ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, অভিবাসন
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ লন্ডনে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নিয়ে আলোচনা করছেন ছবি: নয়া দিগন্ত

যুক্তরাজ্যের সাথে চালু থাকা ওয়ান ইন, ওয়ান আউট অভিবাসন চুক্তির পরীক্ষামূলক কার্যক্রম আগামী ১ অক্টোবরের পর আর চালিয়ে যেতে চায় না ফ্রান্স। বিষয়টির সাথে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম রেডিও ফ্রান্স জানায়, ১৬ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের অবস্থান সম্পর্কে এ তথ্য জানা গেছে। সূত্রটির দাবি, ২০২৫ সালের গ্রীষ্মে স্বাক্ষরিত ও ওই বছরের আগস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই চুক্তি আর বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা নেই ফ্রান্সের।

ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সম্পাদিত এই চুক্তির মূল উদ্দেশ ছিল ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ছোট নৌকায় করে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো অভিবাসীদের একটি অংশকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর বিনিময়ে ফ্রান্সে অবস্থানরত নির্দিষ্টসংখ্যক অভিবাসীকে বৈধভাবে যুক্তরাজ্যে নেয়া। একজন প্রবেশ করলে একজন ফেরত—এই নীতির ভিত্তিতে চুক্তিটির নাম দেয়া হয় ওয়ান ইন, ওয়ান আউট। এর মাধ্যমে ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দেয়ার প্রবণতা কমানোর পাশাপাশি বৈধ অভিবাসনের একটি পথ তৈরি করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছিল।

চুক্তিটি চালু হওয়ার পর থেকেই এর কার্যকারিতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি দেখা দিয়েছে। ফ্রান্স মনে করছে, শুধু দুই দেশের মধ্যে এমন একটি দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর সমাধান হতে পারে না। দেশটি এখন যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে আরো বিস্তৃত একটি অভিবাসন চুক্তির দিকে অগ্রসর হতে আগ্রহী। 

ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজও এর আগে এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন। জুন মাসে জাতীয় পরিষদের একটি কমিশনে বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, ‘ফ্রান্স যুক্তরাজ্যের সাথে বর্তমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চায়।’

তবে লন্ডন এই চুক্তি অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ পরীক্ষামূলক ব্যবস্থাটিকে সমর্থন করে এটিকে স্থায়ী করার পাশাপাশি ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো মানুষের সংখ্যা বাড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামও ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁকে চুক্তিটির মেয়াদ বাড়ানোর আহ্বান জানান। 

ব্রিটিশ সরকারের মতে, পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো কিছু মানুষকে বাস্তবে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো সম্ভব। এ কারণে লন্ডন এই ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়।

২০২৫ সালের গ্রীষ্মে স্বাক্ষরিত চুক্তিটির ঘোষিত লক্ষ্য ছিল প্রায় দুই হাজার ৫০০ জনের বিনিময়। ব্রিটিশ সরকারের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত যুক্তরাজ্য থেকে প্রায় এক হাজার ৪০০ জনকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে প্রায় সমসংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীকে ফ্রান্স থেকে বৈধ প্রক্রিয়ায় যুক্তরাজ্যে স্থানান্তর করা হয়েছে। তবে ইংলিশ চ্যানেল দিয়ে ছোট নৌকায় যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো মোট মানুষের তুলনায় এই বিনিময়ের সংখ্যা সীমিত। চুক্তি চালুর পর থেকে চ্যানেল পাড়ি দেয়া মোট মানুষের আনুমানিক চার শতাংশের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে।

চুক্তিটির আর্থিক ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মঙ্গলবার ব্রিটিশ সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ জানান, বর্তমানে একজনকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠাতে যুক্তরাজ্যের প্রায় ৫৬ হাজার পাউন্ড বা প্রায় ৬৫ হাজার ইউরো খরচ হচ্ছে। এক হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষকে ফেরত পাঠানোর হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত এই ব্যবস্থায় যুক্তরাজ্যের ব্যয় প্রায় ৭৮ মিলিয়ন পাউন্ডে দাঁড়িয়েছে।

ফলে ১ অক্টোবরের পর এই চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের অবস্থানের পার্থক্য আরো স্পষ্ট হয়েছে। প্যারিস যেখানে দ্বিপক্ষীয় পরীক্ষামূলক ব্যবস্থা থেকে সরে গিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সম্পৃক্ত করে বৃহত্তর অভিবাসন সমাধানের পক্ষে, সেখানে লন্ডন বর্তমান ব্যবস্থাকে অব্যাহত ও স্থায়ী করতে চাইছে। এখন দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে চুক্তিটির পরবর্তী পরিণতি নির্ধারিত হওয়ার কথা।