নোবিপ্রবির জুলাইয়ের ডকুমেন্টারি নিয়ে বিতর্ক, বাদ আন্দোলনের অনেক মুখ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে ডকুমেন্টারিতে ছাত্রদলের কার্যক্রমকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে না রাখা ও নোবিপ্রবির ছাত্রদল শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ডকুমেন্টারির কমিটিতে রাখা নিয়ে সমালোচনা করছেন সংশিষ্টরা।

Location :

Noakhali
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় |নয়া দিগন্ত

নোবিপ্রবি প্রতিনিধি
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) প্রদর্শিত একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ডকুমেন্টারিতে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠন ছাত্রদলের কার্যক্রমকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে জুলাই আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত ছিলেন এমন অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর বক্তব্য বা ভিডিও রাখা হয়নি। ফলে ডকুমেন্টারিটি একপাক্ষিক হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ।

আরো বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ডকুমেন্টারি প্রদর্শন-সংক্রান্ত উপ-কমিটিতে নোবিপ্রবি শাখা ছাত্রদলের সভাপতি জাহিদ হাসান ও সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হোসেনের অন্তর্ভুক্তি। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, যারা কমিটিতে ছিলেন, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার কারণে ডকুমেন্টারিতে জুলাই আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ উপস্থাপনে ভারসাম্য নষ্ট হয়।

গত বুধবার (৫ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোহাম্মদ রুহুল আমিন অডিটোরিয়ামে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের আলোচনা সভার আগে ডকুমেন্টারিটি প্রদর্শন করা হয়। এতে নোবিপ্রবির শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জুলাই আন্দোলনে ভূমিকার বিভিন্ন দৃশ্য তুলে ধরা হয়।

তবে ডকুমেন্টারি ঘেঁটে অভিযোগ ওঠে, বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলামের ছবি ও ভিডিও বক্তব্য রাখা হলেও জুলাই আন্দোলনের সাথে যুক্ত বলে পরিচিত জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সদস্যসচিব ও ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম আরিফুর রহমান, ফলিত গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল করিম, জামাল উদ্দিনসহ কয়েকজন শিক্ষকের ছবি বা বক্তব্য রাখা হয়নি।

শুধু শিক্ষকদের ক্ষেত্রেই নয়, শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। ডকুমেন্টারিতে ছাত্রদলের সভাপতি জাহিদ ও সাধারণ সম্পাদক হাসিবুলের ভিডিও বক্তব্য দেখানো হলেও নোয়াখালী জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান আরিফ, সদস্যসচিব বনী ইয়ামিন, নোবিপ্রবি ছাত্রশিবির শাখার সভাপতি আরিফুল ইসলাম সৈকত, সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান, শাখা বায়তুলমাল সম্পাদক মেহেদী হাসান, শিবিরের সাবেক নেতা জানে আলম ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নোয়াখালী জেলা সদস্যসচিব মেহেদী হাসান সীমন্তের ক্ষেত্রে গ্রুপ ছবি থাকলেও ভিডিও বক্তব্যের ক্লিপ রাখা হয়নি।

এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনে সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি করা বিজিই বিভাগের সালাউদ্দিন মহসিন, ফলিত গণিত বিভাগের জাহিদ হাসান এবং এসিসিই বিভাগের মেহেদী হাসানের কোনো বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপও দেখানো হয়নি।

আন্দোলনের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা ও ভারতীয় আধিপত্যবিরোধী আন্দোলনে নিহত শরিফুল ইসলাম ওসমান হাদি ও স্কুল শিক্ষার্থী আনাসের কোনো ক্লিপ ডকুমেন্টারিতে রাখা হয়নি বলেও অভিযোগ করেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের অনুষ্ঠানে ভিডিও প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য একটি উপ-কমিটি করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে প্রথমে জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ও নোবিপ্রবি সাদা দলের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. মো: জাহাঙ্গীর সরকারকে রাখা হয়েছিল। তিনি সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বদলি হওয়ার পর নোবিপ্রবির নবনিযুক্ত কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো: হাসান উদ্দিনকে আহ্বায়ক করা হয়।

কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন আইসিটি সেলের সিস্টেম অ্যানালিস্ট ফয়েজ আহমেদ, ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো: মহিউদ্দিন আল ফয়সল, কম্পিউটার অপারেটর আব্দুর রহিম এবং বাংলা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এম ডি মাসুদ রহমান। এর সাথে ছাত্রদলের নোবিপ্রবি শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

কমিটিতে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাদের অন্তর্ভুক্তি এবং পরবর্তী সময়ে ডকুমেন্টারিতে তাদের বক্তব্য প্রদর্শনের বিষয়টি নিয়েই এখন প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

ডকুমেন্টারি প্রদর্শন নিয়ে আলোচনা সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ফলিত গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল করিম জানান, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নোয়াখালীতে সরাসরি অংশ নেয়া শিক্ষকদের মধ্যে তিনি একজন। কিন্তু ডকুমেন্টারিতে তার একটি ছবিও দেখানো হয়নি।

তিনি বলেন, ‘সকল মতের ঊর্ধ্বে উঠে ডকুমেন্টারি প্রদর্শন করতে না পারা আমাদের জন্য লজ্জার।’

এসিসিই বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, ‘ডকুমেন্টারিতে সংশ্লিষ্টদের নিজেদের এবং ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতাদের বক্তব্য ও আন্দোলনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।’ তার অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের অবদান হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়।

ডকুমেন্টারির অসঙ্গতির বিষয়ে কমিটির আহ্বায়ক ও নোবিপ্রবির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো: হাসান উদ্দিন জানান, তাকে ভিডিও ডকুমেন্টারি দেখানো হলেও কার কার অবদান তুলে ধরা হবে, তা কমিটির অন্য সদস্যরা ঠিক করেন। তিনি কিছুদিন আগে দায়িত্ব নেয়ায় নোবিপ্রবিতে কারা আন্দোলনে বেশি ভূমিকা রেখেছেন, তা তার জানা ছিল না।

তিনি আরো জানান, ভিডিওতে কিছু ছোটখাটো ভুল তিনি দেখেছিলেন ও সেগুলো ভিসির সাথে আলোচনা করে ঠিক করতে বলেছিলেন।

তবে প্রশ্ন ওঠেছে, ডকুমেন্টারি প্রদর্শনের আগে তাতে কারা স্থান পেলেন আর কারা বাদ পড়লেন এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যাচাই না করেই কিভাবে সেটি অনুষ্ঠানে প্রদর্শনের অনুমতি পেল।

একপাক্ষিক ডকুমেন্টারি তৈরির অভিযোগের বিষয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস পালন কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, কয়েকজন তাকে বিষয়টি জানান। কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অবদান ডকুমেন্টারিতে তুলে ধরা হয়নি বলেও তিনি শুনেছেন।

তিনি বলেন, ‘ডকুমেন্টারি কমিটিতে যারা ছিলেন, তারা এ বিষয়ে ভালো জানবেন। তবে সামনে থেকে এসব বিষয়ে যাতে কোনো অসঙ্গতি না থাকে, সেটা আমরা দেখব।’

তবে সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মতো একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক আয়োজনে তৈরি ডকুমেন্টারিতে কারা থাকবেন, কারা বাদ পড়বেন এমন সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক ভারসাম্য ও আন্দোলনে বাস্তব ভূমিকার বিষয়টি কেন আগে যাচাই করা হলো না। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতি ও অবদান সংরক্ষণের নামে তৈরি এই ডকুমেন্টারিই এখন নোবিপ্রবিতে নতুন করে রাজনৈতিক পক্ষপাতের বিতর্ক তৈরি করেছে।