মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচন ২০২৬, ডেমোক্র্যাটদের সিনেটে জয়, মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী পরাজয়, রিপাবলিকানদের আসন হারানো, মার্কিন সিনেট নির্বাচন, ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাস, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ। সংগৃহীত

মার্কিন মিডটার্ম নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে জয়লাভ করেছে। একইসাথে কংগ্রেসের ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করেছে। আর তা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। সাউথ ক্যারোলাইনা, টেক্সাস এবং ওহাইওর সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা অবিশ্বাস্য বিজয় অর্জন করেছে; রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিগুলো দখল করে তারা সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। কোটি কোটি ভোটার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি এক তীব্র অনাস্থা ও তিরস্কার প্রদর্শন করেছেন।

Advertisement

কেনটাকি, নিউ জার্সি এবং নর্থ ক্যারোলাইনার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোতে অন্তত আটটি রিপাবলিকান আসন নিজেদের দখলে নেওয়ার পর এবং এমনকি চরম রক্ষণশীল এলাকাগুলোতেও শক্তির জানান দেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা মার্কিন হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথে রয়েছে।

ওহাইওতে, ডেমোক্র্যাট শেরোড ব্রাউন রিপাবলিকান বর্তমান সিনেটর জন হাস্টেডকে পরাজিত করে সিনেটে ফিরে আসছেন, অন্যদিকে টেক্সাসের ডেমোক্র্যাটিক অঙ্গরাজ্য প্রতিনিধি জেমস তালারিকো বাইরের বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপ সামলে কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করেছেন। মাত্র দুই বছর আগে ওহাইও এবং টেক্সাস উভয় রাজ্যেই ডাবল-ডিজিটের (দুই অঙ্কের) ব্যবধানে ট্রাম্প জয়ী হয়েছিলেন।

সাউথ ক্যারোলাইনায়, যে রাজ্যটিতে ২০২৪ সালে ট্রাম্প প্রায় ১৮ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন, সেখানে শিশু বিশেষজ্ঞ অ্যানি অ্যান্ড্রুস রিপাবলিকান সিনেটর ডার্লিন গ্রাহামকে পরাজিত করে জয়ী হয়েছেন। গ্রাহাম তার ভাই সিনেটর লিন্ডসি গ্রাহামের মৃত্যুর পর এই আসনে নিযুক্ত হয়েছিলেন।

স্পষ্ট দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠিত প্রার্থীদের বাদ দিয়ে ট্রাম্প প্যাক্সটন এবং গ্রাহামকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। প্যাক্সটন একাধিক বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন, যার মধ্যে রয়েছে তার ২০২৩ সালের অভিশংসন এবং সিকিউরিটিজ জালিয়াতির অভিযোগ, আর গ্রাহামের নিজের মুখে স্বীকার করা অনভিজ্ঞতা তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছিল।

নির্বাচনী প্রচারণার শেষ মুহূর্তের ঝোড়ো অভিযানের অংশ হিসেবে—যার মধ্যে দুই ডজনেরও বেশি সমাবেশ অন্তর্ভুক্ত ছিল—ট্রাম্প প্যাক্সটন, গ্রাহাম এবং হাস্টেডের পক্ষে ব্যাপক প্রচারণা চালান। তার সমর্থকদের চাঙ্গা করতে প্রেসিডেন্ট তাদের বারবার বলেন, 'ধরে নিন ব্যালটে আমিই আছি।'

মঙ্গলবার রাতে, যখন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে রিপাবলিকানরা তাদের কংগ্রেশনাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন, ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, 'আমি ব্যালটে ছিলাম না; আর যদি থাকতাম, তবে আমরা ভূমিধস জয় পেতাম! এই বিষয়টি মনোযোগ দিয়ে দেখার জন্য ধন্যবাদ।'

ডেমোক্র্যাটদের এই জোয়ার ট্রাম্পের অর্থনীতি পরিচালনা এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর সিদ্ধান্তের প্রতি ভোটারদের গভীর অসন্তোষ প্রকাশ করে, যা তেলের দাম একলাফে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিল। একের পর এক জরিপে ভোটাররা জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং ট্রাম্প এই বিষয়টি যেভাবে সামলেছেন তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।   নর্থ ক্যারোলাইনার সেনেট দৌড়ে রয় কুপারের জয়ের পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটরা সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দখলের জন্য প্রয়োজনীয় চারটি আসনই নিজেদের দখলে নিয়ে এসেছে, যদি তারা মিশিগান ও মিনেসোটায় নিজেদের আসনগুলো ধরে রাখতে পারে।ডেমোক্র্যাটরা জর্জিয়া এবং নিউ হ্যাম্পশায়ারেও সেনেটের আসন ধরে রেখেছে, যে দুটি লড়াই একসময় তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মনে করা হলেও ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাসের সাথে সাথে রিপাবলিকানদের নাগালের বাইরে চলে যায়।

