
ড্যানিয়েল ডব্লিউ ড্রেজনার ও এলিজাবেথ এন সন্ডার্স
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কার্যত একজন ‘লেম ডাক’ বা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়া প্রেসিডেন্টে পরিণত হয়েছেন। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর পর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্টদের সামনে সাধারণত একটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে- দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের আইন প্রণয়ন কিংবা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সুযোগ ক্রমেই সঙ্কুচিত হয়। তখন অনেক প্রেসিডেন্ট নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বা লিগ্যাসি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পররাষ্ট্রনীতির দিকে বেশি মনোযোগ দেন। কারণ, অভ্যন্তরীণ রাজনীতির তুলনায় পররাষ্ট্রনীতিতে প্রেসিডেন্টের হাতে অনেক বেশি স্বাধীন ক্ষমতা থাকে।
অতীতে এমন নজির রয়েছে। বিল ক্লিনটন তার প্রেসিডেন্সির শেষ সময়ে ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাতের স্থায়ী সমাধান প্রতিষ্ঠার জন্য জোরালো উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন এবং অনেক বেশি জটিল।
ট্রাম্প এরই মধ্যে একবার লেম ডাক প্রেসিডেন্টের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন। ২০২০ সালের নভেম্বর থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি নির্বাচনে পরাজয় মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান, যদিও জো বাইডেনের বিজয়ের পক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের গত এক শ’ বছরের ইতিহাসে ট্রাম্পই প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি দুই মেয়াদে বিচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতায় ফিরেছেন। ফলে তার দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ পর্যায়টি অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের তুলনায় দীর্ঘ-মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর থেকে ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতা ছাড়ার আগ পর্যন্ত প্রায় দুই বছর।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে যাচ্ছে। এর ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত, অভিশংসনের উদ্যোগ এবং ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে কংগ্রেসে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। এতে প্রেসিডেন্ট নিজেকে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ও ক্ষুব্ধ মনে করতে পারেন।
এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় ঝুঁকি। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাধার মুখে পড়া ট্রাম্প নিজের রাজনৈতিক হতাশা পররাষ্ট্রনীতিতে প্রকাশ করতে পারেন। এমনকি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হঠকারী সিদ্ধান্ত বা সামরিক পদক্ষেপের আশ্রয় নিতে পারেন। ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে থাকা কংগ্রেসও প্রেসিডেন্টের দৈনন্দিন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনায় খুব বেশি হস্তক্ষেপ করতে পারবে না।
কানাডাকে নতুন করে হুমকি দেয়া, মার্কিন সামরিক জোটগুলোর প্রতি আস্থা দুর্বল করা কিংবা ইউক্রেন ও তাইওয়ানের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে রাশিয়া বা চীনের সাথে সমঝোতার চেষ্টা- এসবই হতে পারে ট্রাম্পের সম্ভাব্য পদক্ষেপ। তবে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সামরিক অবস্থান পরিবর্তন কিংবা বড় শক্তিগুলোর সাথে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন হবে।
কিন্তু ইরান ও কিউবা এমন দু’টি ক্ষেত্র, যেখানে ট্রাম্প তুলনামূলক কম প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখে বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে আলোচিত হয়েছে। তেহরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার এমন প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং এতে বৈশ্বিক অর্থনীতি, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়তে পারে। একইভাবে কিউবায় সরকার পরিবর্তনে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার চেষ্টাও করতে পারেন ট্রাম্প।
ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে প্রেসিডেন্টদের আচরণ
যখন কোনো প্রেসিডেন্টের সামনে আর নির্বাচনী প্রতিযোগিতার চাপ থাকে না, তখন তাকে লেম ডাক বলা হয়। এক মেয়াদের প্রেসিডেন্ট পুনর্নির্বাচনে পরাজিত হলে সাধারণত উত্তরসূরির নির্বাচন থেকে ক্ষমতা হস্তান্তর পর্যন্ত কয়েক মাস এ পরিস্থিতি থাকে। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্টের ক্ষেত্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন থেকে ক্ষমতা ছাড়ার আগ পর্যন্ত প্রায় দুই বছর সময় থাকে।
