
আলজাজিরা ও মিডল ইস্ট মনিটর
ইয়েমেনে সৌদি আরবের একটি এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য স্থানীয়ভাবে তৈরি ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ভূপাতিত করার দাবি করেছে হাউছি বিদ্রোহীরা। সামরিক মুখপাত্র সেয়্যিদ কিংবা জ্যেষ্ঠ সামরিক নেতৃত্বের বরাত দিয়ে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, মারিব এলাকার আকাশসীমায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক তৎপরতার সময় এ হামলা চালানো হয়। মারিবের উত্তর-পশ্চিমে মাউন্ট হেলানের কাছে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার কথা স্থানীয় সূত্রে জানা গেলেও এ বিষয়ে সৌদি জোটের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত কৌশলগত পেরিম দ্বীপ (ময়ুন) হাউছিদের দখলে চলে যাওয়ার পর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানান, ওয়াশিংটন পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে এবং হাউছিদের সাথে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। একইসাথে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আঞ্চলিক অংশীদারদের সাথে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হয়েছে। এই নৌপথটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে হাউছিরা জাহাজ চলাচল বন্ধের হুমকি দেয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চরম ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে ইয়েমেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি দুই প্রধান কেন্দ্র- মারিব ও তাইজে তীব্র রূপ নিয়েছে। দেশের অন্যতম তেল ও গ্যাসক্ষেত্রসমৃদ্ধ মারিব অঞ্চলে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে হাউছিদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। অঞ্চলটি হাতছাড়া হলে তা সরকারের জন্য চূড়ান্ত পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে এবং দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত প্রায় অর্ধেকের বেশি মানুষের মানবিক সঙ্কট আরো ঘনীভূত হতে পারে।
পাশাপাশি তাইজ ও কৌশলগত লোহিত সাগরীয় মোখা শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পক্ষের সঙ্ঘাত বাড়ছে। হাউছিদের একের পর এক ভূখণ্ড দখল ও বাব আল-মানদেব প্রণালীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আঞ্চলিক কৌশলগত সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্যমতে, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে সঙ্ঘাতের কারণে ৮৫ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে, যাদের একাংশ জিবুতির উত্তর উপকূলে আশ্রয় নিয়েছে। গেল সপ্তাহে ইয়েমেনের একাধিক স্থানে ৪৫০টিরও বেশি বিমান হামলা চালানোর জন্য সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে দায়ী করেছে হাউছি বিদ্রোহীরা। সামরিক মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারির দাবি, পূর্বে ভূপাতিত একটি সৌদি সামরিক বিমানের ধ্বংসাবশেষ অনুসন্ধান কাজে যুক্ত আরো দু’টি এফ-১৫ যুদ্ধবিমানকে তাড়া করেছে তাদের বাহিনী। তাইজ, লাহাজ, আল-জাউফ, হাজ্জাহ, মারিব, সায়াদা ও আল-বায়দাকে নিশানা করে চালানো এসব হামলায় সাধারণ নাগরিক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন। নিজেদের আকাশসীমা রক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে গোষ্ঠীটি।
মক্কায় ড্রোন হামলার দাবি প্রত্যাখ্যান
অন্যদিকে পবিত্র মক্কা নগরীতে ড্রোন হামলার সৌদি দাবিকে সম্পূর্ণ বানানো বলে উড়িয়ে দিয়েছে হাউছিরা। রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য হিজাম আল-আসাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ অভিযোগকে ভিত্তিহীন আখ্যা দেন। বুধবার সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানায়, হাউছিরা মক্কাকে লক্ষ্য করে ড্রোন নিক্ষেপ করেছে, তবে এটি মক্কার আকাশসীমায় ঢোকার আগেই ধ্বংস করে দেয়া হয়।
তবে সৌদির এ অভিযোগকে ‘ঘৃণ্য মিথ্যা’ হিসেবে অভিহিত করেছে হাউছিরা। এ গোষ্ঠীর পলিটিক্যাল ব্যুরোর সদস্য হিজাম আল-আসাদ বলেছেন, ‘মক্কায় হামলার দাবি একটি ঘৃণ্য মিথ্যা। যা এর আগেও দাবি করা হয়েছে। কিন্তু এখন এমন দাবি আর কাউকে ভুল বোঝায় না।’
সংঘর্ষের আবহ বৃদ্ধি পাওয়ায় ইয়েমেনে মানবিক পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। জাতিসঙ্ঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্যমতে, হাউছি ও সরকারি বাহিনীর মধ্যে লড়াইয়ের জের ধরে গৃহহীন হয়েছেন এক লাখেরও বেশি মানুষ। অনেকে সমুদ্রপথে জিবুতিতে পাড়ি জমাচ্ছেন। সোমালিয়া ও ইথিওপিয়া থেকে আসা আশ্রয়প্রার্থীসহ বাস্তুচ্যুতদের সহায়তায় এক কোটি ৪০ লাখ ডলারের জরুরি তহবিল প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বাব আল-মানদেব প্রণালীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়ার মধ্য দিয়ে লোহিত সাগর উপকূলে হাউছিদের শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে, যা বিকল্প নৌপথ চলাচলে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। গৃহহীন হওয়া আয়েশা মুহাম্মদ ও হুসেইন হায়দারার মতো সাধারণ নাগরিকেরা জানান, আকস্মিক বোমাবর্ষণ ও গুলির মুখে সন্তান ও সামান্য জিনিসপত্র নিয়েই ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন তারা। জিবুতিতে পৌঁছানো বাস্তুচ্যুতদের বড় অংশই নারী, শিশু ও প্রবীণ।







