বাংলাদেশের শ্রমবাজার, এআই ও কর্মসংস্থান, তরুণদের কর্মসংস্থান, শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, তৈরি পোশাকশিল্প, কারিগরি শিক্ষা
ইন্টারন্যাশনাল মনিটারি ফান্ড (আইএমএফ)। সংগৃহীত

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। একদিকে তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল সেবা, ফ্রিল্যান্সিং ও আধুনিক কৃষিতে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে; অন্যদিকে অটোমেশন ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার বিস্তারে প্রচলিত অনেক কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন কম দক্ষ শ্রমিক ও চাকরিপ্রত্যাশী তরুণেরা। এর সাথে যুক্ত হয়েছে শিক্ষিত বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি এবং শিক্ষাব্যবস্থার সাথে শিল্পের চাহিদার অসামঞ্জস্য।

Advertisement

বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের বড় সম্পদ। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মসংস্থানের সন্ধানে শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু তাদের সবার জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। উচ্চশিক্ষিত অনেক তরুণও যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে নিয়োগদাতারা প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী খুঁজতে সমস্যায় পড়ছেন।

অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত তৈরি পোশাক শিল্পেও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রভাব বাড়ছে। উৎপাদনশীলতা বাড়াতে কারখানাগুলোতে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা ও এআইভিত্তিক প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারিত হতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে একইসাথে কিছু পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে শ্রমিকের প্রয়োজন কমতে পারে। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না থাকলে নিম্নদক্ষ কর্মীরা ঝুঁকিতে পড়বেন।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনের ফাঁকে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

দক্ষতার ঘাটতি বড় বাধা শ্রমবাজারের চাহিদা দ্রুত বদলালেও শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা সেই পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে পারছে না। অনেক শিক্ষার্থী তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জন করলেও প্রযুক্তিগত দক্ষতা, যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান, তথ্য বিশ্লেষণ ও বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে থাকছেন। ফলে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে ডিজিটাল সাক্ষরতা, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, কারিগরি জ্ঞান এবং নতুন দক্ষতা শেখার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। শুধু উচ্চশিক্ষার সনদ নয়, বাস্তব কাজের উপযোগী দক্ষতাই চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখবে।

নারী ও অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারেও ঝুঁকি বাংলাদেশের শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব, শিশুযত্নের সীমাবদ্ধতা, যাতায়াত সমস্যা ও সামাজিক বাধার কারণে অনেক নারী কর্মসংস্থানে যুক্ত হতে পারেন না। আবার অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের নিয়মিত আয়, চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা সীমিত। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে তাদের আয় ব্যাহত হলে বিকল্প কাজ খুঁজে পাওয়াও কঠিন হতে পারে।

তবে এআইকে শুধু কর্মসংস্থান হারানোর কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সফটওয়্যার উন্নয়ন, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল বিপণন, অনলাইন ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, আধুনিক কৃষি ও সবুজ অর্থনীতিতে নতুন কাজের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন মানসম্মত ইন্টারনেট, প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ এবং তরুণদের প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ।

প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারের চাহিদার সাথে সমন্বয় করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সাথে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা এবং কর্মরত শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা এবং নতুন কর্মসংস্থানে প্রবেশের সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে শ্রমিকদের খাপ খাওয়ানো। সময়োপযোগী নীতি, দক্ষতা উন্নয়ন ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে এআই কর্মসংস্থান সঙ্কটের পরিবর্তে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।