
আগামী ছয় মাসে মহাশক্তিশালী বা সুপার এল নিনোর অতিরিক্ত তাপের কারণে বিশ্বজুড়ে ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। জলবায়ুবিজ্ঞানীদের নতুন এক হিসাবে এমন আশঙ্কা করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে ভারত, নাইজেরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র—বিশ্বের নানা অঞ্চলে এর প্রভাব পড়বে। খরা, দাবানল ও বন্যার কারণেও আরো বহু মানুষের মৃত্যু হতে পারে।
ব্রিটিশ দৈনিক গার্ডিয়ান বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) জানায়, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই মৃত্যুর হিসাব করা হয়েছে। তবে তাপজনিত অতিরিক্ত মৃত্যুর উচ্চ হার ২০২৭ সালের জুন বা জুলাই পর্যন্ত চলতে পারে। প্রতিবেদনটির সহলেখক অধ্যাপক মাইকেল গ্রিনস্টোন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা।
বর্তমান এল নিনো সোমবার এ ঘটনার জন্য রেকর্ড করা সর্বোচ্চ তাপমাত্রার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। তাও আবার সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর কয়েক মাস আগেই। আগের ঘটনাগুলোর তুলনায় এবার তাপমাত্রা এতটাই বেশি যে বিজ্ঞানীরা একে ‘অবিশ্বাস্য’ এবং ‘গডজিলা-পর্যায়ের’,অর্থাৎ রাক্ষুসে মাত্রার হিসেবে বর্ণনা করছেন।
গ্রিনস্টোন বলেন, ‘৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের এই সংখ্যা এত বড় যে তা অনুভূতিহীন করে দিতে পারে। কিন্তু এই সংখ্যার মধ্যে আছেন মা-বাবা ও সন্তান, দাদা-দাদি ও প্রতিবেশী, কর্মস্থলে যাওয়া মানুষ, পরিবার দেখাশোনা করা মানুষ, নিজ নিজ জীবন নিয়ে নিজের মতো বেঁচে থাকা মানুষ।’
পরবর্তী ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিল। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ২০টি দেশের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। সেখানে অতিরিক্ত তাপের কারণে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুদানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বেনিতুতে ২০২৩ সালের বন্যার মতো পরিস্থিতির মধ্যে এবারের অতিরিক্ত তাপে দক্ষিণ সুদানে ৫ হাজার ৬০০ মৃত্যুর হিসাব করা হয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, এই এল নিনো যেন ‘ভবিষ্যৎ থেকে আসা একটি পোস্টকার্ড’। কারণ এটি এমন তাপমাত্রা তৈরি করছে, যা জলবায়ু সংকটের বর্তমান গতিপথে প্রায় ২০ বছর পর স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে।
প্রতিবেদনের সহলেখক ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির ড. তাম্মা কার্লেটন বলেন, ‘জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেয়া এবং আমাদের প্রচেষ্টাকে আরো ভালোভাবে লক্ষ্যভিত্তিক করা গেলে এ বছর বহু জীবন বাঁচানো সম্ভব। কিন্তু ২০ বছর পর আজকের চরম তাপমাত্রাই যখন নতুন স্বাভাবিক হয়ে উঠবে, তখন আমরা সারাক্ষণ জরুরি অবস্থার মধ্যে থাকতে চাই না। জীবন বাঁচাবে এমন ব্যবস্থা এখনই তৈরি, প্রয়োগ ও মূল্যায়ন করতে হবে।’
গবেষণাটি বিশ্বজুড়ে ২৪ হাজার ৩৭৮টি অঞ্চলে মাসভিত্তিক তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর সম্পর্কের তথ্য ব্যবহার করেছে। এর সাথে আগামী মাসগুলোতে এল নিনোর কারণে বাড়তে থাকা তাপমাত্রার পূর্বাভাস মিলিয়ে হিসাব করা হয়েছে। তুলনার ভিত্তি হিসেবে নেয়া হয়েছে ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সালের গড় মাসের তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা।
গ্রিনস্টোন বলেন, ফসলের ওপর বড় ধরনের আঘাত আসার আগেই তার পূর্বাভাস দেয়া সম্ভব হয়েছে। এবার একইভাবে মানুষের মৃত্যুর আগাম পূর্বাভাস দেয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রতিবেদনটি পিয়ার-রিভিউ করা বৈজ্ঞানিক জার্নালে জমা দেয়া হবে। অর্থাৎ, প্রকাশের আগে একই ক্ষেত্রের অন্য বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীরা গবেষণার পদ্ধতি, তথ্য ও ফলাফল যাচাই করবেন। তবে পরিস্থিতির জরুরি দিক বিবেচনায় এটি প্রকাশ না করে রেখে দেয়া ‘দায়িত্বহীনতা’ হতো বলে জানান তিনি।
এল নিনো খাদ্য সরবরাহেও আঘাত হানতে পারে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি আগস্টে সতর্ক করে বলেছে, এর প্রভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে এবং খাদ্যের দাম বাড়তে পারে। ১৮৭৭-৭৮ সালের বড় এল নিনোর সময় খরা ও দুর্ভিক্ষে ৫ কোটির বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। ভারত, ব্রাজিল ও চীন ছিল সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে।
ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো গার্ডিয়ানকে বলেন, বর্তমান এল নিনো জলবায়ু ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ তাপ ও শক্তির ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে। এটি এমন এক জলবায়ুর মধ্যে ঘটছে, যা মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে আগের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ হয়ে উঠেছে। এ কারণেই এটি বিপজ্জনক। তাঁর মতে, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো চলতে থাকলে এল নিনো যখনই ফিরে আসবে, তখন আগের চেয়ে আরো বেশি উষ্ণ পৃথিবীর ওপরই তা আঘাত হানবে। ফলে প্রচণ্ড গরম, স্বাস্থ্যঝুঁকি, খাদ্য ও পানির সংকট মোকাবিলা করা মানুষের জন্য আরো কঠিন হয়ে উঠবে।