নির্বাচনী প্রচার ও আইন প্রণয়নের রাজনৈতিক চাপ কমে গেলে অনেক প্রেসিডেন্ট পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের উদ্যোগ নেয়ার চেষ্টা করেন। ক্লিনটন তার দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ সময়ে ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। উত্তর কোরিয়া সফরের পরিকল্পনাও করেছিলেন। ২০১৪ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের পর বারাক ওবামা ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি সম্পাদন এবং কিউবার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেন।
কখনো কখনো লেম ডাক প্রেসিডেন্টরা সামরিক শক্তি প্রয়োগের পথও বেছে নিয়েছেন। ১৯৯২ সালে জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ সোমালিয়ায় দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় সীমিত সামরিক অভিযান শুরু করেন। ২০০৭ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় পরাজয়ের পর জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাকে অতিরিক্ত মার্কিন সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।
তবে এসব উদ্যোগের ফলাফল মিশ্র ছিল। ক্লিনটনের শান্তি আলোচনা সফল হয়নি। ওবামার কূটনৈতিক অর্জনগুলোও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সোমালিয়ায় বুশের সামরিক উদ্যোগ সাময়িকভাবে দুর্ভিক্ষ মোকাবেলায় সহায়ক হলেও সঙ্ঘাতের মূল কারণ দূর করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে ক্লিনটনের অধীনে অভিযান সম্প্রসারিত হয়ে বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনে। ইরাকে অতিরিক্ত সেনা পাঠানোয় সহিংসতা সাময়িকভাবে কমলেও দেশটিতে স্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এসব উদ্যোগের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল- সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, বিশেষজ্ঞ এবং নীতিনির্ধারকদের সাথে আলোচনা ও পরিকল্পনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। লক্ষ্য স্পষ্ট ছিল এবং প্রেসিডেন্টরা তাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তিও তুলে ধরেছিলেন। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এমন প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি ও নীতিগত ব্যাখ্যার ঘাটতি প্রায়ই দেখা যায়।
শান্তির নোবেল, নাকি নতুন যুদ্ধের ঝুঁকি?
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও ট্রাম্প এখনো নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আকাক্সক্ষা পোষণ করেন। ফলে তার কূটনৈতিক উদ্যোগ বাড়তে পারে- এমন ধারণা স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হলো, তার সম্ভাব্য অনেক উদ্যোগের ক্ষেত্র ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হয়ে গেছে।
প্রথম মেয়াদে তিনি ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করেন, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সাথে তিনবার বৈঠক করেন, উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পরিবর্তে নতুন আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি করেন এবং ইসরাইলের সাথে কয়েকটি আরব দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভূমিকা রাখেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চুক্তি থেকেও যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন।
২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর গাজায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন এবং ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার অভিযানের নেতৃত্ব দেন।
তবে এসব উদ্যোগের অনেকগুলোরই কার্যকারিতার সীমা স্পষ্ট হয়ে গেছে। গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি দিলেও শেষ পর্যন্ত সেখানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সম্প্রসারণের একটি সমঝোতায় পৌঁছেছেন। জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিকল্প হিসেবে তার প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ও প্রত্যাশিত গুরুত্ব অর্জন করতে পারেনি। দেশগুলো এখন আর আগের মতো ট্রাম্পের প্রতিটি ইচ্ছার প্রতি আনুগত্য দেখাতে আগ্রহী নয়।
কাশ্মির কিংবা সুদানের মতো দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাত নিরসনে উদ্যোগ নেয়ার সুযোগ অবশ্য রয়েছে। কিন্তু এসব সমস্যার সমাধানে আঞ্চলিক বাস্তবতা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান, ধৈর্য ও দক্ষ কূটনৈতিক তৎপরতা প্রয়োজন। ট্রাম্পের মধ্যে এসব গুণের ঘাটতি রয়েছে বলে লেখকদের মূল্যায়ন। তিনি প্রায়ই কোনো সঙ্ঘাতের সমাধান করেছেন বলে দাবি করেন, যদিও বাস্তবে সংশ্লিষ্ট সঙ্ঘাতগুলো চলমান থাকে।
