দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চালু হতে যাচ্ছে সমন্বিত কৃষক কার্ড। প্রথম দফায় ‘কৃষক কার্ড’ পাচ্ছেন চট্টগ্রাম বিভাগের কৃষকরা।
কৃষকের পেশাগত পরিচয়, ব্যাংকিং সুবিধা ও সরকারি কৃষিসেবা একই ব্যবস্থার আওতায় আনতে এই সমন্বিত কৃষক কার্ড চালু করা হচ্ছে।
প্রথম দফায় কৃষক কার্ড প্রদানের জন্য চট্টগ্রাম বিভাগের ৮টি জেলার ১৭ হাজার ৩২৬ জন কৃষককে চূড়ান্তভাবে মনোনীত করা হয়েছে।
আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর ফেনী জেলার ফুলগাজীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই কার্ড উদ্বোধন করার কথা রয়েছে। দেশের ৭৭টি কৃষি ব্লকে একযোগে এই কার্ড বিতরণ করা হবে।
তবে এখনো প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি চূড়ান্ত হয়নি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বাসসকে জানান, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে দেশের সব শ্রেণির কৃষককে ১৪ ডিজিটের একটি ইউনিক কৃষক আইডি দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একইসাথে কৃষক কার্ডটিকে ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড হিসেবেও ব্যবহারের সুযোগ থাকবে।
এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সারা দেশে কৃষক ও কৃষিজমির তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম চলছে। প্রাথমিকভাবে প্রতিটি উপজেলা থেকে একটি করে ব্লক নির্বাচন করে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এ কার্যক্রম সব ব্লকে সম্প্রসারণ করা হবে।
ঐতিহাসিক এই কর্মসূচির প্রথম দফায় চট্টগ্রাম বিভাগের মনোনীত কৃষকদের মধ্যে বেশির ভাগেরই ইতোমধ্যেই সরকারি ব্যাংকের শাখায় নিজের নামে হিসাব খোলা হয়েছে।
ফেনী জেলার ছয়টি উপজেলার কৃষকদের নিজ নামে হিসাব খোলার কাজটি শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, চট্টগ্রাম আঞ্চলিক কার্যালয়ের দেয়া তথ্যমতে, চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার একটি করে ব্লকে, কক্সবাজার জেলার পেকুয়া ও মহেশখালী উপজেলার একটি করে ব্লকে, ফেনীর জেলার ছয় উপজেলার ছয়টি ব্লকে, বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, লক্ষ্মীপুরের ও নোয়াখালী জেলার প্রত্যেকটির একটি উপজেলার একটি ব্লকের কৃষকদের হাতে প্রথম দফায় কৃষক কার্ড তুলে দেয়ার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে।
এর মধ্যে চট্টগ্রামের হাটহাজারীর মির্জাপুর ব্লকে ১,১৩৯ জন, রাউজানের হলদিয়া ইউনিয়নের উত্তর সর্তার ৪০০ জন, কক্সবাজারের মহেশখালীর হোয়ানক ইউনিয়নের হরিয়ারছড়ায় ২,০৯৬ জন, পেকুয়ার শিলখালী ইউনিয়নের শিলখালী ব্লকে ৯৬১ জন, বান্দরবানের রুমা উপজেলার পলি ব্লকে ৯৬৬ জন, রাঙ্গামাটি সদরের সাপছড়ি ব্লকে ৬৮২ জন, খাগড়াছড়ির দীঘিনালার মেরুং ব্লকের ১,৯০০, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের এখলাসপুর ইউনিয়নের পূর্ব এখলাসপুর ব্লকে ১,৩৩৯ জন, ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠাননগর ইউনিয়নের শিলুয়া ব্লকে ১,১৬০ জন, দাগনভূঁইয়ার সিন্দুরপুর ব্লকে ১,১৭৩ জন, সদরের কাজীরবাগ ইউনিয়নের সোনাপুর ব্লকে ৬৩৭ জন, ফুলগাজীর দরবারপুর ইউনিয়নের বসন্তনপুর ব্লকে ১৩৭৪ জন, পরশুরামের বকশ মাহমুদ ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর ব্লকে ১,৬২৩ জন, সোনাগাজী উপজেলার চর চান্দিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণ চর চান্দিয়া ব্লকে ১,৬৭৬ জন ও লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার চর আলগি ইউনিয়নের রামদয়াল ব্লকে ২০০ জন, সর্বমোট ১৭ হাজার ৩২৬ জন কৃষককে চূড়ান্তভাবে কার্ড প্রদানের জন্য মনোনীত করা হয়েছে।
এসব উপকারভোগী কিভাবে নির্বাচন করা হয়েছে— জানতে চাইলে চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন, ‘প্রত্যেক উপজেলায় ইউএনও’র নেতৃত্বে সিলেকশন কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেই কমিটির তত্ত্বাবধানে তথ্য সংগ্রহের পর নির্দিষ্ট যোগ্যতার ভিত্তিতে তাদেরকে মনোনীত করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই করে প্রকৃতপক্ষে যাকে কৃষক কার্ড দেয়া উচিত, তাকেই চূড়ান্তভাবে মনোনীত করা হয়েছে।
