকি রয়েছে। এর বড় অংশই প্রয়োজনীয় অনুমোদনের কারণে আটকে আছে।

তিনি আরো বলেন, হলটিতে একটি পাম্প স্থাপনের প্রয়োজন হলেও তা মূল প্রাক্কলনে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ফলে সংশ্লিষ্ট অনুমোদন ছাড়া পাম্পটি স্থাপন করা যাচ্ছে না। মূল নকশা ও প্রাক্কলনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের বিষয়গুলোও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে হলটি বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব হবে।

এদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা শেরেবাংলা ফজলুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের একাংশকে ইতোমধ্যে নির্মাণাধীন বিজয়-৭১ হলের অংশবিশেষে স্থানান্তর করা হয়েছে।

নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ
শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান হল ও ২০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজ করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি নির্মাণাধীন শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামান হলের একটি অংশের ছাদ ধসে পড়ে। এরপর হলটির বিভিন্ন দেয়াল ও পিলারে ফাটল দেখা দেয়ার অভিযোগ ওঠে। মেরামতের পরও কয়েকটি স্থানে পলেস্তারা খসে পড়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে হলটির নির্মাণমান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে নির্মাণকাজ পরিদর্শনের পর গুরুতর কোনো ত্রুটি পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার (ভারপ্রাপ্ত) পরিচালক প্রকৌশলী এস এম ওবায়দুল ইসলাম।

অপরাজিতা হল
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের জন্য নির্মাণাধীন ১০ তলা অপরাজিতা হলের (শেখ হাসিনা হল) নির্মাণকাজ পেয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দ্য বিল্ডার্স ইঞ্জিনিয়ার অ্যাসোসিয়েট লিমিটেড। হলটির নির্মাণকাজ প্রায় ৭০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার (ভারপ্রাপ্ত) পরিচালক প্রকৌশলী এস এম ওবায়দুল ইসলাম।

অপরাজিতা হল, (ডানে) শিক্ষক কোয়ার্টার

 

তিনি বলেন, ভবনটির নয় তলা পর্যন্ত নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। তবে ফিনিশিংসহ বেশ কিছু কাজ বাকি থাকায় সার্বিক অগ্রগতি প্রায় ৭০ শতাংশ। তৃতীয় দফায় বর্ধিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

শিক্ষক কোয়ার্টার
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ তলাবিশিষ্ট শিক্ষক কোয়ার্টারের নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে প্রথম দফার পরীক্ষায় প্রশ্ন ওঠায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পরে এলজিইডি ও বুয়েটের মাধ্যমে আরো দুই দফা পরীক্ষা করা হয়। সর্বশেষ পরীক্ষায় নির্মাণসামগ্রীর শক্তিমাত্রা নির্ধারিত মানের মধ্যে পাওয়ায় জটিলতার অবসান ঘটিয়ে ফের নির্মাণকাজ শুরু হয়।

বর্তমানে ভবনটির প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে এবং ১০ তলা পর্যন্ত ছাদ নির্মাণ শেষ হয়েছে।

২০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবন
অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ২০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবনের কাজ অন্যান্য স্থাপনার তুলনায় ধীরগতিতে এগোচ্ছে। ভবনটির প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, ১৬ তলা পর্যন্ত ছাদ নির্মাণ শেষে ১৭ তলার কলাম পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া গ্রিল ও ইটের গাঁথুনিসহ ১৫ তলা পর্যন্ত শিডিউলভুক্ত অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার (ভারপ্রাপ্ত) পরিচালক প্রকৌশলী এস এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, মূল প্রাক্কলনে নির্ধারিত পরিমাণ রড দিয়ে ১৭ তলা পর্যন্ত কাজ করা সম্ভব হচ্ছে। তবে পরবর্তী তিন তলার জন্য প্রয়োজনীয় রডের পরিমাণ প্রাক্কলনে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ফলে অতিরিক্ত রডের জন্য অনুমোদন নেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। অনুমোদন না পাওয়ায় ভবনটির মূল নির্মাণকাজ কয়েক মাস ধরে প্রায় বন্ধ রয়েছে।

প্রাক্কলন ও নকশায় ত্রুটি
প্রকৌশলী এস এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আগের সময়ে নেয়া প্রকল্পগুলোর প্রাক্কলন ও নকশায় কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল। বিশেষ করে আবাসিক হলগুলোর বিওকিউ (Bill of Quantity) প্রণয়নের সময় প্রয়োজনীয় কিছু আইটেম বাদ পড়ে যায়। পরে এসব আইটেম সংযোজনের প্রয়োজন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে সময় লেগেছে। কিছু বিষয়ে এখনো অনুমোদন পাওয়া যায়নি। সেগুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এটি ‘গ্রিন সিগন্যাল’-এর বিষয় নয়; বরং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের প্রক্রিয়া। কাজ শুরুর পর কোনো ঘাটতি বা প্রয়োজনীয় পরিবর্তন দেখা দিলে তা সংযোজন-বিয়োজনের জন্য অনুমোদন নিতে হয়। ২০ তলা ভবনের ক্ষেত্রেও পরামর্শকের তৈরি বিওকিউ ভবনটির সম্পূর্ণ কাজের জন্য পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত উপকরণের অনুমোদন না পাওয়ায় কয়েক মাস ধরে ভবনটির মূল নির্মাণকাজ প্রায় বন্ধ রয়েছে।

প্রকল্পের কাজ ধীরগতির কারণ সম্পর্কে পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার (ভারপ্রাপ্ত) পরিচালক প্রকৌশলী এস এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, আমাদের মূল সমস্যা হচ্ছে অনুমোদন। অনুমোদন দ্রুত পাওয়া গেলে কাজ আরো দ্রুত এগিয়ে নেয়া সম্ভব হতো। ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন কারণে কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিল। জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়ার পর কাজ পূর্ণগতিতে শুরু করার উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়ায় কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে।

প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লেও অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। তবে প্রাক্কলনে বাদ পড়া প্রয়োজনীয় কাজ বা উপকরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। অর্থাৎ অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ নয়; বিদ্যমান বরাদ্দের মধ্যেই প্রয়োজনীয় পরিবর্তন বাস্তবায়নের অনুমোদনই মূল বিষয়।

সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. মো: ফরিদুল ইসলাম দৈনিক নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত শেষ করতে আমরা মন্ত্রণালয়ের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করছি এবং এগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে মেয়াদ বৃদ্ধি ও ভেরিয়েশনসহ বিভিন্ন জটিলতা রয়েছে। আগের প্রাক্কলনে প্রয়োজনীয় বাজেটও ধরা হয়নি। এসব জটিলতা সমাধানে কাজ চলছে। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কয়েক দফা প্রকল্প এলাকায় নিয়ে গিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি দেখানো হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘প্রকল্পগুলো শেষ না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক ও আবাসনসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হবে না। প্রকল্পগুলোর মেয়াদ আরো এক বছর বাড়ানো হয়েছে। এটিই শেষবারের মতো সময় বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।’