
ফের গৌতম আদানির কাছে ‘পরাজিত’ হলেন মুকেশ আম্বানি! সম্পত্তির হিসাবে ভারতের ধনী শিল্পপতিকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান দখল করলেন গুজরাটের জৈন ব্যবসায়ী। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে একের পর এক বিতর্ক তাড়া করে বেরিয়েছে তাকে। শুধু তা-ই নয়, দেশটির একাধিক বিরোধী রাজনৈতিক দলের চক্ষুশূল হয়েছেন তিনি। তারপরও আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যানের দুর্দান্ত ‘কামব্যাক’ দেখল ভারতীয় বণিক মহল।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা জানিয়েছে, চলতি বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর সম্পত্তির হিসাবে এ ভারতের ধনকুবের শিল্পপতিদের সর্বশেষ তালিকা প্রকাশ করে ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা ‘হুরুন রিসার্চ ইনস্টিটিউট’। তার পোশাকি নাম ‘এম৩এম হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট ২০২৬’। এখানে ‘এম৩এম’ কথাটির অর্থ হলো, ‘ম্যাগনিফিসেন্স ইন দ্য ট্রিনিটি অফ মেন, মেটেরিয়াল্স অ্যান্ড মানি’। অর্থাৎ, মানুষ, উপকরণ ও অর্থ- এই ত্রয়ীর মহিমা। সংশ্লিষ্ট তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন গৌতম আদানি।
‘হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট’ অনুযায়ী, আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান ও তার পরিবারের সম্পত্তির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩ শতাংশ। টাকার অঙ্কে সেটা প্রায় ৯.২৩ লাখ কোটি। অন্য দিকে, মুম্বাইবাসী রিলায়্যান্স গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান মুকেশ আম্বানির সম্পত্তির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে ১০ শতাংশ। ফলে, ৮.৬৩ লাখ কোটি টাকায় নেমে এসেছেন তিনি। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে তার নাম।
২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তালিকায় কমপক্ষে ১,০০০ কোটি টাকার সম্পদের অধিকারী ১,৮১০ জন ভারতীয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছে সংশ্লিষ্ট ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা। হুরুন সমীক্ষকদের দাবি, গত বছরের (২০২৫ সাল) তুলনায় তাদের সম্পত্তির পরিমাণ গড়ে বেড়েছে ১২.৮ শতাংশ, যেটা প্রায় ১৮৭.৫ লাখ কোটি ডলার। পাশাপাশি, শেষ এক বছরে ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে ভারতীয় ধনকুবেরদের সংখ্যা।
বর্তমানে দেশটির হাজার কোটিপতির সংখ্যা ৩৯১-তে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে হুরুন। তাদের জন্য ৭৬ জনই নতুন। সংশ্লিষ্ট তালিকায় শেষ এক বছরে নতুন ২৭ জনকে যুক্ত করেছে তারা। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বর্তমানে সম্পদের হিসাবে মুকেশ আম্বানির তুলনায় ৫৯,৪০০ কোটি টাকায় এগিয়ে আছেন গৌতম আদানি। এই নিয়ে তৃতীয়বার দেশের ধনকুবেরদের মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করলেন তিনি।
২০২২ সালে প্রথমবার মুকেশ আম্বানিকে পেছনে ফেলে ‘হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্টে’ শীর্ষস্থান দখল করেন গৌতম আদানি। কিন্তু, ঠিক তার পরের বছরই (২০২৩ সাল) গুজরাটি শিল্পপতির বিরুদ্ধে শেয়ারে কারসাজির অভিযোগ তুলে একটি বিস্ফোরক রিপোর্ট প্রকাশ করে মার্কিন শর্ট সেলার ‘হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ’। ফলে মারাত্মকভাবে ধাক্কা খায় আদানি গোষ্ঠীর বিশ্বাসযোগ্যতা। হু-হু করে পড়ে যায় তাদের স্টকের দাম।
