
ইউরোপের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে, যেগুলো উচ্চারণ করলেই একটি পুরো যুগ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তেমনই এক নাম। যুদ্ধক্ষেত্রে অসাধারণ সাফল্য, রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যাপক সংস্কার, রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যের পতন; নেপোলিয়নের জীবন যেন এক মহাকাব্যিক উত্থান-পতনের কাহিনি। কর্সিকার ছোট্ট শহর আজাক্সিও থেকে উঠে এসে তিনি একসময় ফ্রান্সের সম্রাট হয়েছিলেন এবং ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিলেন। আবার সেই তিনিই জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন দক্ষিণ আটলান্টিকের প্রত্যন্ত দ্বীপ সেন্ট হেলেনায় নির্বাসিত অবস্থায়।
১৭৬৯ সালের ১৫ আগস্ট আজাক্সিওতে নেপোলিয়নের জন্ম। তার পরিবার ছিল কর্সিকান এবং পরে ফ্রান্সের সাথে কর্সিকার সম্পর্ক দৃঢ় হওয়ার পর পরিবারটি অভিজাত মর্যাদা লাভ করে। সামরিক শিক্ষায় শিক্ষিত নেপোলিয়ন খুব অল্প বয়সেই নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন। ফরাসি বিপ্লব তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পুরোনো রাজতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়ার সাথে সাথে প্রতিভাবান তরুণ সামরিক কর্মকর্তাদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হয়। নেপোলিয়ন সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে পেরেছিলেন অসাধারণ দক্ষতায়।
১৭৯৩ সালে তুলোঁ অভিযানে তার ভূমিকা তাকে দ্রুত সামরিক খ্যাতি এনে দেয়। ব্রিটিশ-সমর্থিত রাজতন্ত্রীদের কাছ থেকে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরটি পুনর্দখলের অভিযানে তার কৌশলগত দক্ষতা নজরে পড়ে। মাত্র ২৪ বছর বয়সেই তিনি জেনারেল পদে উন্নীত হন। এরপর ইতালি ও মিশর অভিযানে তার সাফল্য তাকে ফ্রান্সের মানুষের কাছে জাতীয় বীরের মর্যাদা এনে দেয়। তবে সামরিক বিজয়ের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
১৭৯৯ সালে ফ্রান্স ছিল গভীর রাজনৈতিক সঙ্কটে। ডিরেক্টরি সরকার দুর্বল হয়ে পড়েছিল, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল নাজুক এবং ইউরোপের একাধিক শক্তি ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। সাধারণ মানুষের অসন্তোষও বাড়ছিল। এই অস্থিরতার মধ্যেই ৯ নভেম্বর ১৭৯৯, ফরাসি বিপ্লবী ক্যালেন্ডারের ১৮ ব্রুমেয়ারে, নেপোলিয়ন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ডিরেক্টরি সরকারের অবসান ঘটান। প্রতিষ্ঠিত হয় কনসুলেট ব্যবস্থা এবং তিনি হন প্রথম কনসাল। সংবিধানে তিন কনসালের কথা থাকলেও বাস্তব ক্ষমতা দ্রুত তার হাতেই কেন্দ্রীভূত হয়।
ক্ষমতায় এসে নেপোলিয়ন শুধু নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সুসংহত করেননি, ফ্রান্সের রাষ্ট্রব্যবস্থাতেও ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। প্রশাসনকে আরো কেন্দ্রীভূত করা হয়, বিচারব্যবস্থায় সংস্কার আনা হয় এবং আইনকে একটি অভিন্ন কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেয়া হয়। তার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকারগুলোর একটি ছিল সিভিল কোড, যা পরে ‘কোড নেপোলিয়ন’ নামে পরিচিত হয়। ব্যক্তি, পরিবার, সম্পত্তি ও নাগরিক অধিকারের নানা বিষয়কে এই আইনের মাধ্যমে নতুনভাবে সংগঠিত করা হয়। ফ্রান্সের সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপের বহু দেশেও এই আইনি কাঠামোর প্রভাব পড়ে।
নেপোলিয়ন বিপ্লব-পরবর্তী ফ্রান্সের ধর্মীয় বিভাজনও কমানোর চেষ্টা করেন। ১৮০১ সালের কনকর্ডাটের মাধ্যমে ক্যাথলিক চার্চের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্গঠিত হয়। বিপ্লবের সময় চার্চের সাথে রাষ্ট্রের যে তীব্র সংঘাত তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই প্রশমিত হয়। কিন্তু একই সময়ে নেপোলিয়নের শাসন ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে। সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ, কঠোর সেন্সরশিপ এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রচারব্যবস্থা তার ক্ষমতাকে আরো শক্তিশালী করে।
