
‘হাঁস ছিল, সজারু, (ব্যাকরণ মানি না) / হয়ে গেল ‘হাঁসজারু’ কেমনে তা জানি না।’ ‘আবোল তাবোল’-এর ‘খিঁচুড়ি’ কবিতায় সুকুমার রায় লিখেছিলেন। কেবল ‘হাঁসজারু’ নয়, বকচ্ছপ, হাতিমিসহ আরো কিছু বিচিত্র সৃষ্টি উপহার দিয়েছেন তিনি। কয়েক যুগ পেরিয়েও এসব সৃষ্টির আবেদন কমেনি। সৃষ্টিশীলতার ছোঁয়ায় শিল্পকর্মে অনেকে ব্যাকরণকেও অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছেন। কিন্তু পদার্থবিজ্ঞানের জগৎ এতটা উদার নয়। সেখানে সূত্রের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। অন্তত এতোকাল এমনটাই মনে করা হতো। সেই ধারণায় খানিকটা ধাক্কা দিয়েছে মহাকাশ থেকে আসা একখণ্ড উল্কাপিণ্ড।
বিজ্ঞানবিষয়ক ওয়েবসাইট ডেইলি গ্যালাক্সিতে লেখক ও সম্পাদক আরেজকি আমিরির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৭২৪ সালে পৃথিবীতে পড়া একটি পাথরের টুকরা তিন শতাব্দী ধরে প্যারিসের একটি জাদুঘরে ছিল। গবেষকেরা এখন সেটি পরীক্ষা করে এমন এক কঠিন পদার্থের বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করেছেন, যা তাপ পরিবহণের প্রচলিত নিয়মের সঙ্গে মেলে না।
১১ জুলাই ‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’-এ প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, পদার্থটি সিলিকা ট্রিডিমাইট—সিলিকন ডাই-অক্সাইডের একটি রূপ। কিছু উল্কাপিণ্ডে এটি পাওয়া যায় এবং মঙ্গলগ্রহেও এর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। কলাম্বিয়া ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফলিত পদার্থবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক মিশেল সিমনচেল্লির নেতৃত্বে গবেষকেরা দেখেছেন, ৮০ থেকে ৩৮০ কেলভিন পর্যন্ত তাপমাত্রা বদলালেও এর তাপ পরিবাহিতা প্রায় অপরিবর্তিত থাকে।
স্ফটিকও নয়, কাচও নয়
সাধারণ স্ফটিকে পরমাণুগুলো সুশৃঙ্খল ও পুনরাবৃত্ত বিন্যাসে থাকে। তাপমাত্রা বাড়লে তাপ পরিবাহিতা কমে। কাচে পরমাণুর এমন পুনরাবৃত্ত বিন্যাস নেই। তাই তাপমাত্রা বাড়লে তাপ পরিবাহিতা বাড়ে। ট্রিডিমাইট দুই বৈশিষ্ট্যই একসাথে ধারণ করে। এর পরমাণুর বন্ধন স্ফটিকের মতো সুশৃঙ্খল, কিন্তু জ্যামিতিক বিন্যাস কাচের মতো অনিয়মিত। ফলে তাপমাত্রা বদলালেও এর তাপ পরিবাহিতা প্রায় একই থাকে। গবেষকেরা এই আচরণকে তাপীয় প্রসারণের ‘ইনভার প্রভাব’-এর সাথে তুলনা করেছেন। ১৯২০ সালে এ প্রভাবের জন্য নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। এ যেন পদার্থবিজ্ঞানের জগতেরই হাঁসজারু বা হাতিমির গোত্রীয় ভাই!
তবে একে নেহাৎ নীল আকাশে বজ্রপাতের মতো হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা বলা যাবে না। এমন ‘হাঁসজারু’ বা ‘হাতিমি’র মতো অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য কোনো পদার্থে দেখা যেতে পারে, তার পূর্বাভাস দিয়েছিল ২০১৯ সালে সিমনচেল্লি, সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি লোজানের নিকোলা মারজারি ও রোমের সাপিয়েঞ্জা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রান্সেসকো মাউরির তৈরি একটি সমীকরণ। নিখুঁত স্ফটিক থেকে পুরোপুরি অনিয়মিত কাচ পর্যন্ত বিভিন্ন পদার্থের তাপ পরিবহণ ব্যাখ্যার জন্য তৈরি ওই কাঠামোয় ট্রিডিমাইট সম্ভাবনাময় পদার্থ হিসেবে সামনে আসে।
এরপর সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ের এতিয়েন বালাঁ, দানিয়েলে ফুর্নিয়ে ও মাসিমিলিয়ানো মারাঙ্গোলোর নেতৃত্বে গবেষকেরা ফ্রান্সের জাতীয় প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘর থেকে ১৭২৪ সালে জার্মানিতে পড়া স্টাইনবাখ উল্কাপিণ্ডের একটি নমুনা কাটার বিশেষ অনুমতি নেন। পরীক্ষায় গবেষকদের সেই পূর্বাভাসই মিলে যায়।
ইস্পাত কারখানা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ট্রিডিমাইট শিল্পকারখানাতেও তৈরি হতে পারে। ইস্পাত চুল্লির তাপ-সহনশীল ইটের ভেতর কয়েক দশকের তাপ সংক্রান্ত পরিবর্তনে এটি গঠিত হয়। প্রতি কেজি ইস্পাত উৎপাদনে প্রায় ১ দশমিক ৩ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়। বছরে প্রায় ১০০ কোটি টন ইস্পাত উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্রের মোট কার্বন নিঃসরণের আনুমানিক ৭ শতাংশের সমান। তাই স্থির তাপ পরিবাহিতার ট্রিডিমাইট চুল্লির তাপ আরো অনুমানযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণে কাজে লাগতে পারে।
পূর্বাভাস নিশ্চিত করতে সিমনচেল্লির দল মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে কোয়ান্টাম মেকানিকসের সমীকরণ সমাধান করে। এতে বিপুল পরিমাণ পরমাণুর পারস্পরিক ক্রিয়া বিশ্লেষণ করে পরীক্ষামূলক তথ্য দিয়ে হিসাব ঠিক না করেই তাপীয় বৈশিষ্ট্য অনুমান করা সম্ভব হয়। একই কাঠামো ইলেকট্রন ও ম্যাগননের মতো কণার ক্ষেত্রেও কাজে লাগতে পারে। এসব কণা থার্মোইলেকট্রিক পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি, নিউরোমর্ফিক কম্পিউটিং ও স্পিনট্রনিকসে গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রিডিমাইটের তাপ পরিবহন সক্ষমতা তার অতীত পরিবেশেরও ছাপ বহন করে। তাই এর বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে ট্রিডিমাইট তৈরি হওয়া গ্রহের তাপীয় ইতিহাস পুনর্গঠন করা সম্ভব হতে পারে। সেই তালিকায় মঙ্গলগ্রহও রয়েছে।
সবটা মিলিয়ে মনে হয়, শেকসপীয়রের সেই বিখ্যাত উক্তিই আবার সত্যি হলো—‘দেয়ার আর মোর থিংস ইন হেভেন অ্যান্ড আর্থ, হোরেশিও, দ্যান আর ড্রিমড অব ইন ইউর ফিলোসফি।’ অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবীতে এমন অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে, যা আমাদের সাধারণ চিন্তারও বাইরে। সুকুমার রায়ের ‘হাঁসজারু’ বা ‘হাতিমির’ মতোই প্রকৃতিও কখনো কখনো এমন সৃষ্টি হাজির করে, যার ব্যাকরণ আমাদের চেনা নয়।