আরেকটি বড় সম্ভাবনা হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে একটি বৃহৎ শক্তির সমঝোতা বা ‘গ্রেট পাওয়ার কনসার্ট’ প্রতিষ্ঠা। ট্রাম্প, ভøাদিমির পুতিন ও শি জিনপিং একসাথে বৈশ্বিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারেন। কিন্তু এ ধরনের সম্মেলন থেকে কার্যকর ফল আসার সম্ভাবনা কম। রাশিয়া ও চীন- কোনো দেশই ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তিতে আগ্রহ দেখায়নি। ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমঝোতায় বাধ্য করার ক্ষেত্রেও তাদের আগ্রহ সীমিত।
ট্রাম্প ইউক্রেন কিংবা তাইওয়ানের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে রাশিয়া ও চীনের সাথে সমঝোতার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধের গত কয়েক বছর দেখিয়েছে, পুতিন আপস করতে আগ্রহী নন এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য তার রয়েছে। অন্যদিকে শি জিনপিং তাইওয়ানকে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেন। দ্বীপটির বিষয়ে নিজের অবস্থান সীমিত করার কোনো সমঝোতায় তার সম্মত হওয়ার সম্ভাবনা কম।
ফলে তিন নেতার সম্মেলন থেকে বাস্তব কোনো চুক্তির চেয়ে প্রচারমূলক সাফল্য অর্জনেই ট্রাম্প বেশি আগ্রহী হতে পারেন।
ইরান : সবচেয়ে বড় সঙ্ঘাতের আশঙ্কা
ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ আসতে পারে ইরানকে ঘিরে। তিনি হয়তো মনে করছেন, যুদ্ধের তীব্রতা বাড়িয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা ভাঙতে পারবেন এবং নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার রক্ষা করতে পারবেন।
কিন্তু ইরান অতিরিক্ত সামরিক চাপের মুখে সহজে নতি স্বীকার করবে না। বরং তেহরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হামলা বাড়াতে পারে, উপসাগরীয় মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করতে পারে এবং ট্রাম্পের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কূটনৈতিক উদ্যোগ এড়িয়ে যেতে পারে।
ইরানের বিরুদ্ধে আরো বড় সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রেও ট্রাম্পের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। খার্গ দ্বীপে মার্কিন সেনা মোতায়েনের মতো পদক্ষেপ তার নিজস্ব রাজনৈতিক সমর্থকদের মধ্যেই তীব্র বিরোধিতা তৈরি করতে পারে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। নতুন করে সঙ্ঘাত শুরু হলে বিশ্ব অর্থনীতি গভীর সঙ্কটে পড়তে পারে।
কিউবা : সরকার পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ পরিকল্পনা
কিউবায় সরকার পরিবর্তনের জন্যও ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারেন। ২০২৬ সালের অধিকাংশ সময় দ্বীপটির ওপর কঠোর অবরোধ আরোপ করে দেশটির প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা দুর্বল করার চেষ্টা করেছে তার প্রশাসন। ভেনিজুয়েলার সহায়তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় কিউবার অর্থনৈতিক দুর্দশা ও মানবিক সঙ্কট আরো গভীর হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মার্কো রুবিওর কাছে কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লক্ষ্য। এটি ট্রাম্পের ঘোষিত ‘ডনরো ডকট্রিন’-এর সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যার মূল লক্ষ্য পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা।
ট্রাম্পের দৃষ্টিতে কিউবায় সামরিক অভিযান তুলনামূলক সহজ হতে পারে। এতে বিপুল সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন নাও হতে পারে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের পুরোনো একটি রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান করার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
কিন্তু সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে সামরিক শক্তি প্রয়োগের ইতিহাস খুব আশাব্যঞ্জক নয়। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার ডাউনসের গবেষণায় দেখা গেছে, সামরিক শক্তি ব্যবহার করে অন্য দেশের সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা খুব কম ক্ষেত্রেই সফল হয় এবং প্রায়ই অনিশ্চিত পরিণতি ডেকে আনে। কিউবার ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য পরিণতি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থীদের নতুন ঢল।
তবু ট্রাম্প এটিকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ কিন্তু আকর্ষণীয় রাজনৈতিক জুয়া হিসেবে দেখতে পারেন। তিনি মনে করতে পারেন, কিউবার কমিউনিস্ট সরকারকে উৎখাত করতে পারলে ইতিহাসে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ইরান ইস্যুতে ব্যর্থতা থেকে দৃষ্টি সরানোর জন্যও কিউবা অভিযান তার কাছে একটি বিকল্প হতে পারে।
পররাষ্ট্রনীতির আড়ালে পারিবারিক ব্যবসা?