১৮০৪ সালে তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নতুন পর্যায়ে পৌঁছায়। তিনি ফ্রান্সের সম্রাট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। ২ ডিসেম্বর প্যারিসের নোত্র-দাম গির্জায় অনুষ্ঠিত হয় তার ঐতিহাসিক অভিষেক। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পোপ সপ্তম পায়াস। নেপোলিয়ন ও তার স্ত্রী জোসেফিনের অভিষেকের মধ্য দিয়ে বিপ্লব-পরবর্তী ফ্রান্সে নতুন সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। পরে রাজপরিবারের আদলে অভিজাত মর্যাদা পুনঃপ্রবর্তিত হয় এবং ১৮০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় সাম্রাজ্যিক অভিজাত শ্রেণি।
সম্রাট হওয়ার পর নেপোলিয়নের সামরিক অভিযান আরো বিস্তৃত হয়। ব্রিটেন, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়ার মতো ইউরোপীয় শক্তিগুলো বিভিন্ন সময়ে তার বিরুদ্ধে জোট গঠন করে। নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীও একের পর এক বিজয় অর্জন করে। ১৮০৫ সালের অস্টারলিৎসের যুদ্ধ তার সামরিক জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাফল্য। এরপর ইয়েনা, ফ্রিডল্যান্ড ও ভ্যাগ্রামের মতো যুদ্ধেও ফরাসি বাহিনী জয়ী হয়। ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল তখন তার প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে।
কিন্তু সাম্রাজ্যের এই জয়যাত্রার মধ্যেই পরাজয়ের বীজও লুকিয়ে ছিল। ১৮০৫ সালের ট্রাফালগারে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর কাছে ফরাসি নৌবহরের পরাজয় নেপোলিয়নের ব্রিটেনকে সামরিকভাবে পরাস্ত করার পরিকল্পনায় বড় আঘাত হানে। আরো ভয়াবহ বিপর্যয় আসে ১৮১২ সালে রাশিয়া অভিযানে। বিপুল বাহিনী নিয়ে রাশিয়ায় প্রবেশ করেও নেপোলিয়ন কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন করতে পারেননি। দীর্ঘ সরবরাহপথ, খাদ্যসঙ্কট, রুশ প্রতিরোধ এবং প্রচণ্ড শীত তার সেনাবাহিনীকে বিপর্যস্ত করে। রাশিয়া থেকে ফিরে আসার সময় ফরাসি বাহিনীর দুর্দশা নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যের দুর্বলতা প্রকাশ করে দেয়। ১৮১৩ সালের লাইপজিগের পরাজয় সেই পতনকে আরো ত্বরান্বিত করে।
১৮১৪ সালের শুরুতে মিত্রবাহিনী ফ্রান্সে প্রবেশ করে। চারদিক থেকে চাপ বাড়তে থাকলে ৬ এপ্রিল নেপোলিয়ন সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ফঁতেনব্লোর চুক্তির মাধ্যমে তাকে ভূমধ্যসাগরের এলবা দ্বীপের শাসনভার দেয়া হয়। মনে হয়েছিল তার রাজনৈতিক জীবনের এখানেই শেষ। কিন্তু নেপোলিয়নের গল্প তখনও শেষ হয়নি।
১৮১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এলবা থেকে পালিয়ে তিনি ফ্রান্সে ফিরে আসেন। তার প্রতি অনুগত সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ আবার তার সাথে যোগ দেয় এবং মার্চে তিনি পুনরায় ক্ষমতা দখল করেন। ইতিহাসে এই সময়কাল ‘শত দিবস’ নামে পরিচিত। কিন্তু এবার তার প্রত্যাবর্তন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। ১৮১৫ সালের ১৮ জুন বেলজিয়ামের ওয়াটারলুতে ব্রিটিশ ও প্রুশিয়ান বাহিনীর কাছে তার চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে। মাত্র চার দিন পর তিনি আবার সিংহাসন ত্যাগ করেন। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য এবং তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়।
এবার তাকে নির্বাসিত করা হয় দক্ষিণ আটলান্টিকের প্রত্যন্ত ব্রিটিশ দ্বীপ সেন্ট হেলেনায়। ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু দূরে, সমুদ্রবেষ্টিত এই দ্বীপেই জীবনের শেষ বছরগুলো কাটান একসময়ের ইউরোপ-শাসক। সেখানে তিনি নিজের স্মৃতিকথা রচনায় মন দেন এবং নিজের জীবনের ঘটনাগুলোকে এমনভাবে তুলে ধরেন, যা পরবর্তী সময়ে তার কিংবদন্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৮২১ সালের ৫ মে সেন্ট হেলেনায় নেপোলিয়নের মৃত্যু হয়। কিন্তু মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার প্রভাব শেষ হয়নি। প্রায় দুই দশক পর, ১৮৪০ সালে রাজা লুই-ফিলিপের উদ্যোগে তার দেহ ফ্রান্সে ফিরিয়ে আনা হয়। প্যারিসের লে জঁভালিদে তার সমাধি আজও ফরাসি ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।
