নীল ঢেউয়ে বিপর্যস্ত ট্রাম্প
নীল ঢেউয়ে বিপর্যস্ত ট্রাম্প।
  •  ২ কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের, রিপাবলিকান দুর্গেও উত্থান
  •  প্রেসিডেন্টের নীতি আটকে দেয়ার ঘোষণা ডেমোক্র্যাটদের
  •  নমনীয় সুর ট্রাম্পের, তবে ভেটো দেয়ার হুমকি
  •  প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর ও মুসলিম সিনেটর জয়ে ইতিহাসের নতুন রেকর্ড
  •  জীবনযাত্রার ব্যয় ও ইরান সঙ্ঘাত নিয়ে জন-অসন্তোষের প্রতিফলন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতি ও শাসনের ওপর এক বড় ধরনের রাজনৈতিক অনাস্থা জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস ও সিনেট- মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষেরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়েছে বিরোধী ডেমোক্র্যাট দল। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে দেশজুড়ে ডেমোক্র্যাটদের এই ভূমিধস জয় ট্রাম্পের চার বছরের মেয়াদের শেষ দুই বছরে তার ক্ষমতার রাশ শক্তভাবে টেনে ধরবে। খবর সিএনএন, এপি, নিউ ইয়র্ক টাইমস, এবিসি নিউজ, রয়টার্স, বিবিসি, আলজাজিরাসহ অন্যান্য সূত্রের। সর্বশেষ  প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী ডেমোক্র্যাটরা ৪৩৫ আসনের প্রতিনিধি পরিষদে ২২৮ আসনে জয় পেয়েছে। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানরা পেয়েছে ১৩৯টি আসন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে রিপাবলিকানদের কাছ থেকে এ পর্যন্ত নতুন করে ২৫টি আসন ছিনিয়ে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রয়োজন ছিল ২১৮ আসন।
অন্যদিকে আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেটে নিজেদের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী করে তুলেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। সিনেটে নিজেদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে তাদের প্রয়োজন ছিল মাত্র একটি আসন। সেটিও তারা নিশ্চিত করেছে। সবশেষ প্রকাশিত ফলাফল ও ভোট গণনার চিত্র অনুযায়ী সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে মোট আসন প্রয়োজন ছিল ৫১টি। ডেমোক্র্যাটরা ৫১টি আসনে জয় নিশ্চিত করেছে এবং আরো দু’টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে রিপাবলিকানরা ৩৯টি আসনে জয় পেয়েছে এবং ছয়টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অপেক্ষমাণ একটি আসনের ফল চূড়ান্ত হতে এখনো বাকি রয়েছে।
এই বড় ধরনের জয়ের ফলে ডেমোক্র্যাটদের হাতে এখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান প্রশাসনের প্রস্তাবিত বিভিন্ন বিতর্কিত আইন আটকে দেয়া, ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্ত শুরু করা এবং তার বিচারক ও সরকারের উচ্চপদস্থ নিয়োগ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের মতো জোরালো আইনি ক্ষমতা চলে গেল।
জীবনযাত্রার চড়া ব্যয়, অতিরিক্ত শুল্কনীতি এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকেন্দ্রিক সঙ্ঘাতের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রল ও জ্বালানির আকাশচুম্বী মূল্যের বিরুদ্ধে সাধারণ ভোটারদের তীব্র ক্ষোভের প্রকাশ ঘটেছে এই নির্বাচনে। সব মিলিয়ে সাধারণ মার্কিন জনগণের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগে থেকেই থাকা অজনপ্রিয়তা এবার ব্যালট বাক্সে বড় ধস ডেকে এনেছে।
টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রার্থী জেমস তালারিকোর বিপুল জয়ে উল্লাস প্রকাশ করে ক্যাথি জ্যাকোওয়ে নামে এক সমর্থক বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে আনন্দে এখনই কেঁদে ফেলি। ঘটনাটি অসাধারণ রোমাঞ্চকর। আমরা শেষ পর্যন্ত আমাদের দেশকে সঠিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে পারব।’
নমনীয় সুর ট্রাম্পের, তবে ভেটো দেয়ার হুমকি
অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে পরাজয়ের পর ফলাফল নিয়ে অনাস্থা প্রকাশের রেকর্ড থাকলেও, এবার প্রাথমিক ফলাফলের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বেশ নমনীয় সুর গ্রহণ করেছেন। নির্বাচনের ফল নিশ্চিত হওয়ার পর নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, জনগণের এই রায় মেনে নিতে তার ‘কোনো দ্বিধা নেই।’
