
আমি আকাশে পাতিয়া কান শুনেছি, শুনেছি তাহারই গান—এই গান গ্রহান্তরের কোনো আগন্তকের কিনা, সে কথা আজও জোর দিয়ে বলা যাবে না। তবে মানুষের এই অপেক্ষা নতুন নয়। আকাশের দিকে তাকিয়ে মানুষ বহুদিন ধরেই ভেবেছে, এই বিশাল মহাবিশ্বে আমরা কি সত্যিই একা?
গিলগামেশের মহাকাব্য থেকে সায়েন্স ফিকশনের কল্পজগৎ—কোথাও না কোথাও বারবার ফিরে এসেছে দূর আকাশের অচেনা অতিথির কথা। কখনো তারা দেবতা, কখনো ভিন গ্রহের প্রাণী, কখনো দূর নক্ষত্রের মানুষ। আমাদের নিজেদের সাহিত্যেও গ্রহান্তরের আগন্তকের কল্পনা এসেছে নানা রূপে। রকিব হাসানের কিশোর কল্পবিজ্ঞানেও সেই অচেনা জগতের দরজা খুলেছে বারবার।
তারপর এলো বেতার দূরবিন। মানুষ শুধু আকাশ দেখল না, কান পাতল মহাবিশ্বের দিকে। ভাবল, কোথাও যদি কেউ থাকে, হয়তো তার পাঠানো কোনো সংকেত একদিন আমাদের বেতার দূরবিনে ধরা পড়বে।
ষাটের দশক থেকে সময়ের ভেলায় ভাসতে ভাসতে আমরা ২০২৬ সালের ঘাটে এসে পৌঁছেছি।
সে যে কেনো এল না। কিছু ভালো লাগে নাও হয়ত বলা যাবে। বলা যাবে, কোনো গ্রহান্তরের মানুষ এসে দরজায় কড়া নাড়েনি। মহাকাশের অন্ধকার ভেদ করে কোনো বুদ্ধিমান প্রাণীর পাঠানো বার্তাও আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। কিন্তু অপেক্ষার পালায় এবার একটি নতুন অধ্যায় যোগ হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা প্রথমবারের মতো সৌরজগতের বাইরের একটি গ্রহ থেকে সরাসরি আসা বেতার সংকেত শনাক্ত করেছেন।
গ্রহটির নাম বেটা পিক্টোরিস বি।
২২ সেপ্টেম্বর বিজ্ঞানবিষয়ক ওয়েবসাইট সায়েন্স এলার্ট জানায়, হার্ভার্ড-স্মিথসোনিয়ান সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রোফিজিকস ও ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের একদল গবেষক এই সংকেত শনাক্ত করেছেন।
খবরটি শুনে প্রথমেই যে প্রশ্নটি মাথায় আসতে পারে—তাহলে কি অবশেষে গ্রহান্তরের প্রাণীর সন্ধান মিলল?
না। অন্তত এখনো তেমন কোনো প্রমাণ নেই।
যে সংকেত ধরা পড়েছে, সেটি কোনো প্রাণীর পাঠানো বার্তা নয়। বরং এটি এসেছে গ্রহটির মেরুজ্যোতি থেকে। পৃথিবীতেও মেরুজ্যোতি দেখা যায়। উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর আকাশে কখনো কখনো যে অদ্ভুত আলো নেচে ওঠে, সেটিই মেরুজ্যোতি।
তবে পৃথিবীর আকাশে চোখে দেখা সেই আলোর পেছনেও চলে অদৃশ্য এক খেলা। বেটা পিক্টোরিস বি-তেও সম্ভবত সেই খেলাই চলছে—তবে অনেক বেশি শক্তিশালীভাবে।
নক্ষত্র থেকে আসা চার্জযুক্ত কণা গ্রহটির বায়ুমণ্ডল ও চৌম্বকক্ষেত্রের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় জড়িয়ে শক্তি ছাড়ে। সেই শক্তির একটি অংশ বেতার তরঙ্গ হিসেবে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই তরঙ্গই শেষ পর্যন্ত পৌঁছেছে পৃথিবীর বেতার দূরবিনে।
আগে গ্রহ-ব্যবস্থাগুলো থেকে বেতার সংকেত ধরা পড়লেও একটি সমস্যা ছিল। সংকেতটি আসলে গ্রহ থেকে এসেছে, নাকি গ্রহটিকে ঘিরে থাকা নক্ষত্র থেকে—তা নিশ্চিতভাবে বলা যেত না। এবার গবেষকেরা সেই জায়গাতেই বড় অগ্রগতি করেছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকার মিরক্যাট বেতার দূরবিনের সাহায্যে ২০২৫ ও ২০২৬ সালে চার দফা পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। লক্ষ্য ছিল বেটা পিক্টোরিস নামের নক্ষত্রটি। পৃথিবী থেকে সেটির দূরত্ব প্রায় ৬৩ দশমিক ৪ আলোকবর্ষ। এই নক্ষত্রকে ঘিরে তিনটি গ্রহের অস্তিত্ব জানা গেছে—বেটা পিক্টোরিস বি, সি ও ডি।
পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে ছোট ছোট, বারবার ফিরে আসা বেতার বিস্ফোরণ। এগুলোর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল—সংকেতটির দোলনের ধরনও ছিল অস্বাভাবিক। এর বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র একদিকে স্থির না থেকে ঘুরতে ঘুরতে দুলছিল, অনেকটা বৃত্ত আঁকার মতো। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘বৃত্তাকার মেরুকরণ’। গ্রহের শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রে চার্জযুক্ত কণার ক্রিয়ায় তৈরি বেতার বিকিরণে এমন বৈশিষ্ট্য দেখা যেতে পারে।। আর সেটিই গবেষকদের জন্য বড় সূত্র হয়ে ওঠে। কারণ মেরুজ্যোতি থেকে আসা সংকেতের ক্ষেত্রে এমন বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