কৃষক কার্ডের সুবিধা প্রসঙ্গে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আরো বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের একটি ডিজিটাল ডেটাবেজের আওতায় আনার পাশাপাশি সার, বীজ, কীটনাশক, সেচ, কৃষিঋণ, কৃষি যন্ত্রপাতি, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, কৃষি প্রশিক্ষণ, আবহাওয়া ও বাজারদরের তথ্য, কৃষি বীমা এবং উৎপাদিত পণ্য ন্যায্যমূল্যে বিক্রির মতো সুবিধা দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, চট্টগ্রামের উপপরিচালক কৃষিবিদ আপ্রু মারমা বাসসকে বলেন, ‘কৃষক কার্ড দেশের কৃষি ব্যবস্থায় একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো একজন কৃষকের পেশাগত পরিচয়, কৃষিকাজের তথ্য, ব্যাংকিং সুবিধা ও সরকারি কৃষিসেবাকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনা হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষককে শুধু উৎপাদনকারী হিসেবে নয়, দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হিসেবে একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় দেয়াও সম্ভব হবে।
আপ্রু মারমা বলেন, ‘সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, কৃষকের কাছে সরকারি সেবা ও সহায়তা আরো দ্রুত, স্বচ্ছ ও সহজভাবে পৌঁছে দেয়া যাবে।’
তিনি আরো বলেন, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে দেশের কৃষকরা ধীরে ধীরে উন্নয়নের মূল স্রোতের সাথে আরো শক্তভাবে যুক্ত হবেন। এর ফলে কৃষকের সক্ষমতা বাড়ার পাশাপাশি কৃষির উৎপাদনশীলতা ও সামগ্রিক কৃষি উন্নয়ন আরো ত্বরান্বিত হবে।
আপ্রু মারমা বলেন, দেশের কৃষকদের জন্য এমন সমন্বিত উদ্যোগ এর আগে দেখা যায়নি। এটি কৃষি ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
কৃষক কার্ড নিয়ে সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে দেয়া ১৪ ডিজিটের ইউনিক কৃষক আইডি তৈরি হবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জিও কোড অনুযায়ী। এতে ধারাবাহিকভাবে থাকবে বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়নের কোড। এর সাথে যুক্ত হবে কৃষকের জন্য অতিরিক্ত ইউনিক কোড। আইডিতে বিভাগে ২ ডিজিট, জেলায় ২ ডিজিট, উপজেলায় ২ ডিজিট, ইউনিয়নে ৩ ডিজিট এবং অতিরিক্ত ৫ ডিজিটের ইউনিক কোড থাকবে।
কৃষক কার্ড শুধু কৃষকের পেশাগত পরিচয়ের জন্য নয়, ব্যাংকিং সুবিধার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করা হবে। সরকার নির্ধারিত ব্যাংকের শাখার মাধ্যমে কৃষকের হিসাব খুলে কার্ডটি দেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে একই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকের পরিচয় ও ব্যাংকিং সুবিধাকে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হবে।
কারা পাবেন কৃষক কার্ড
দেশের সব শ্রেণির কৃষককে এ কার্ডের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্রধারী যেসব বাংলাদেশী নাগরিক ফসল, মৎস্য বা প্রাণিসম্পদ উৎপাদনের সাথে সরাসরি যুক্ত, তারা কার্ড পাওয়ার যোগ্য হবেন।
নিজস্ব জমিতে চাষ করা কৃষকের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খামারিরাও এর আওতায় থাকবেন। মাছ চাষি, গবাদিপশু পালনকারী, হাঁস-মুরগি পালনকারী, ঘের বা পুকুর মালিকদের কৃষক হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এছাড়া জমির মালিক না হলেও ইজারা নিয়ে চাষ করা কৃষক ও বর্গাচাষিরাও কার্ড পাওয়ার যোগ্য হবেন। সরকার কর্তৃক কৃষি হিসেবে ঘোষিত যেকোনো কার্যক্রমের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদেরও কৃষক হিসেবে গণ্য করা হবে।
জমির ভিত্তিতে ৫ শ্রেণি
জমির পরিমাণের ভিত্তিতে কৃষকদের পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫ শতকের কম জমি থাকা কৃষক ‘ভূমিহীন’, .৫৪৯ শতক জমির মালিক ‘প্রান্তিক কৃষক’, ৫০-২৪৯ শতক ‘ক্ষুদ্র কৃষক’, ২৫০-৭৪৯ শতক ‘মাঝারি কৃষক’ ও ৭৫০ শতকের বেশি জমির মালিককে ‘বড় কৃষক’ হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। তবে শ্রেণি ভিন্ন হলেও কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে সব শ্রেণির কৃষকই আওতাভুক্ত থাকবেন।
সূত্র : বাসস



