সংঘর্ষ-অবরোধে উত্তপ্ত শিল্পাঞ্চল, কঠোর নিরাপত্তা
ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে পোশাকশ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ছোড়ে পুলিশ : নয়া দিগন্ত।
  •  ভিডিও ধারণের সময় হামলার শিকার শ্রমিকের মৃত্যু
  •  সাংবাদিকদের ওপর হামলা, এনসিপির গায়েবানা জানাজা পণ্ড

পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে ষষ্ঠ দিনের মতো বিক্ষোভ, সংঘর্ষ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল বুধবার মিরপুর, সাভারের হেমায়েতপুর ও আশুলিয়া, নারায়াণগঞ্জ এবং গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিকদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। মিরপুরে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েনের কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। আশুলিয়ায় মোতায়েন করা হয়েছে দুই প্লাটুন বিজিবি। তবে কয়েকটি শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকরা কাজে ফিরতে শুরু করেছেন। 
রাজধানীর মিরপুর-১০ গোলচত্বর, মিরপুর-১১ মেট্রো স্টেশন ও মিরপুর-১২ এলাকায় বুধবার সকাল থেকেই বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য, সাঁজোয়া যান ও জলকামান মোতায়েন দেখা যায়। পল্লবী ইন্ডাস্ট্রিয়াল  এলাকার কয়েকটি কারখানার সামনে শ্রমিকরা জড়ো হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। একইভাবে রূপনগরের শিয়ালবাড়ী এলাকায় শ্রমিকরা সড়কে নামতে চাইলে তাদের ধাওয়া করে পুলিশ। 
মিরপুরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকালে ডিএমপির যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো: মহিদুল ইসলাম বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মিরপুরে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। জনদুর্ভোগ সৃষ্টি, সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্টের চেষ্টায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। অনেককে গ্রেফতার করে মামলা দেয়া হয়েছে। তিনি জানান, অনেক শ্রমিক কাজে ফিরেছেন এবং বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। শ্রমিকদের মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়টি শ্রমিক মজুরি বোর্ডের মাধ্যমে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। 
এ দিকে গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় আন্দোলন ও ভাঙচুরের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করতে গিয়ে হামলার শিকার শ্রমিক তৌফিক শেখ (২১) মারা গেছেন। মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার উত্তরার শিনশিন জাপান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।  
নিহত তৌফিক গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর ইউনিয়নের ছয়ঘরিয়া গ্রামের তবি খাঁর ছেলে। তিনি গাজীপুর মহানগরীর বাংলাবাজার এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে লায়লা স্টাইলস লিমিটেড কারখানায় চকরি করতেন। 
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রের দাবি, গত সোমবার গাজীপুরের বাংলাবাজার এলাকায় শ্রমিক আন্দোলন চলাকালে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন তৌফিক। এ সময় বিক্ষোভকারীরা তাকে মারধর করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। গাজীপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো: বেলায়েত হোসেন বলেন, পুলিশের অভিযানে তৌফিক আহত হননি; শ্রমিকরাই তাকে মারধর করে আহত করেছেন। এ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও  গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। 
অন্য দিকে বুধবার সকাল ৯টার দিকে সাভারের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধের পর বিক্ষোভ শুরু করেন পোশাকশ্রমিকরা। সাড়ে ১০টার দিকে হেমায়েতপুর-সিংগাইর সড়কে আন্দোলনরত শ্রমিকরা পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। এর কিছুক্ষণ পর স্টার টেলিভিশনের সাংবাদিক সোহান সিরাজী, ৭১ টিভির সাংবাদিক রায়হান বিন ও ক্যামেরাম্যান উজ্জ্বল হোসেনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। পরে শ্রমিক-পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় অন্তত ১০ জন আহত হন। বেলা ১১টার দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।   