এরপর আকাশের মানচিত্রে কোয়াসারকে নির্ভরযোগ্য অবস্থানচিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করে গবেষকেরা সংকেতের উৎস আরও নির্দিষ্ট করেন। এতে তারা উচ্চমাত্রার নিশ্চয়তার সাথে বুঝতে পারেন, সংকেতটি বেটা পিক্টোরিস নক্ষত্র থেকে নয়, এসেছে তার গ্রহ বি থেকে।
এখানেই গল্পটি আরো মজার হয়ে ওঠে।
গবেষকেরা সংকেতটির মধ্যে এমন একটি প্রক্রিয়ার চিহ্ন পেয়েছেন, যার নাম ইলেকট্রন সাইক্লোট্রন মেজার ইনস্ট্যাবিলিটি। নামটি শুনে মনে হতে পারে মহাকাশবিজ্ঞানের কোনো দুর্বোধ্য অঙ্ক। আসলে ব্যাপারটি তুলনামূলক সহজ।
কোনো গ্রহের শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে ইলেকট্রন ঘুরতে থাকে। সেই ঘূর্ণনের সময় বিশেষ পরিস্থিতিতে ইলেকট্রন তার শক্তি বেতার তরঙ্গের আকারে ছাড়তে পারে। ফলে তৈরি হয় শক্তিশালী বেতার বিকিরণ। পৃথিবী ও বৃহস্পতির মেরুজ্যোতির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রক্রিয়া কাজ করে।
এই প্রক্রিয়ার আরেকটি সুবিধা হলো, এর সংকেত দেখে কোনো গ্রহের চৌম্বকক্ষেত্র সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
আর বেটা পিক্টোরিস বি-র চৌম্বকক্ষেত্র যে বেশ শক্তিশালী, তারই ইঙ্গিত মিলেছে এই পর্যবেক্ষণে।
গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, গ্রহটির চৌম্বকক্ষেত্র পৃথিবীর চেয়ে হাজার গুণেরও বেশি শক্তিশালী হতে পারে। এর একটি সম্ভাব্য কারণ গ্রহটির অস্বাভাবিক দ্রুত ঘূর্ণন। নিজের অক্ষে একবার ঘুরে আসতে বেটা পিক্টোরিস বি-র সময় লাগে মাত্র ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা।
ভাবুন, পৃথিবীর ২৪ ঘণ্টার দিন যেখানে আমাদের কাছে স্বাভাবিক, সেখানে ওই বিশাল গ্রহে একটি দিন শেষ হয়ে যাচ্ছে মাত্র কয়েক ঘণ্টায়।
বেটা পিক্টোরিস বি-কে প্রথম শনাক্ত করা হয়েছিল ২০০৮ সালে। গ্রহটি বিশাল—এর ভর বৃহস্পতির প্রায় ১০ গুণ। আর এখন তার পরিচয়ের সাথে যুক্ত হলো আরো একটি বিশেষত্ব : সৌরজগতের বাইরের কোনো গ্রহ থেকে প্রথমবারের মতো স্পষ্ট বেতার সংকেত শনাক্ত হয়েছে তার কাছ থেকেই।
তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না গবেষকেরা। তারা এখন আরো সাতটি বিশাল বহির্গ্রহের দিকে নজর দিচ্ছেন। এসব গ্রহ রয়েছে কাছাকাছি পাঁচটি নক্ষত্র-ব্যবস্থায়। পরবর্তী প্রজন্মের বেতার পর্যবেক্ষণযন্ত্র এলে যন্ত্রের সংবেদনশীলতা ৫ থেকে ৭ গুণ বাড়তে পারে। তখন এই গ্রহগুলোর সংকেতও ধরা পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
তবে একটি সতর্কতা আছে। গবেষণাটি এখনো কোনো পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়নি। গবেষণাপত্রটি আপাতত অনলাইনে আরকাইভে রয়েছে।
তাই না, আজও গ্রহান্তরের আগন্তক এসে আমাদের সাথে কথা বলল না।
কিন্তু মহাবিশ্ব যে একেবারে নীরব নয়, তার আরেকটি প্রমাণ যেন পাওয়া গেল।
কোথাও বহু আলোকবর্ষ দূরে একটি বিশাল গ্রহ ঘুরে চলেছে। তার চারপাশে অদৃশ্য চৌম্বকক্ষেত্র। সেই চৌম্বকক্ষেত্রে ছুটে বেড়াচ্ছে কণা। তাদের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় জ্বলে উঠছে মেরুজ্যোতি। আর সেই অদৃশ্য আলোর সাথে জন্ম নিচ্ছে বেতার তরঙ্গ। মহাকাশ পেরিয়ে সেই তরঙ্গ এসে ধরা দিচ্ছে পৃথিবীর যন্ত্রে।
আমরা কান পেতে আছি।
ষাটের দশক পেরিয়ে, এক শতাব্দীর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পেরিয়ে, ২০২৬-এ এসেও।
হয়তো এবারও যে গান শুনলাম, তা কোনো গ্রহান্তরের মানুষের গান নয়। কিন্তু কে জানে—এই মহাবিশ্বের বিশাল নীরবতার ভেতর, এমন আরো কত গান ছড়িয়ে আছে, যেগুলোর দিকে এখনো আমাদের কান পৌঁছায়নি?
আকাশে পাতিয়া কান রাখার গল্প তাই শেষ হয়নি।