ট্রাম্পের শেষ দুই বছরের পররাষ্ট্রনীতিতে আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় হতে পারে তার পরিবারের আর্থিক স্বার্থ। বিদেশী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ দেয়ার অভিযোগ এরই মধ্যে উঠেছে।
কাতারের আমিরের কাছ থেকে একটি বিলাসবহুল উড়োজাহাজ গ্রহণ, সৌদি যুবরাজের নেতৃত্বাধীন একটি তহবিল থেকে দুই বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবসায় বিদেশী ক্রেতাদের অংশগ্রহণ-এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। দ্য নিউ ইয়র্কারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ট্রাম্প পরিবার প্রায় চার বিলিয়ন ডলার আয় করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সিনেটে অভিশংসনের মাধ্যমে তাকে অপসারণ করতে প্রয়োজনীয় ৬৭টি ভোট পাওয়া যাবে না- এমন ধারণা থেকে ট্রাম্প মনে করতে পারেন, তার আর হারানোর কিছু নেই। ফলে শেষ দুই বছরে আরো বেশি ব্যবসায়িক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করতে পারেন তিনি।
সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি কি তাহলে নিষ্ক্রিয়তা?
ট্রাম্পের শেষ দুই বছরের সবচেয়ে বিস্ময়কর সম্ভাবনা হতে পারে- তিনি কিছুই করবেন না। ওয়াশিংটনকে নিজের পছন্দমতো সাজানো, ওভাল অফিসের নতুন নকশা, হোয়াইট হাউজে বলরুম নির্মাণ এবং কেনেডি সেন্টার পুনর্গঠনের মতো কাজে তিনি ইতোমধ্যে মনোযোগ দিয়েছেন।
এমনও হতে পারে, শেষ দুই বছর তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তদন্ত ও মামলা পরিচালনা, ক্ষমা প্রদর্শন এবং নিজের নামে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের মতো কাজে ব্যস্ত থাকবেন।
পররাষ্ট্রনীতিতে তার নিষ্ক্রিয়তা হয়তো বিশ্ববাসীর জন্য সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি হবে। কারণ, রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা একজন প্রেসিডেন্ট যখন নিজের উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন, তখন তার সিদ্ধান্তের পরিণতি শুধু নিজ দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা আঞ্চলিক সঙ্ঘাত, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
ট্রাম্পের সামনে এখন দু’টি পথ- কূটনৈতিক সাফল্যের মাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা করা, অথবা সামরিক শক্তি ও একতরফা সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শেষ সময়ের রাজনৈতিক হতাশা প্রকাশ করা। কোন পথ তিনি বেছে নেবেন, তার ওপরই নির্ভর করতে পারে তার প্রেসিডেন্সির শেষ দুই বছরের আন্তর্জাতিক তাৎপর্য।
মূল উদ্বেগ হলো, ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে ট্রাম্পের রাজনৈতিক স্বাধীনতা যত বাড়বে, তার সিদ্ধান্তের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ তত দুর্বল হতে পারে। আর সেই সমীকরণই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
সূত্র : ফরেন অ্যাফেয়ার্স সাময়িকী
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