এ ছাড়া আশুলিয়ায় হামীম, শারমিন ও নিউএজসহ কয়েকটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেন। পরে কারখানা কর্তৃপক্ষ সাধারণ ছুটি ঘোষণা করলে শ্রমিকরা বাইরে বেরিয়ে আশপাশের কারখানার সামনে বিক্ষোভ শুরু করেন। একপর্যায়ে পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে। শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি দুই প্লাটুন বিজিবি সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে। 
গাজীপুরেও সকাল থেকে বড়বাড়ী, ভোগড়া বাইপাস, হারিকেন, মালেকের বাড়ি, কোনাবাড়ী ও নাওজোর এলাকায় শ্রমিকদের অবস্থান, সংঘর্ষ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে। মহানগরীর বোর্ডবাজারের বড়বাড়ী এলাকায় শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে মহাসড়কে কিছু সময় যান চলাচল বন্ধ থাকে। তবে বেলা বাড়ার সাথে কয়েকটি এলাকায় পরিস্থিতি শান্ত হতে শুরু করে। শিল্পাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। 
শ্রমিক আন্দোলনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে গত কয়েক দিনে গাজীপুরে অন্তত পাঁচ সাংবাদিক আহত হয়েছেন বলে সাংবাদিক নেতারা জানিয়েছেন। সংঘর্ষের ছবি ও ভিডিও ধারণের সময় তাদের ওপর হামলার পাশাপাশি ক্যামেরা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও হামলার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সাংবাদিক নেতারা। 
এ দিকে নিহত তৌফিক শেখের গায়েবানা জানাজা পড়ার সময় পুলিশের হামলায় এনসিপির নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এতে ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আলী নাসের খান। আহতদের মধ্যে জাতীয় শ্রমিক শক্তি ও দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী রয়েছেন বলে তিনি দাবি করেন। 
গাজীপুর শিল্প পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন সাংবাদিকদের বলেন, চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় এনসিপির নেতারা রাস্তা অবরোধ করে নিহত শ্রমিক তৌফিকের গায়েবানা জানাজার প্রস্তুতি নেন। আমরা নিষেধ করলেও তারা শোনেননি। সড়ক অবরোধ করলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারত। পরে বাধ্য হয়ে সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের সরিয়ে দেয়া হয়েছে। 
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, পরিস্থিতি ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে আসছে। শ্রমিকরা কারখানায় ফিরতে শুরু করলেও কিছু এলাকায় বহিরাগতরা তাদের কাজে যোগ দিতে বাধা দিচ্ছে এবং জোর করে কারখানা বন্ধ রাখার চাপ দিচ্ছে। এসব দুষ্কৃতকারীকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। 
অন্য দিকে মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো গতকাল বুধবার নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় শ্রমিকদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। শ্রমিকদের ইটপাটকেলের জবাবে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এ সময় বেশ কয়েকজন শ্রমিক ও পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।  
এ ঘটনা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীসহ ২১ জনের নামোল্লেখ করে এবং  আসামি অজ্ঞাত এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ জনকে আসামি করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলা করেছে পুলিশ। সংঘর্ষের সময় পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। আটকরা হলেন ফতুল্লার লামাপাড়ার শামীম হাসান (২৮), কোতালেরবাগ বউবাজার মামুন (২৬), ফতুল্লার ওমর ফারুক (৩৮), রামারবাগ এলাকার ইমান ইমন (২৬), কোতালেরবাগ এলাকার  শাহিন আহম্মেদ ও কায়েমপুর এলাকার আতিকুর রহমান (২৫)। 
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকাল ১০টার দিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের পাশে কুতুবআইল কাঠেরপুল এলাকায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন শ্রমিকরা। পুলিশ সড়ক অবরোধে বাধা দিলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।  
নারায়ণগঞ্জে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী বলেন, শ্রমিকরা মূল সড়কে ওঠার চেষ্টা করলে তাদের আমরা মজুরি বোর্ড গঠন হয়েছে এবং সিদ্ধান্ত একটা আসবে জানিয়ে নিবৃত করার চেষ্টা করি। কিন্তু তারা না শোনায় পরে তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়। 
প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর প্রতিনিধি এবং আশুলিয়া (ঢাকা) সংবাদদাতা

Advertisement