
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও রাজ্যে একটি অ্যালুমিনিয়াম পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান চালান ডাগ রেন্ডে। তার মতে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের কারণে বার্ষিক খরচ কয়েক মিলিয়ন ডলার বেড়ে গেছে এবং সম্প্রতি ইরান যুদ্ধের ফলে পণ্য চালান আরো ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের অর্থনৈতিক নীতির কারণে বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়া বহু মার্কিন উৎপাদনকারীর একজন রেন্ডে।
বার্তাসংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, পরিস্থিতি ‘হতাশাজনক’।
রেন্ডে আরো বলেন, ‘আমরা শুধু বর্তমান প্রশাসনের ওপরই নয়, বরং পুরো সরকারি ব্যবস্থার ওপর আস্থার ঘাটতি অনুভব করছি। নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেসের যে ভূমিকা থাকার কথা, তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।’
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর ট্রাম্প নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশ ও পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করেছেন।
অ্যালুমিনিয়ামের পাশাপাশি ইস্পাত ও গাড়ির ওপরও শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন হারে অতিরিক্ত শুল্ক দিতে হচ্ছে।
বিদেশী প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর বাড়তি শুল্কের কারণে কিছু মার্কিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেলেও অন্য অনেক প্রতিষ্ঠানকে ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার সাথে লড়তে হচ্ছে।
কানাডার সাথে ট্রাম্পের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যবিরোধ ও ইরানের সাথে যুদ্ধ পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে।
ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে জমে ওঠা অসন্তোষকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে চায় বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার লক্ষ্যে প্রচারণা চালাচ্ছে দলটি।
বাড়তি ব্যয় সামলানো কঠিন
ওহাইওর নর্থ জ্যাকসনে রেন্ডের প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের অ্যালুমিনিয়ামের নির্মাণসামগ্রী তৈরি ও সরবরাহ করে। এসব পণ্য বেড়া ও বিভিন্ন স্থাপনার কাজে ব্যবহৃত হয়।
ট্রাম্পের শাসনামলে অ্যালুমিনিয়ামের ওপর শুল্কের হার ধাপে ধাপে বেড়েছে। তার প্রথম মেয়াদে এই হার ছিল ১০ শতাংশ। পরে তা বেড়ে ২৫ শতাংশ হয় এবং গত বছর ৫০ শতাংশে পৌঁছায়। ফলে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সরাসরি অনুভব করছে তার প্রতিষ্ঠান।
রেন্ডে বলেন, ‘শুধু এ বছরই আমাদের ৪৫ লাখ থেকে ৫০ লাখ ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ক্রেতাদের ওপর আর কতটা বাড়তি খরচ চাপানো যায়, তার একটা সীমা আছে। তাই এই ব্যয়ের বড় একটি অংশ আমাদের নিজেদেরই বহন করতে হচ্ছে।’
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহন ব্যয়ও বেড়েছে। ইরানকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পণ্য পরিবহনে বাড়তি মাশুল গুনতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে।
রেন্ডে জানান, সরবরাহকারীদের কাছ থেকে আসা প্রতিটি পণ্যবাহী কনটেইনারের জন্য অতিরিক্ত পরিবহন মাশুল ছয় হাজার ৫০০ ডলারেরও বেশি হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে নতুন কর্মী নিয়োগ স্থগিত রেখেছেন তিনি। একইসাথে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আরো বেশি রোবট ব্যবহারের জন্য বিনিয়োগ করছেন।
ওহাইওর আরেক উৎপাদনকারী স্যাম মিলারও ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের দুই দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তিনি রান্নাঘর ও বাথরুমে ব্যবহৃত বিভিন্ন পণ্য তৈরি করেন। এশিয়া থেকে আমদানি করা কাঁচামালের ওপর তাকে শুল্ক দিতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, বাণিজ্যিক উত্তেজনার কারণে কানাডার বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ওহাইওর ওয়ারেন শহরে নিজের কারখানা থেকে এএফপিকে মিলার বলেন, ‘ব্যবসা পরিচালনা করাটাই এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। আমার মনে হয়, মানুষের মধ্যে রিপাবলিকানদের প্রতি সমর্থনের জায়গায় পরিবর্তন আসবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের আরোপ করা অনেক শুল্ক বাতিল করার পর মিলারের প্রতিষ্ঠান কিছু অর্থ ফেরত পেয়েছিল। তবে পরে ট্রাম্প আবারো সেগুলোর অনেকগুলো পুনর্বহাল করেন।
যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্য সম্পর্কে টানাপোড়েন
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্কের অবনতিও মিলারের ব্যবসায় নতুন চাপ তৈরি করেছে। গত আগস্টে বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে পড়ার পর দুই দেশই একে অপরের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে।
মিলার বলেন, ‘আমরা কানাডায় পণ্য বিক্রি করি। এই পরিস্থিতি আমাদের ও ক্রেতাদের—উভয় পক্ষের ওপরই বিশেষ চাপ সৃষ্টি করছে।’
চলতি বছর কানাডায় একটি পণ্য বিতরণকেন্দ্র খোলার পরিকল্পনা ছিল তার। কিন্তু বাণিজ্যিক উত্তেজনার কারণে সেই পরিকল্পনার অগ্রগতি ধীর হয়ে গেছে।
ইয়ংস্টাউন ওয়ারেন আঞ্চলিক বাণিজ্য চেম্বারের প্রেসিডেন্ট গাই কোভিয়েলো জানিয়েছেন, শুল্কনীতি, ইরান যুদ্ধ ও অভিবাসন পরিস্থিতির ওপর তিনি নিবিড় নজর রাখছেন।
প্রায় তিন হাজার সদস্যের প্রতিনিধিত্বকারী এই ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রধান বলেন, এসব বিষয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মিশ্র পরিস্থিতি তৈরি করেছে। তবে সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রভাবই বেশি।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু প্রতিষ্ঠান ক্রেতা হারিয়েছে, আবার কিছু প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসার পরিসর ছোট করতে হয়েছে।
কানাডা ওহাইওর সবচেয়ে বড় রফতানি বাজার। অঙ্গরাজ্যটির মোট রফতানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ যায় কানাডায়।
কোভিয়েলো বলেন, ‘পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে ওঠে যখন দেখা যায়, কিছু পণ্য সীমান্ত পেরিয়ে বারবার দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করে।’
ইরান যুদ্ধও ব্যবসায়ীদের চাপ বাড়াচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে ড্রোন হামলার কারণে অ্যালুমিনিয়াম সরবরাহও ব্যাহত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে নতুন অ্যালুমিনিয়াম গলন কারখানা গড়ে না ওঠার বিষয়টি উল্লেখ করে কোভিয়েলো বলেন, ‘প্রতিরক্ষা ও চিকিৎসা খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহৃত পণ্যের ক্ষেত্রে আমরা শুল্ক আরোপের পক্ষে।’
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যেসব পণ্য অত্যাবশ্যক নয় এবং যুক্তরাষ্ট্রেই পাওয়া যায় না, সেগুলোর ক্ষেত্রে শুল্ক আরোপের বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’
সূত্র : বাসস
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