পরবর্তীতে ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বিরোধী শিবিরের বিরল প্রশংসা করে বলেন, ‘আমার মনে হয় ডেমোক্র্যাটরা সত্যি অসাধারণ কাজ করেছে। তারা প্রচণ্ড লড়াই করেছে।’ তবে নিজ দলের এই অনাকাক্সিক্ষত ও বিপুল পরাজয়ের দায় থেকে নিজেকে দূরে রেখে তিনি যোগ করেন, ‘আমি মনে করি না এটি সরাসরি আমার ওপর কোনো আঘাত।’
ইরান সঙ্ঘাত দলের এই হারের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে ট্রাম্প স্বীকার করলেও, নিজের সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্তকে তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে রক্ষা করার চেষ্টা করেন। একই সাথে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, দুই দলের তীব্র রাজনৈতিক বিরোধ সত্ত্বেও অভিবাসনের মতো দীর্ঘদিনের স্পর্শকাতর ইস্যুতে উভয় পক্ষ হয়তো কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে।
তবে এই নরম সুরের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীদের কাছে ভিন্ন বার্তা দেন ট্রাম্প। তিনি দাবি করেন, যদি নির্বাচনটিতে তিনি নিজে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে লড়তেন তবে রিপাবলিকানরা ‘ভূমিধস জয়’ পেত। যদিও পুরো প্রচারণা জুড়ে তিনি তার সমর্থকদের বারবার অনুরোধ করেছিলেন- ‘মনে করুন ব্যালটে আমিই আছি।’ ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠ কংগ্রেস থেকে পাস হওয়া যেকোনো প্রস্তাবিত বিল নিজের প্রেসিডেন্ট ‘ভেটো’ (বাতিল করার একক ক্ষমতা) দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়ার হুমকিও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
ঐতিহাসিক সব ওলটপালট ও লাল দুর্গে ধস
দীর্ঘদিন ধরে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বেশ কয়েকটি ডেল্টা ও কনজারভেটিভ অঙ্গরাজ্যে এবার ডেমোক্র্যাটরা বড় জয় নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সাউথ ক্যারোলিনা, নর্থ ক্যারোলিনা, আইওয়া, ক্যানসাস, ওহাইও, টেক্সাস ও মেইন।
মেইন অঙ্গরাজ্যে সাবেক কাঠুরিয়া ট্রয় জ্যাকসন দীর্ঘদিন ধরে সিনেটর থাকা প্রভাবশালী রিপাবলিকান প্রতিনিধি সুসান কলিন্সকে পরাজিত করেছেন। এর মাধ্যমে রিপাবলিকানদের হারিয়ে সিনেটে তাদের সপ্তম আসনটি ছিনিয়ে নেয় ডেমোক্র্যাটরা।
অন্যদিকে, ক্যানসাসে মেথডিস্ট চার্চের যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টন বিজয়ী হয়ে ১৯৩২ সালের পর সেখানকার প্রথম ডেমোক্র্যাট সিনেটর হিসেবে নতুন ইতিহাস রচনা করেছেন। একই সাথে আইওয়াতেও ২০০৮ সালের পর এই প্রথম কোনো ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি সিনেটর হিসেবে জয়ী হলেন।
টেক্সাসে বিজয়ী ডেমোক্র্যাট সিনেটর জেমস তালারিকো নিজের এই ঐতিহাসিক জয়কে বাইবেলের প্রকাণ্ড ‘গোলিয়াথ’ বধের সাথে তুলনা করেন। এ ছাড়া সেখানে জিনা হিনোওসা রিপাবলিকান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে পরাজিত করে কয়েক দশকের একচ্ছত্র রিপাবলিকান শাসনের অবসান ঘটিয়েছেন। পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটরা তাদের হাতে থাকা আগের মূল আসনগুলোর নিয়ন্ত্রণও দক্ষতার সাথে ধরে রাখতে পেরেছে- যার মধ্যে জর্জিয়ায় জন অসফ এবং নিউ হ্যাম্পশায়ারের আসনটি অন্যতম।
প্রথম মুসলিম সিনেটর ও কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর
ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ের মাত্রা ও বৈচিত্র্য আরো নতুন মাত্রা পায় যখন মিশিগানে সাবেক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন ডাক্তার ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুল এল-সায়েদ। এর মাধ্যমে তিনি মার্কিন ইতিহাস ও উচ্চকক্ষ সিনেটে নির্বাচিত হওয়া প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে ইতিহাস গড়লেন।
ডেট্রয়েটে নিজের নির্বাচনী কার্যালয়ে বিপুল সমর্থকের উপস্থিতিতে উচ্ছ্বসিত এল-সায়েদ বলেন, ‘মিশিগান, আমরা তা করে দেখিয়েছি!’ প্রাথমিক ডেমোক্র্যাট নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর একদম শেষ মুহূর্তে অপর ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি হ্যালি স্টিভেন্স উল্টো রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সকে সমর্থন দিলেও, সেই বড় বাধা ডিঙিয়ে এল-সায়েদ শেষ পর্যন্ত জয় ছিনিয়ে আনেন।
