
বন্যায় বিধ্বস্ত নেপালের একটি স্কুলে প্রতিদিন সকালে উপস্থিতি নেয়ার সময় শিক্ষকদের সামনে ভয়াবহ দুর্যোগের স্মৃতি ফিরে আসে। যেসব শিক্ষার্থী আর স্কুলে ফিরে আসেনি, উপস্থিতির খাতায় তাদের নাম লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত করেন শিক্ষকরা।
চীন-নেপাল সীমান্তের কাছে হিমবাহ ধসে ভয়াবহ এই বন্যার সৃষ্টি হয়। এতে এক হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের বেশিভাগই নেপালের।
সুনামির মতো ঢেউ পাহাড়ি অঞ্চলের রাস্তা, সেতু ও বসতি ভাসিয়ে নেয়ার এক মাস পরও হিমালয়ের দেশটিতে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাসুয়া জেলার নীলকণ্ঠ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২৬ আগস্টের বন্যার পর থেকে নিখোঁজ শিশুদের নামের পাশে এক শিক্ষক লাল বৃত্ত এঁকে রেখেছেন।
বন্যায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া এক ডজনেরও বেশি স্কুলের তুলনায় অপেক্ষাকৃত উঁচু এলাকায় অবস্থিত নীলকণ্ঠ বিদ্যালয়টি প্রায় অক্ষত রয়েছে। তবে এই স্কুলের ৭০ জন শিক্ষার্থী ও চারজন শিক্ষককে হারাতে হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাধব লামিছানে বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘রাসুয়ার দিকে তাকালে এমন কোনো পরিবার খুঁজে পাওয়া যাবে না, যারা পরিবারের কোনো সদস্যকে হারায়নি।’
তিনি আরো বলেন, ‘সব শিক্ষার্থী ও শিক্ষক একই কষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’
নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের বেশিভাগই নদীতীরবর্তী এলাকা থেকে স্কুলে যাওয়ার পথে উপত্যকায় নেমে আসা বন্যার পানিতে ভেসে যায়।
৩৬ বছর বয়সী শিক্ষক রমা পৌডেল বলেন, ‘আমরা প্রতিটি নিঃশ্বাসের সাথে আমাদের শিক্ষার্থীদের স্মরণ করছি। এত অল্প বয়সে এই দুর্যোগে তারা প্রাণ হারিয়েছে। এটি এক বিরাট ক্ষতি।’
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, রাসুয়া ও আশপাশের জেলাগুলোতে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী ও ২৪ জন শিক্ষক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া ১৮টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব স্কুল পুনরুদ্ধারে সর্বোচ্চ প্রায় এক কোটি ৫৪ লাখ ৭০ হাজার ডলার খরচ হতে পারে।
নেপালের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র শ্রী প্রসাদ ভট্টরাই বলেন, ‘শিক্ষা খাত এর আগে কখনো এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি।’
‘আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাই’
ইউনিসেফের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বন্যাকবলিত অঞ্চলের ৬২টি স্কুল ও শিক্ষাকেন্দ্রে ১৪ হাজারের বেশি শিশুর পড়াশোনা ব্যাহত হয়েছে।
ইউনিসেফের প্রতিনিধি অ্যালিস আকুঙ্গা গত সপ্তাহে বলেন, ‘দুর্যোগের পর শিশুদের পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
তিনি আরো বলেন, পড়াশোনায় ফিরে যাওয়া শিশুদের মধ্যে স্থিতিশীলতা, নিয়মিত জীবনযাপন এবং আশার অনুভূতি তৈরি করে। বিশেষ করে যখন অনেক শিশু বড় ধরনের ক্ষতি ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন স্কুলে ফেরা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে অনেক পরিবারের পক্ষেই এখনো সন্তানদের স্কুলে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
নীলকণ্ঠ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মোট ৫০৮ শিক্ষার্থীর অর্ধেকেরও কম দুই সপ্তাহ আগে ক্লাস পুনরায় শুরু হওয়ার পর স্কুলে ফিরেছে।
প্রধান শিক্ষক লামিছানে জানান, প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থী এখনো স্কুলে পৌঁছাতে পারছে না, কারণ তাদের যাতায়াতের রাস্তা ও সেতু বন্যার পানিতে ভেসে গেছে।
স্কুলের কয়েকটি শ্রেণিকক্ষ এখন ত্রাণ বিতরণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
শিক্ষকরা বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের চেয়েও শিশুদের মানসিক ক্ষত কাটিয়ে ওঠা কঠিন হতে পারে।
শিক্ষক শিবা রাম ভট্ট বলেন, ‘আমাদের অনেক শিক্ষার্থী তাদের বাবা-মাকে হারিয়েছে। কেউ কেউ নিজের বন্ধুদের পানিতে ভেসে যেতে দেখেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘এক মাস হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের পক্ষে পড়াশোনায় মনোযোগ দেয়া কঠিন।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক দুর্গত মানুষের কাছে ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাচ্ছে। তবে পুনরুদ্ধারের পরবর্তী পর্যায়ে শুধু খাবার ও আশ্রয় যথেষ্ট নয়।
শিবা রাম ভট্ট বলেন, ‘আমাদের কাছে পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী আছে। এখন প্রয়োজন মানসিক সহায়তা এবং একটি স্থায়ী সমাধান, যাতে তারা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।’
সূত্র : বাসস
_GDN_970x90px_English.gif&w=2048&q=75)








