
গাজায় নজিরবিহীন গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ, ইউক্রেনে রাশিয়ার ‘বর্বর যুদ্ধ’, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিস্তার, বিশ্বক্ষমতার পরিবর্তন, সামরিক শক্তি দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার সীমাবদ্ধতা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী আসনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেয়া বিদায়ী ভাষণে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন সঙ্কট বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এগুলো একই গল্পের অংশ। আর সেই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষমতা—কারো হাতে তা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, আবার কারো কাছ থেকে তা কেড়ে নেয়া হচ্ছে।
গাজায় গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ
গাজা প্রসঙ্গে গুতেরেস বলেন, ৭ অক্টোবর হামাসের ভয়াবহ হামলার প্রায় তিন বছর হতে চলেছে। এরপর গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর যে হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের বছরগুলোতে তিনি এর চেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি আর দেখেননি।
তিনি বলেন, গত বছর এক পরামর্শমূলক মতামতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) স্পষ্টভাবে বলেছে, গাজায় জাতিসংঘকে তাদের দায়িত্ব পালন করতে দিতে হবে এবং জাতিসংঘের কর্মী ও মানবিক সহায়তাকর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন ও আদালতের আদেশ মেনে চলতে হবে।
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতি যেন বিশ্ব ভুলে না যায়, সে আহ্বানও জানান তিনি।
বিশ্বক্ষমতার পরিবর্তনে বড় ভূমিকা এআইয়ের
গুতেরেস বলেন, বিশ্বক্ষমতা এখন তিনটি প্রধান উপায়ে পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রথমত, রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নতুন নতুন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাবকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতা ক্রমেই ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের হাতে চলে যাচ্ছে। তৃতীয়ত, মানুষের কাছ থেকে যন্ত্রের দিকে ক্ষমতার স্থানান্তর ঘটছে, যার মধ্যে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র তৈরির বিষয়টিও রয়েছে।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যবস্থার বর্তমান প্রতিষ্ঠান ও কাঠামো এসব পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য এখনো প্রস্তুত নয়। ভাষণের শুরুতেই তিনি বলেন, ‘আমাদের বিশ্বের বিভাজনের রেখাগুলো আরও প্রশস্ত হচ্ছে।’ এ সময় যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে সৃষ্ট পরিবর্তনসহ বিশ্বের বিভিন্ন চলমান সঙ্কটের কথা তুলে ধরেন তিনি।
গুতেরেস বলেন, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে শান্তি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একইভাবে প্রযুক্তিগত বা অর্থনৈতিক শক্তিও একা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এমন একটি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ক্ষমতা আইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কার জীবন ও ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ হবে, তা নির্ধারণের চূড়ান্ত মাপকাঠি শক্তি হতে পারে না।’
তার ভাষায়, একুশ শতকে শান্তি মানে শুধু সংঘাতের অনুপস্থিতি নয়; শান্তি হলো সংযমের উপস্থিতি।
নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী আসনের আহ্বান
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার জন্য অন্তত একটি স্থায়ী আসন দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন গুতেরেস। তিনি বলেন, ‘একুশ শতকের নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার স্থায়ী আসন না থাকা অন্যায্য ও অগ্রহণযোগ্য। এটি অবশ্যই পরিবর্তন করতে হবে।’
নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য হলো চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে বিদ্যমান বৈশ্বিক বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে এই কাঠামো গড়ে ওঠে। সে সময় আফ্রিকার বড় একটি অংশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে থাকায় নিরাপত্তা পরিষদে মহাদেশটির পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্ব না থাকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনা রয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের ১০টি অস্থায়ী সদস্যপদ অঞ্চলভিত্তিকভাবে বণ্টন করা হলেও এসব সদস্যের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের মতো ভেটো ক্ষমতা নেই। আফ্রিকান ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা পরিষদে আফ্রিকার জন্য দুটি স্থায়ী ও আরও দুটি অস্থায়ী আসনের দাবি জানিয়ে আসছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও বক্তব্য দেন জাতিসংঘ মহাসচিব। প্রতিবেশী দেশটিতে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এর ফলে ইউক্রেন জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে পরিচালিত একটি ‘বর্বর যুদ্ধের’ শিকার হয়েছে। সম্মুখসারির যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে থাকলেও এখনো বেসামরিক মানুষ নিহত হচ্ছেন।
সূত্র: বিবিসি, আল জাজিরা ও সিএনএন