অন্যদিকে মার্কিন কংগ্রেসের নি¤œকক্ষ বা প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটরা পেনসিলভানিয়া, কেনটাকি, অ্যারিজোনা, নর্থ ক্যারোলিনা, উইসকনসিন ও নিউ জার্সিতে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। এসব এলাকার বহু জেলায় দুই বছর আগের নির্বাচনেও ডোনাল্ড ট্রাম্প বেশ অনায়াসে ও বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। ইন্ডিয়ানার বহুল আলোচিত একটি আসনে ডেমোক্র্যাট জে.ডি. ফোর্ড রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ভিক্টোরিয়া স্পার্টজকে অপসারিত করেন। অথচ আগের নির্বাচনে এই জেলায় ট্রাম্প ১৭ পয়েন্টের বড় ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন।
এ ছাড়া জর্জিয়ার রাজ্য রাজনীতিতে এসেছে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন। আটলান্টার সাবেক মেয়র কিশা ল্যান্স বটমস রাজ্যটির গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এর মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ২৪০ বছরের বেশি সময়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হওয়ার মাইলফলক অর্জন করলেন।
তবে ডেমোক্র্যাটিক ঝড়ের মধ্যেও রিপাবলিকান পার্টি কিছুটা স্বস্তির মুখ দেখেছে ফ্লোরিডায়। সেখানে ট্রাম্প সমর্থিত বাইরন ডোনাল্ডস অঙ্গরাজ্যটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন এবং অ্যাশলি মুডি শেষ মুহূর্তের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই সামলে সিনেট আসনটি ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছেন।
প্রেসিডেন্টের নীতি আটকে দেয়ার ঘোষণা ডেমোক্র্যাটদের
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত কর্মসূচি আটকে দিতে ব্যাপক উদ্যোগের প্রস্তুতি নিচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। শুল্কনীতি প্রত্যাহার, ইরান যুদ্ধ বন্ধ, স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি সুবিধা পুনর্বহাল এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তদন্তকে অগ্রাধিকার দিতে চায় দলটি। নতুন কংগ্রেস আগামী জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণ করলে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর দলটির নেতা হাকিম জেফরিস প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে কংগ্রেসের ক্ষমতা ব্যবহারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের বৈশি^ক শুল্ক প্রত্যাহারে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারে। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা খাতে মেডিকেইডের কাটছাঁট বাতিল এবং স্বাস্থ্যবীমা ভর্তুকি পুনর্বহালের পরিকল্পনা রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করাও দলটির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। 
নীতিগত উদ্যোগের পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা। প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন কমিটি প্রশাসনের কর্মকাণ্ড, প্রেসিডেন্টের পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ, অভিবাসন অভিযান এবং জেফরি এপস্টাইন-সংক্রান্ত নথি নিয়ে তদন্ত করতে পারে। প্রয়োজনে সাক্ষ্য গ্রহণ ও নথি তলবের ক্ষমতা ব্যবহার করার কথাও জানিয়েছে দলটি।
তবে ডেমোক্র্যাটদের উদ্যোগ বাস্তবায়নে সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বাধা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেকোনো আইন ভেটো দিতে পারেন। সিনেটে অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করতে ৬০ ভোটের প্রয়োজন হওয়ায় দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও সব উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ হবে না।
ভোটারদের ক্ষোভের কেন্দ্রে অর্থনীতি
নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক অসন্তোষ। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের দুই বছর পরও অনেক ভোটার মনে করছেন, তাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
রয়টার্সের নির্বাচনী বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার জীবনযাত্রার ব্যয়কে নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বা প্রধান ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করেছেন। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার উচ্চমূল্যের জন্য ট্রাম্পকে দায়ী করেছেন। ভোটারদের বড় অংশ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষুব্ধ অথবা অসন্তুষ্ট ছিলেন।