সাম্প্রতিক এক দর্শনার্থী নেপোলিয়নের সমাধি সামনে থেকে দেখে লিখেছেন, এটি তাকে ‘বেশ গভীরভাবে মুগ্ধ’ করেছে। আরেক পর্যটকের ভাষায়, সমাধিটি ছিল ‘সত্যিই শ্বাসরুদ্ধকর’। অনেকেই জানান, নেপোলিয়নের সমাধি দেখতে এসেই তারা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি সময় লে জঁভালিদে কাটিয়েছেন। সামরিক জাদুঘরের সংগ্রহ, স্থাপত্য এবং ইতিহাস তাদের ভ্রমণকে আরো সমৃদ্ধ করেছে।
এই প্রতিক্রিয়াগুলো হয়তো বোঝায়, কেন দুই শতাব্দী পরও নেপোলিয়নকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল এতটুকু কমেনি। তার জীবন ছিল একদিকে অসাধারণ উত্থানের গল্প, অন্যদিকে ক্ষমতার সীমা অতিক্রম করার পরিণতিরও শিক্ষা।
নেপোলিয়নের উত্তরাধিকার তাই একরৈখিক নয়। তিনি ছিলেন একদিকে আধুনিক ফরাসি রাষ্ট্রের অন্যতম নির্মাতা, অন্যদিকে ছিলেন যুদ্ধ ও সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রতীক। তার আইনসংস্কার ও প্রশাসনিক পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে, আবার তার সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইউরোপে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও বিপুল প্রাণহানির কারণ হয়েছে। তিনি ফরাসি বিপ্লবের সুযোগে ক্ষমতায় উঠেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিপ্লবের অনেক স্বাধীনতাকামী আদর্শকেই সীমিত করেছিলেন।
সমাধির সামনে দাঁড়িয়ে পর্যটকদের প্রতিক্রিয়ায় সেই ইতিহাসের আবেগ যেন আবার ফিরে আসে। একজন সাম্প্রতিক দর্শনার্থী লিখেছেন, নেপোলিয়নের সমাধি সামনে থেকে দেখা ছিল তার সফরের অন্যতম আকর্ষণ। আরেকজন জানান, তিনি মূলত সমাধি দেখতে গিয়েছিলেন, কিন্তু পরে জাদুঘরের সামরিক সংগ্রহ দেখতে এতটাই আগ্রহী হয়ে পড়েন যে কয়েক ঘণ্টা সেখানে কাটিয়ে দেন। ইতিহাসপ্রেমীদের কাছে জায়গাটি বিশেষভাবে আকর্ষণীয় বলেও পর্যটকদের মন্তব্যে উঠে এসেছে।
আরেক দর্শনার্থীর ভাষায়, লে জঁভালিদ শুধু নেপোলিয়নের সমাধির জন্য নয়, পুরো স্থাপত্য ও ইতিহাসের কারণে স্মরণীয়। কেউ কেউ এটিকে প্যারিসের ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত শান্ত এক ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখেছেন। সাম্প্রতিক পর্যটক পর্যালোচনায় এমন মন্তব্যও এসেছে যে, নেপোলিয়নের সমাধি ছিল পুরো সফরের ‘চূড়ান্ত আকর্ষণ’।
সমাধির সামনে দাঁড়ালে তাই ইতিহাস যেন শুধু বইয়ের পাতায় থাকে না। সোনালি গম্বুজের নিচে বিশাল সমাধির দিকে তাকিয়ে একজন পর্যটক একই সাথে দেখতে পান বিজয়ী সম্রাটের স্মৃতি, পরাজিত সেনাপতির পরিণতি এবং নির্বাসিত এক মানুষের নিঃসঙ্গ জীবন। নেপোলিয়নের মৃত্যুর দুই শতাব্দী পরও সেই দৃশ্য দর্শকদের থামিয়ে দেয়, ভাবায়।
তার মৃত্যুর পরও ‘নেপোলিয়ন’ নামটি ফ্রান্সের রাজনীতিতে ফিরে আসে। তার ভাতিজা লুই-নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ১৮৪৮ সালে ফ্রান্সের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হন এবং ১৮৫২ সালে নেপোলিয়ন তৃতীয় নামে সম্রাট হয়ে দ্বিতীয় ফরাসি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৭০ সালে প্রুশিয়ার কাছে ফ্রান্সের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে সেই সাম্রাজ্যেরও পতন ঘটে।
তবু ইতিহাসে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের স্থান অনন্য। কারণ তার জীবন কেবল একজন সেনাপতি বা সম্রাটের জীবনকাহিনি নয়; এটি ক্ষমতার প্রকৃতি, উচ্চাকাঙ্ক্ষার সীমা এবং ইতিহাস কীভাবে একজন মানুষকে একই সাথে নায়ক ও বিতর্কিত চরিত্রে পরিণত করতে পারে, তার এক অসাধারণ উদাহরণ। কর্সিকার এক তরুণ সামরিক কর্মকর্তা থেকে ফ্রান্সের সম্রাট, তারপর ওয়াটারলুর পরাজিত শাসক এবং সেন্ট হেলেনার নির্বাসিত বন্দি—নেপোলিয়নের এই দীর্ঘ যাত্রাই তাকে ইতিহাসের পাতায় অমর করে রেখেছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