ট্রাম্পকে তিরস্কার
জর্জিয়াতে বিজয়ী ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর জন অসফ তার বিজয় উদযাপনের অনুষ্ঠানে সমর্থকদের বলেন, 'এক ব্যাপক ও নির্ণায়ক বিজয়ে আমেরিকার জনগণ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প নামক ব্যক্তির বিকৃতি, দুর্নীতি এবং অক্ষমতাকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।'

রয়টার্স এবং ইউএসএ টুডে-র ভোট গণনা অনুযায়ী, ফ্লোরিডায় রিপাবলিকান সিনেটর অ্যাশলি মুডি ডেমোক্র্যাট অ্যান্ডি নিক্সনকে পরাজিত করলেও তিনি মাত্র ৩ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। অথচ ২০২৪ সালে এই রাজ্যে ট্রাম্প ১৩ পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। এটি এই বিষয়েরই আরেকটি প্রমাণ যে এমনকি শক্ত রিপাবলিকান রাজ্যগুলোও ডেমোক্র্যাটদের দিকে নাটকীয়ভাবে ঝুঁকে পড়ছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা ফ্লোরিডার যেসব হাউস ডিস্ট্রিক্টের সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করেছিলেন—যার সবকটিতে ট্রাম্প অন্তত ৯ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন—সেখানেও ডেমোক্র্যাটরা তিনটি আসন ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।

মেজর টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসসহ বেশ কয়েকটি মার্কিন সংবাদমাধ্যমের কনসোর্টিয়ামের পক্ষে এসএসআরএস-এর পরিচালিত বুথফেরত জরিপ অনুসারে, দেশজুড়ে অর্ধেক ভোটার বলেছেন যে তারা ২০২৬ সালের এই মধ্যবর্তী নির্বাচনকে প্রেসিডেন্টের প্রতি ক্ষোভ ও অনাস্থা প্রকাশের সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। এছাড়া তিন- চতুর্থাংশ ভোটার বলেছেন যে দেশ যে পথে এগোচ্ছে তাতে তারা 'ক্ষুব্ধ' বা 'অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।'

পাশাপাশি, জরিপ করা ৭০ শতাংশ ভোটার বলেছেন যে তারা চান কংগ্রেস যেন প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর আরো কার্যকর নজরদারি ও ভারসাম্য (চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স) বজায় রাখে।

ট্রাম্পের নির্বাচনী পর্যবেক্ষক মোতায়েন

আইন পর্যবেক্ষক এবং ডেমোক্র্যাটরা সতর্ক করেছিলেন যে ট্রাম্প—যিনি দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন নির্বাচনকে 'কারচুপিপূর্ণ' বলে মিথ্যা দাবি করে আসছেন—রিপাবলিকানরা হেরে গেলে মঙ্গলবারের ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করতে পারেন।

মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে, তারা ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নির্বাচনী পর্যবেক্ষণ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই ১,০০০ জন নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও নিরীক্ষক মোতায়েন করেছে।ডেমোক্র্যাটরা এই পরিকল্পনাটিকে ভোটারদের ভয় দেখানোর একটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে সমালোচনা করেছেন। রয়টার্সের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিচার বিভাগের তালিকাভুক্ত এলাকাগুলোর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশেই ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট কামালা হ্যারিস ট্রাম্পের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন।বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তারা এই পর্যবেক্ষণ উদ্যোগ নিয়ে কোনো সমস্যার কথা জানাননি। নিউ মেক্সিকোর সেক্রেটারির দফতর জানিয়েছে যে একটি কাউন্টিতে ফেডারেল পর্যবেক্ষকদের 'অস্বাভাবিক প্রশ্ন' জিজ্ঞেস করার খবর পাওয়া গেছে এবং বিচার বিভাগ আশ্বাস দিয়েছে যে এই আচরণের বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।