ট্রাম্প প্রশাসনের আমদানি শুল্কনীতি এবং ইরানের সাথে যুদ্ধ অর্থনৈতিক চাপ আরো বাড়িয়েছে বলে ভোটারদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতির ওপর প্রভাব পড়েছে। অন্যদিকে শুল্কনীতির কারণে আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়েছে বলে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করলেও ভোটারদের মনোভাব সেই বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। নির্বাচনী ফলাফলে সেই অসন্তোষ স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে। যুদ্ধের অর্থনৈতিক ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রয়টার্স ও এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রতি অসন্তোষ রিপাবলিকানদের নির্বাচনী অবস্থান দুর্বল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে।
ট্রাম্প নিজেও নির্বাচনের পর স্বীকার করেছেন, ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকানদের পরাজয়ে ভূমিকা রেখেছে। তবে তিনি সামরিক অভিযানের পক্ষে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছেন। নির্বাচনের আগে ট্রাম্প সমর্থকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ভোটাররা যেন তাকে ব্যালটে থাকা প্রার্থীর মতো বিবেচনা করেন। ফলে নির্বাচনের ফলকে তার প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ভবিষ্যৎ ও বিচার বিভাগীয় সঙ্ঘাত
জর্জ ওয়াশিংটন বিশ^বিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক টড বেল্ট আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি-কে বলেন, ‘নির্বাচনের এই রাতটি ছিল ট্রাম্পের নীতি এবং তার অনুসৃত শাসনের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের চরম প্রত্যাখ্যানে ভরা এক বিশাল রাজনৈতিক ধসের রাত।’
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের এই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি দুই বছরকে চরম চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দেবে। এখন থেকে ইরান যুদ্ধ, কড়াকড়ি অভিবাসন নীতি বাস্তবায়ন ও বিভিন্ন আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে সংসদীয় তদন্ত কমিটিগুলোর পথ সুগম হয়ে গেল।
ইতোমধ্যেই প্রতিনিধি পরিষদের অত্যন্ত শক্তিশালী ‘ওভারসাইট কমিটি’র (নজরদারি কমিটি) প্রধান হতে যাওয়া ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি রবার্ট গার্সিয়া সামাজিক মাধ্যমে রিপাবলিকানদের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিয়ে সতর্ক করে লিখেছেন, ‘এখনই অভিজ্ঞ আইনজীবী নিয়োগ করে প্রস্তুতি নিয়ে রাখুন।’
হাউজ ডেমোক্র্যাটিক লিডার হাকিম জেফ্রিস উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, ট্রাম্পের ‘মাগা’ আন্দোলন এখন পুরো দেশজুড়েই চরম কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। আগামী জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন বসলে জেফ্রিস মার্কিন কংগ্রেসের ইতিহাস ভেঙে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ স্পিকার হতে যাচ্ছেন। সব মিলিয়ে আগামী দুই বছর ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজ ও কংগ্রেসের মধ্যে এক নতুন রাজনৈতিক লড়াই ও অচলাবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে এই ফল।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে নতুন হিসাব
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। ২০২৮ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে আর প্রার্থী হতে পারবেন না, তবে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, রিপাবলিকান দলের নেতৃত্ব এবং সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের অবস্থান নির্ধারণে এই ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ডেমোক্র্যাটদের বিজয় দলটির নেতৃত্ব ও সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। একই সাথে রিপাবলিকানদের মধ্যে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কৌশল, প্রার্থী নির্বাচন এবং প্রশাসনের নীতির কার্যকারিতা নিয়ে বিতর্ক বাড়তে পারে।
তবে নির্বাচনী বিজয় ডেমোক্র্যাটদের জন্যও সহজ পথ নিশ্চিত করেনি। ভোটাররা শুধু ট্রাম্পবিরোধী অবস্থানের কারণে তাদের সমর্থন করেননি; অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান এবং কার্যকর শাসনের প্রত্যাশাও তাদের সামনে রয়েছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার পর সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক অবস্থানও দুর্বল হতে পারে।

Advertisement