
ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদে থাকার বাকি দুই বছর কোন দল কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণ করবে, তা স্পষ্ট। একইসাথে আরো একটি কারণে এই ভোট ইতিহাস তৈরি করেছে- মিশিগানে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়িদ দেশটির প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন।
আল-সাইয়িদ পেশায় একজন চিকিৎসক। তিনি এর আগে কখনো কোনো পদে ছিলেন না। এবার যুক্তরাষ্ট্রে অন্যতম কাদা ছোড়াছুড়ির নির্বাচনী প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি।
তার প্রচারণার শেষ দিনগুলোতে উত্তাপ আরো বেড়ে যায়, যখন তার ডেমোক্র্যাট সহকর্মী হ্যালি স্টিভেন্স, যাকে তিনি দলীয় মনোনয়নের জন্য অল্প ব্যবধানে পরাজিত করেছিলেন, তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেন।
ভোট গণনায় এগিয়ে থাকার একপর্যায়ে নিজের বিজয় দাবি করে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে পরিচালিত প্রচারণা তাদের জীবদ্দশায় দেখা সবচেয়ে কদর্য প্রচারণাগুলোর একটি ছিল। তবে তিনি সমর্থনের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
এর আগে রোববার (১ নভেম্বর) আল-সাইয়িদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘এটি এক কোটি মানুষের একটি রাষ্ট্র, যারা তাদের সরকারের কাছ থেকে আরো অনেক ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য। আমি বরং সেই ৯৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৮ জনের ওপর বেশি মনোযোগ দিচ্ছি, যাদের কথা আপনারা বলছেন না।‘
১৯৮৪ সালে ডেট্রয়েটের উপশহর রচেস্টার হিলসে জন্ম আল-সাইয়িদের। তিন বছর বয়সে বাবা-মায়ের বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর বাবা ও সৎ মা জ্যাকুলিন জনসনের কাছে বেড়ে ওঠেন তিনি।
আল-সাইয়িদ মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাবিদ্যায় লেখাপড়া করেন এবং মহামারীবিদ্যায় বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেন।
২০১৫ সালে ডেট্রয়েট স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তার নিয়োগ জাতীয় সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল।
তিন বছর পর আল-সাইয়িদ মিশিগানের গভর্নর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করলেও গ্রেচেন হুইটমারের কাছে ২০ শতাংশেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে হেরে যান, যিনি পরবর্তীতে দুই মেয়াদে গভর্নর নির্বাচিত হন।
হুইটমার ২০২৬ সালের সেনেট নির্বাচনের প্রাইমারিতে স্টিভেন্সকে সমর্থন করলেও, আল-সাইয়িদ মনোনয়ন পাওয়ার পর থেকে তিনি প্রকাশ্যে তার প্রচারণাকে সমর্থন করে আসছেন।
তিনি সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং কংগ্রেসওম্যান আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের মতো প্রগতিশীলদের সমর্থন পান।
কিন্তু সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ আরো মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাটরাও আল-সাইয়িদের প্রচারণাকে সমর্থন জানিয়েছেন, কারণ মার্কিন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার দলের পরিকল্পনার জন্য মিশিগানের এই প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আল-সাইয়িদ একটি বামপন্থী প্ল্যাটফর্মে প্রচারণা চালিয়েছেন, যেখানে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার অর্থায়নের জন্য ধনকুবেরদের ওপর কর আরোপের মতো বিষয়গুলোর পাশাপাশি ইসরাইলে মার্কিন সামরিক সাহায্যের সমালোচনাও উচ্চ স্থান পেয়েছে।