এমন পরিস্থিতিতে হিন্ডেনবার্গ রিসার্চের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে গৌতম আদানির বেশি সময় লাগেনি। ২০২৪ সালে হুরুনের ভারতীয় ধনকুবেরদের তালিকায় ফের প্রথম স্থান পান তিনি। অন্যদিকে, গত বছরের (২০২৫ সাল) জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় ওই মার্কিন আর্থিক গবেষণা সংস্থা। যদিও তাতে বিতর্ক পিছু ছাড়েনি তার।
২০২৪ সালের নভেম্বরে ফের গৌতম মালিকানাধীন আদানি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার ঘুষের অভিযোগ তোলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এতে নাম জড়ায় তার ভাতিজা সাগরেরও। এ ছাড়া, ‘আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেড’-এর সিইও বিনীত জৈন, রঞ্জিত গুপ্ত, রূপেশ অগ্রবাল, অস্ট্রেলিয়া ও ফ্রান্সের নাগরিক সিরিল ক্যাবানেস, সৌরভ অগ্রবাল এবং দীপক মলহোত্রকে অভিযুক্ত করে আমেরিকা।
ওই সময় গৌতম আদানির নামে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে নিউ ইয়র্কের ইস্টার্ন ডিস্ট্রিক্টের ইউএস অ্যাটর্নির দফতর। তাতে বলা হয়, ভারতের রাজ্য বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর সাথে সৌরবিদ্যুৎ চুক্তির বরাত পেতে এ দেশের সরকারি কর্তাদের কোটি কোটি টাকা ঘুষের প্রস্তাব দিয়েছেন গুজরাটের জৈন শিল্পপতি। যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের জেরে নিম্নমুখী হয় আদানিদের শেয়ার দর। মুহূর্তে উবে যায় কয়েক শ’ কোটি টাকা।
২০২৪-এ গৌতম আদানির বিরুদ্ধে মার্কিন আদালতে দায়ের হয় ফৌজদারি মামলা। এ বছরে অবশ্য তা প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া, ওই বছর কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবির জোমো কেনিয়াট্টা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আধুনিকীকরণ এবং সম্প্রসারণের বরাতও বাতিল হয়েছে তার। যদিও এগুলোর কিছুই তার সম্পদবৃদ্ধির সূচককে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি।
ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা প্রকাশিত তালিকায় তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছেন কলকাতার সেন্ট জে ভিয়ার্স কলেজের বাণিজ্য বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী লক্ষ্মীনিবাস মিত্তল। তার হাত ধরেই গড়ে উঠেছে বিশ্বের বৃহত্তম ইস্পাত উৎপাদন সংস্থা ‘আর্সেলর মিত্তল’। হুরুনের দাবি, এই শিল্পপতি ও তার পরিবারের সম্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে ৯৩ শতাংশ। ফলে তাদের মোট সম্পদ পৌঁছেছে ৩.৩৯ লাখ কোটিতে।
মজার বিষয় হলো, এর আগের ‘হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট’-এর তুলনায় আট ধাপ এগিয়েছেন লক্ষ্মী মিত্তল। তালিকা প্রকাশের পাশাপাশি তার কারণ ব্যাখ্যা করেছে ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা। তাদের দাবি, ইউরোপের বাজারে হু-হু করে বেড়েছে ইস্পাতের দাম। ফলে সেখানে পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে মুনাফার অঙ্ক ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছেন সেন্ট জে ভিয়ার্সের প্রাক্তনী। এতে সম্পদের পরিমাণ একলাফে অনেকটা বেড়ে গেছে তার।
এই তালিকায় নবম ও দশম স্থান পেয়েছেন যথাক্রমে ‘বেদান্ত রিসোর্সেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান অনিল অগ্রবাল এবং ‘টরেন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস’-এর সমীর মেহতা। তাদের সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে যথাক্রমে ৮৭ এবং ৫২ শতাংশ। ফলে, ২.০৮ লাখ কোটি এবং ১.৮৯ লাখ কোটি টাকার সম্পত্তির অধিকারী হয়েছেন তারা, জানিয়েছে ‘হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট’।
