
ফ্লোরিডার এক জেলের হাতে ইরানের ‘শাহেদ-১৩৬’ ড্রোনের একটি নকল মডেল বা আদল ধরা পড়ার ঘটনা আবারো মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও সামরিক বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে ইরানের ড্রোন শিল্পের অগ্রগতির দিকে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ঘাঁটিতে ইরানের হামলার পর তেহরানের ড্রোন প্রযুক্তির অগ্রগতি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তেহরানের নগর পরিষদ থেকে প্রকাশিত ইরানের অন্যতম জনপ্রিয় দৈনিক হামশাহরি অনলাইন (২২ সেপ্টেম্বর) জানায়, ফ্লোরিডার গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন একটি অস্ত্র পরীক্ষা কেন্দ্রের কাছকাছি সাগর থেকে ‘শাহেদ-১৩৬’-এর নকল একটি ড্রোন উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় মার্কিন সামরিক ব্যবস্থায় ইরানি ড্রোনের ভূমিকা ও প্রভাব নিয়ে আবারো আলোচনা শুরু হয়েছে। ঘটনাটি প্রমাণ করছে, ইরানের আত্মঘাতী ড্রোন প্রযুক্তি এখন মার্কিন সামরিক কাঠামোয় একই ধরনের অস্ত্র তৈরির মডেল হয়ে উঠেছে। বিশেষায়িত সামরিক সাময়িকী ‘ওয়ার জোন’ সম্প্রতি এ ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
কোথা থেকে শুরু
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ফ্লোরিডায় একটি বিনোদনমূলক মাছ ধরার নৌকা এগলিন বিমানঘাঁটির নিকটে অস্বাভাবিক এক জিনিস সাগরে ভাসতে দেখতে পায়। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর অস্ত্র পরীক্ষা ইউনিট রয়েছে এই ঘাঁটিতে। স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, মাছ ধরার সময় পানির ভেতর থেকে এমন একটি ড্রোন তোলা হয়, যা ইরানের শাহেদ-১৩৬ আত্মঘাতী ড্রোনের আদলে তৈরি একটি মার্কিন মডেলের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিলে যায়।
স্থানীয় সূত্রগুলো মনে করছে, ড্রোনটি মার্কিন ‘লুকাস’ ড্রোনের সাথে খুবই মিল রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রথমবার যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অর্জন করে এই ড্রোন। উদ্ধার হওয়া ড্রোনটির নাম ‘এফএলএম-১৩৬’ বলে জানা গেছে। এটি প্রথমে শাহেদ-১৩৬-এর অনুকরণে তৈরি করা হয়েছিল। পরে এতে অস্ত্র যুক্ত করে ‘লুকাস’ ড্রোনে রূপ দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
একটি ড্রোন হারানোর স্বীকারোক্তি
এদিকে, এগলিন বিমানঘাঁটির এক মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন, সম্প্রতি ঘাঁটি থেকে একটি ড্রোন হারিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত করতে পারি যে আমরা একটি পরীক্ষা চালাচ্ছিলাম এবং পরীক্ষার নমুনাটি হারিয়ে গেছে।’
শাহেদ-১৩৬য়ের মার্কিন সংস্করণ লুকাস
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রথমবার যুদ্ধক্ষেত্রে লুকাস ড্রোন ব্যবহার করা হয়। এর আগে সেন্টকমের এক মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, প্রতিটি লুকাস ড্রোনের দাম প্রায় ৩৫ হাজার ডলার।
হকিন্সের দলও বলেছে, এটি কম খরচের এমন একটি প্ল্যাটফর্ম, যা ব্যাপক হারে তৈরি ও ব্যবহার করা যায়। প্রচলিত দীর্ঘপাল্লার মার্কিন ব্যবস্থার তুলনায় খুব কম খরচে এই চালকহীন আকাশযান উন্নত সক্ষমতা দিতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ড্রোনটির কার্যকর পাল্লা দীর্ঘ এবং এটি দৃষ্টিসীমার বাইরে থেকেও কাজ করতে পারে। সেন্টকমের বিস্তৃত অভিযান এলাকায় এই সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেন্টকম এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তাদের ব্যবহৃত লুকাস ড্রোনগুলোর পাল্লা উল্লেখযোগ্য এবং এগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিচালনার জন্য তৈরি। স্থলভিত্তিক উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ও মোবাইল যানসহ বিভিন্ন উপায়ে এসব ড্রোন উৎক্ষেপণ করা যায়।
মার্কিন সামরিক প্রস্তুতি
গত কয়েক বছরে চালকহীন আকাশযানের ক্রমবর্ধমান হুমকি মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধসহ ইরানের সাথে বিভিন্ন সংঘাতে আত্মঘাতী ড্রোন বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে। এতে সামরিক অভিযান পরিচালনা ও পরিকল্পনার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে।
ফ্লোরিডার এগলিন বিমানঘাঁটিতে এই হুমকি মোকাবিলার সাম্প্রতিক কর্মসূচিগুলোর একটি হলো মার্কিন বিমানবাহিনীর যুদ্ধবিমানগুলোতে এপিকেডব্লিউএস লেজার-নির্দেশিত ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত করা। ২০১৯ সালে কর্মসূচিটি শুরু হলেও ইরানের সাথে উত্তেজনা বাড়ার পরে এটি দ্রুত কার্যকর পর্যায়ে যায়। পরে একই হুমকি মোকাবিলায় ইনফ্রারেড বা অবলোহিত রশ্মি ভিত্তিক অনুসন্ধানী ব্যবস্থা-যুক্ত আরো উন্নত এপিকেডব্লিউএস আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রসহ অন্যান্য কর্মসূচিও নেয়া হয়।
লুকাস ড্রোনের উন্নয়নও দ্রুতগতিতে চলছে। কর্মসূচিটির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ড্রোনগুলোর ‘ঝাঁকবদ্ধভাবে চালনা’র সক্ষমতা তৈরি করা। কর্মসূচিটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই এই সক্ষমতাকে লুকাসের উন্নয়ন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এ ধরনের ব্যবস্থা তৈরিতে নিয়ন্ত্রিত ও অনুমোদিত আকাশসীমা প্রয়োজন। মেক্সিকো উপসাগরের বিশাল পরীক্ষা এলাকাগুলো যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের পরীক্ষার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থানগুলোর মধ্যে পড়ে। ফলে এগলিনের কাছে সমুদ্রে এফএলএম-১৩৬ দেখা যাওয়াকে খুব একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা বলা হচ্ছে না।
হারিয়ে যেতে নেই মানা!
পরীক্ষা চালানোর সময় বা যুদ্ধাঙ্গনে মার্কিন ড্রোন হারিয়ে যাওয়াকে অভিযান বা অপারেশনাল হিসাবের অংশ হিসেব ধরা হয়।
ইরানের সাথে যুদ্ধে লুকাস ড্রোন হারানোর বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এর কয়েকটি ইরান প্রায় অক্ষত অবস্থায়ও উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। এসব ড্রোন মূলত ব্যবহারের জন্য বিপুল সংখ্যায় তৈরি। ফলে কিছু ড্রোন হারানোর ঝুঁকি আগে থেকেই মেনে নেয়া হয়। মার্কিন সামরিক পরিকল্পনাকারীদের দৃষ্টিতে, যেকোনো কারণে নির্দিষ্টসংখ্যক ড্রোন হারানোর ঘটনা ঘটতেই পারে। হারানোর এ ধরনের ঘটনা বা ঘটনাবলীকে মার্কিন ড্রোনটির স্বাভাবিক অভিযান বা অপারেশনাল হিসাবেরই অংশ।