২৯ অক্টোবর একটি নির্বাচনী সমাবেশে সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘কর প্রদান করা এবং এটা জানা যে সেই টাকা অন্য কারো ও তাদের সন্তানদের ওপর বোমা ফেলার পরিবর্তে আপনার ও আপনার সন্তানদের জন্য ব্যয় করা হবে, এটা এতটা কঠিন হওয়া উচিত নয়।‘
তিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর গাজায় ইসরাইলের অভিযানকে গণহত্যা বলেও আখ্যা দিয়েছেন, যে অভিযোগ ইসরাইল তীব্রভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তিনি বলেছেন, দেশটি অধিকৃত পশ্চিম তীরে বর্ণবৈষম্য চালাচ্ছে।
সামরিক সাহায্যের প্রতি আল-সাইয়িদের বিরোধিতা তেল আবিবের বাইরেও বিস্তৃত।
৪২ বছর বয়সী এই নেতা প্রায়শই বলে থাকেন যে, তিনি চান মার্কিন করের অর্থ ‘বিদেশে কারো ওপর বোমা ফেলার জন্য পাঠানোর পরিবর্তে স্কুল ও সুযোগ তৈরির কাজে ব্যবহৃত হোক‘।
২৮ অক্টোবর আল-সাইয়িদ বলেন, ‘আমি মনে করি না যে সাধারণভাবে আমাদের বিদেশী সামরিক বাহিনীকে অর্থায়ন করা উচিত। এরা হলো ইসরাইল। মিসরও তাই। সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও তাই।‘
তা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মিসরীয় অভিবাসীদের সন্তান আল-সাইয়িদকে ‘সন্ত্রাসীদের পক্ষে থাকার‘ জন্য অভিযুক্ত করেছেন।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ১৫ অক্টোবর রজার্সের এক নির্বাচনী সমাবেশে বলেন, ‘আপনারা এমন এক ধূর্ত লোকের চেয়ে ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য, যার উচিত নিজের মুখ বন্ধ রাখা এবং যে দেশ তাকে সবকিছু দিয়েছে, তার প্রতি সামান্য কৃতজ্ঞতা দেখানো।‘
আর রজার্স, ট্রাম্পের মন্তব্য থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখলেও, আল-সাইয়িদের প্রচারণাকে উগ্রপন্থী ও উগ্রপন্থী সংগঠনের সাথে যুক্ত দাতাদের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা গ্রহণের জন্য অভিযুক্ত করেছেন।
রিপাবলিকানরা তার বিরুদ্ধে মিসরের বৃহত্তম ও প্রাচীনতম ইসলামপন্থী সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্ক থাকার অভিযোগও করেছে, যেটি ২০১১ সালের আরব বসন্তের অভ্যুত্থানের পর আফ্রিকার এই দেশটিতে অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় ছিল।
যদিও আল-সাইয়িদ এই ধরনের কোনো সম্পর্কের কথা অস্বীকার করেন, তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা ২০১২ সালের একটি খোলা চিঠিতে তার স্বাক্ষরের বিষয়টি তুলে ধরেছেন, যেখানে ইসলামপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ‘যত দ্রুত সম্ভব গণমাধ্যম ও পুলিশকে শুদ্ধ করার‘ আহ্বান জানানো হয়েছিল।
বামপন্থী ভাষ্যকার হাসান পাইকারের সাথে সম্পর্কের কারণেও আল-সাইয়িদ সমালোচিত হয়েছেন, যিনি বলেছিলেন যে ৯/১১ হামলার শিকার যুক্তরাষ্ট্র ‘হওয়ার যোগ্য‘ ছিল।
প্রচার অভিযান চলাকালীন আল-সাইয়িদ ঘোষণা করেন যে, তার আনুগত্য মার্কিন সংবিধানের প্রতি। তিনি ভোটারদেরকে তার অতীত নয়, বরং নীতির ভিত্তিতে তাকে বিচার করার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘আমার নাম বা আমার বিশ্বাসের কারণে মানুষ যে গাড়িতে তেল বা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারে না, ডাক্তার দেখাতে পারে না কিংবা যে বাতাসে শ্বাস নেয় ও যে পানি পান করে তা নিয়ে চিন্তিত থাকে, তা নয়। যদিও আমি হয়তো গড় আমেরিকানদের চেয়ে কিছুটা ভিন্নভাবে প্রার্থনা করি, আমরা একই জিনিসের জন্য প্রার্থনা করি।‘
সূত্র : বিবিসি
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