এ ছাড়া, দেশের সর্বাধিক ধনকুবেরের হিসাবে প্রথম স্থান পেয়েছে মুম্বাই। মায়ানগরীর হাজার কোটিপতির সংখ্যা ৪৬৫। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান দখল করেছে যথাক্রমে নয়াদিল্লি এবং বেঙ্গালুরু। এই দুই শহরের ধনকুবেরের সংখ্যা ২৩৬ ও ১২৯ বলে জানা গেছে। শিল্পজাত পণ্যের উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে সর্বাধিক আর্থিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। সেখানে প্রথমবার হাজার কোটির গণ্ডি ছুঁয়েছেন ১৬৬ জন।
শিল্পজাত পণ্যকে বাদ দিলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান দখল করেছে রাসায়নিক এবং ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নির্মাণকারীরা। প্রথমটিতে ‘হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্টে’ নতুন মুখের সংখ্যা ১৪২। দ্বিতীয়টিতে ১৩৬ জন শিল্পপতি প্রথমবার হাজার কোটির সম্পত্তির অধিকারী হয়েছেন। এবারের তালিকায় স্বতন্ত্র একটি ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে কৃত্রিম মেধা বা এআই (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স)।
হুরুনের তালিকায় থাকা এআই সংস্থাগুলোর ১৯ জন মালিকের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ৩.০৭ লাখ কোটি টাকা। এদের মধ্যে ১৫ জনই নতুন। কৃত্রিম মেধার ওপর ভিত্তি করে ধনকুবেরদের দলে ঠাঁই পেয়েছেন তনয় কোঠারি এবং সহজ গর্গ। দু’জনেরই বয়স ২৮ বছর। ‘উইসপ্র ফ্লো’ নামের একটি সংস্থার মাধ্যমে ৪,২০০ কোটি টাকার সম্পত্তির অধিকারী হয়েছেন তারা।
তনয় ও সহজের পাশাপাশি হাজার কোটির ক্লাবে পা রেখেছে সিটিআরএল এস ডেটা সেন্টার, ইয়োটা, অস্টেরা ল্যাব্স, প্যারালাস ওয়েব সিস্টেম্স, সর্বম এআই এবং ইমার্জেন্ট এআই। হুরুনের তালিকায় জায়গা পাওয়া কৃত্রিম মেধার ১৫ জন নতুন উদ্যোক্তার মোট সম্পত্তির পরিমাণ ১.৮২ লাখ কোটি বলে জানা গেছে। সেটা নতুন সংস্থা তৈরি করা শিল্পগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
তবে, শিল্পজাত পণ্য উৎপাদনকে হারাতে পারেনি এআই। হাজার কোটির ক্লাবে ওই ক্ষেত্রের নতুন মুখ ৪৪। এ ছাড়া, ধনকুবেরদের সম্পত্তি বৃদ্ধিতে প্রতিরক্ষা এবং সবুজ শক্তিকে (গ্রিন এনার্জি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে দেখা গেছে। এই দু’টি খাতেই বিপুল লগ্নি রয়েছে তালিকায় শীর্ষ স্থান পাওয়া গুজরাটের জৈন ব্যবসায়ী গৌতম আদানির।
হুরুন জানিয়েছে, এবারের তালিকায় হাজার কোটির ক্লাবে ঢুকে পড়া স্ব-প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় উদ্যোক্তাদেরর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,২৬৬। মোট ধনকুবেরের ৭০ শতাংশ স্ব-প্রতিষ্ঠিত, যেটা রেকর্ড। এদের মধ্যে নতুন মুখ ৩৪৭। গত এক বছরে ধনকুবের নারীর সংখ্যা ১০০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩১। সেখানে প্রথম স্থানে রয়েছেন ২.৭৯ লাখ কোটির সম্পদের মালকিন রোশনি নাদার মলহোত্র।
তালিকা অনুযায়ী, অনাবাসী ভারতীয় ধনকুবেরদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫৬। এদের মধ্যে ৯০ জন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। ৩১ জন থাকছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। চলতি বছরের ২৪আগস্ট পর্যন্ত সম্পত্তির নিরিখে এই সমীক্ষা চালিয়েছে হুরুন। পাঁচ বছর আগে হাজার কোটির ক্লাবের সদস্য ছিলেন এ দেশের ২৩৭ জন। শেষ এক এবং পাঁচ বছরে সেখানে জায়গা করে নিয়েছেন ১২৮ ও ৮০৩ জন।








