যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। সংগৃহীত ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পর দেশটিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিল্পের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়তে পারে— এমন আশঙ্কায় বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে এশিয়ার বাজারেও। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) লেনদেনের শুরুতেই দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে ব্যাপক বিক্রির চাপ দেখা যায়।

Advertisement

ওয়াল স্ট্রিটে বড় ধরনের দরপতনের পর এশিয়ার বিনিয়োগকারীরাও শেয়ার বিক্রি শুরু করেন। মাত্র পাঁচ মাস আগেও যেসব প্রযুক্তি কোম্পানির হাত ধরে শেয়ারবাজার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল, এখন সেসব কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মঙ্গলবারের মার্কিন নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক জয়কে শুরুতে স্বাগত জানিয়েছিলেন বিনিয়োগকারীদের একাংশ। তাদের আশা ছিল, এই ফল প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর ইরান যুদ্ধ বন্ধের চাপ বাড়াবে। কিন্তু শিগগিরই এআই খাতের সম্প্রসারণে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ সামনে চলে আসে।

Advertisement

যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ভোটারদের মধ্যেই ডেটা সেন্টার নির্মাণের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিরোধিতা রয়েছে। এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিজয়ী অনেক রাজনীতিকও এসব প্রকল্পের সম্প্রসারণে লাগাম টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ডেটা সেন্টার নির্মাণে দেশজুড়ে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের আহ্বানও বিনিয়োগকারীদেরকে উদ্বিগ্ন করেছে।

নির্বাচনের ফলাফল এমন এক সময়ে এসেছে, যখন এআই খাতে বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু এসব বিনিয়োগ থেকে কবে নাগাদ মুনাফা আসবে, তা নিয়ে আগে থেকেই সংশয় ছিল। 

এর সাথে সাম্প্রতিক সময়ে ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এছাড়া অনেক প্রযুক্তি কোম্পানির শেয়ারের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বাজারে আগে থেকেই অস্বস্তি ছিল।

এমসিএইচ মার্কেট ইনসাইটসের বিশ্লেষক মাইকেল হিউসন বলেন, ‘এআই খাতের সম্প্রসারণ পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বিরোধিতা আরো বাড়তে পারে— এমন আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বিক্রি করছেন। টেক্সাসের নির্বাচনী ফলাফল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ ট্রাম্পকে সমর্থন করার কারণে রাজনীতিকেরা ইলন মাস্কের টেসলা ও স্পেসএক্সকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারেন।’

নিউইয়র্কের নাসডাক সূচক বৃহস্পতিবার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। শতাংশের হিসাবে এটি গত বছরের এপ্রিলের পর এক দিনে সবচেয়ে বড় পতন। ওই সময় ট্রাম্প বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন।

একই দিনে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক ৪ শতাংশের বেশি এবং ডাও জোন্স সূচক ৩ শতাংশের বেশি কমেছে।

ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক চলতি সপ্তাহে প্রায় ১৬ শতাংশ কমেছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে গত বছরের এপ্রিলের পর এটিই হবে সূচকটির সবচেয়ে খারাপ সময়।

শেয়ারবাজারে এই ধসের জন্য ডেমোক্র্যাটদের দায়ী করেছেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ‘আজ শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে, কারণ মঙ্গলবার ডেমোক্র্যাটরা বড় জয় পেয়েছে। এমন পরিস্থিতি দেখে দুঃখ হচ্ছে। এর দায় আপনাদেরই নিতে হবে!’

এশিয়ার বাজারেও বড় দরপতন
যুক্তরাষ্ট্রের পর এশিয়ার শেয়ারবাজারেও ব্যাপক বিক্রির চাপ অব্যাহত ছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক একপর্যায়ে প্রায় ৯ শতাংশ কমে যায়। দেশটির বড় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এসকে হাইনিক্সের শেয়ারের দাম কমে ১০ শতাংশ। প্রতিদ্বন্দ্বী স্যামসাংয়ের শেয়ারের দরও ৮ শতাংশ কমে যায়।

গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ থেকে চলতি বছরের জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি সূচক দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। তবে এরপর থেকে সূচকটি প্রায় ৫০ শতাংশ হারিয়েছে।

জাপানের নিক্কেই সূচকও ৭ শতাংশ কমে যায়। দেশটির কিয়োক্সিয়া ও সফটব্যাংকের শেয়ারের দাম ১০ শতাংশের বেশি কমেছে। অ্যাডভানটেস্টের শেয়ারের দর কমেছে ৮ শতাংশেরও বেশি।

তাইওয়ানের বড় চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসির শেয়ারের দাম ৭ শতাংশ কমে যাওয়ায় দেশটির তাইএক্স সূচক প্রায় ৮ শতাংশ নেমে যায়।

এছাড়া হংকং, সাংহাই, সিডনি ও সিঙ্গাপুরের শেয়ারবাজারেও ১ শতাংশের বেশি দরপতন হয়েছে। ওয়েলিংটন ও ম্যানিলার বাজারেও নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে।

স্যাক্সো মার্কেটসের বিশ্লেষক নিল উইলসন বলেন, ‘চারদিকে এখন রক্তক্ষরণ চলছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, বাজারের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। ডেমোক্র্যাটরা এআই খাতের সম্প্রসারণে বাধা দিয়ে ডেটা সেন্টার নির্মাণ থামিয়ে দিতে পারে। পরিস্থিতি কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হলেও, বাজারে যেভাবে সব ধরনের শেয়ার বিক্রির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তাতে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার অপেক্ষা করতে হবে।’

এদিকে তেলের দাম আবারো বাড়ায় বিশ্ববাজারে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বেড়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের পর ইরান যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বৃহস্পতিবার তেলের দাম কমেছিল। তবে পরে আবারো ঊর্ধ্বমুখী হয়।

সূত্র : বাসস