ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ
ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। সংগৃহীত ছবি

নির্বাচনে বিভক্ত ফলাফলের পর ইসরাইলে সরকার গঠন নিয়ে আজ বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনা শুরু করছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ। তবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু কিংবা তার প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকট—কেউই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন পাননি।

Advertisement

প্রেসিডেন্টের পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক হলেও কে প্রথম সরকার গঠনের সুযোগ পাবেন, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা তার হাতে। এ প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাসও লেগে যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত চেষ্টা ব্যর্থ হলে নতুন নির্বাচনও হতে পারে।

ইসরাইলের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র মেরুকরণ এবং তিন বছরের যুদ্ধের পর দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হারজগ জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের বিষয়ে বিভিন্ন দলের নেতাদের সাথে আলোচনা করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে এ সম্ভাবনা আরো জোরালো হয়েছে।

গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল গ্রহণের পর বুধবার বিকেল ৫টায় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে দুই দিনের আলোচনা শুরু করবেন হারজগ। প্রথমে তিনি অতি জাতীয়তাবাদী দল রিলিজিয়াস জায়নবাদের নেতাদের সাথে বৈঠক করবেন।

প্রেসিডেন্টের দফতর জানিয়েছে, সব পক্ষের মতামত শোনার জন্য তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই ছোট দলগুলোর সাথে আলোচনা দিয়ে প্রক্রিয়া শুরু করছেন। বৃহস্পতিবার শেষ দিকে সবচেয়ে বড় দুই দল নেতানিয়াহুর ডানপন্থী লিকুদ এবং সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকটের প্রতিষ্ঠিত মধ্যপন্থী থেকে মধ্য-ডানপন্থী বিরোধী দল ইয়াশারের সাথে বৈঠক করবেন তিনি।

১২০ সদস্যের ইসরাইলি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ৬১টি আসন। কিন্তু নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকট—কেউই এ সংখ্যা অর্জন করতে পারেননি।

আসন সংখ্যার হিসাবে নেতানিয়াহুর জোট এগিয়ে রয়েছে। তাদের আসন ৫৩টি। অন্যদিকে আইজেনকটের জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন।

আরব সংখ্যালঘুদের দলগুলোর সাথে জোট গঠন করলে আইজেনকট ৬১ আসনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেন। নেতানিয়াহুর কট্টর ডানপন্থী সরকারের প্রতি ক্ষোভের কারণে এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলোর আসন বেড়ে ১৯টিতে দাঁড়িয়েছে।

তবে বিরোধী জোটের কয়েকজন নেতা অ-ইহুদি আইনপ্রণেতাদের ভোটের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনে আপত্তি জানিয়েছেন।

নেতানিয়াহু আরব দলগুলোকে বাদ দিয়ে বৃহত্তর জোট সরকার গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, আরব দলগুলো নির্বাচনে ভোট `চুরি‘ করেছে।

এদিকে, আরব-ইসরাইলি দলগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগের তদন্ত কতদূর এগিয়েছে, তা জানাতে মঙ্গলবার গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল। তিনি বলেছেন, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ জমা দেয়া হয়নি।

আরব-ইসরাইলি নেতারা এ অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। অন্যদিকে মঙ্গলবার আইজেনকট অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু ও তার লিকুদ পার্টি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে `পোগ্রম‘ বা পরিকল্পিত নিপীড়ন চালানোর চেষ্টা করছে।

‘নতুন চিন্তাভাবনার‘ আহ্বান
সৌম্য স্বভাবের আইনজীবী হারজগের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল বিলুপ্ত বামপন্থী লেবার পার্টির মাধ্যমে। তবে বর্তমানে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দলীয়। তিনি নতুন করে চিন্তাভাবনার মাধ্যমে রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে ওঠা এবং নতুন নির্বাচন এড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন।

প্রেসিডেন্টের দফতর এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘সব সম্ভাবনা যাচাই করা, সংলাপের পরিসর বাড়ানো এবং প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে পারে—এমন প্রতিটি পথ খতিয়ে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।‘

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে হারজগ প্রয়োজনে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আরো কয়েক দফা আলোচনা করতে পারেন।

প্রেসিডেন্ট কাউকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিলে তিনি এ জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে এ সময় আরো ১৪ দিন বাড়ানো যাবে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে হারজগ অন্য কাউকে এ দায়িত্ব দেবেন। দ্বিতীয় ব্যক্তিও ব্যর্থ হলে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতারা ২১ দিনের মধ্যে নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে মনোনীত করতে পারবেন। তা না হলে ইসরাইলে আবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

২০২২ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করতে নেতানিয়াহুর ৫৮ দিন সময় লেগেছিল। সে সময় তার লিকুদ পার্টি এবারের তুলনায় ভালো ফল করেছিল।

২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে ইসরাইলে পাঁচবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

নেতানিয়াহু দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী। প্রায় দুই দশক ধরে তিনি বিভিন্ন মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছেন। তার বিপুলসংখ্যক সমর্থক থাকলেও অনেক ইসরাইলি তাকে অপছন্দ করেন। তাদের মধ্যে বিচার বিভাগে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে ক্ষুব্ধ ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা চলছে। ক্ষমতা হারালে তিনি দায়মুক্তি হারিয়ে কারাদণ্ডের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনগুলোতে তিনি বারবার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে আবারো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করার নির্দেশ দেবেন।

নির্বাচনের রাতে আইজেনকট সামরিক বাহিনীকে সতর্ক করে বলেন, নেতানিয়াহুর ‘রাজনৈতিক প্রয়োজন‘ মেটাতে কোনো নির্দেশ পালন করা উচিত হবে না। তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকলেও নেতানিয়াহুর এমন নির্দেশ দেয়ার কোনো ম্যান্ডেট নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ঐক্য সরকার গঠনের সম্ভাবনা নেই
নেতানিয়াহু নিজেকে প্রধান রেখে একটি ‘বৃহত্তর জাতীয় সরকার‘ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে বিরোধী দলের নেতারা এ সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তাদের মতে, নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত অবস্থান এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা ঠেকাতে তার সরকারের ব্যর্থতার কারণে তার নেতৃত্বে ঐক্য সরকার গঠন সম্ভব নয়। ওই হামলা ছিল ইসরাইলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী দিন।

মঙ্গলবার এক কৌশলগত বৈঠকে আইজেনকট ও বিরোধী দলের অন্য নেতারা দ্রুত সরকার গঠন এবং নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর অঙ্গীকার করেছেন। তবে কিভাবে তারা এ লক্ষ্য অর্জন করবেন, সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দেননি।

সূত্র : বাসস