দ. এশিয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমেছে ২০%, সতর্ক করছে বিশ্বব্যাংক

  বিশেষ সংবাদদাতা

Advertisement

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রসারের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় এআইয়ের কারণে ঝুঁকিতে থাকা পেশাগুলোতে চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমেছে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিতে। তবে স্নাতকোত্তর যোগ্যতাসম্পন্ন পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বিশ্বব্যাংকের এক নতুন প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্বব্যাংক সম্প্রতি ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া : ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের শেষ দিকে বড় ধরনের জেনারেটিভ এআই টুল বাজারে আসার পর কল সেন্টারের কাজ ও প্রাথমিক হিসাবরক্ষণের মতো পেশায় চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। গত মঙ্গলবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।
এআই নিয়ে আলোচনায় প্রায়ই দু’টি চরম অবস্থান দেখা যায়- এক দিকে বলা হয়, এআই মানুষের সব চাকরি কেড়ে নেবে; অন্য দিকে দাবি করা হয়, এতে কর্মসংস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন এই দুই অবস্থানের মাঝামাঝি একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। এতে দেখা যাচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় জেনারেটিভ এআইয়ের প্রসারের পর ঝুঁকিপূর্ণ পেশাগুলোতে চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমেছে প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। তবে সব ধরনের পেশায় এর প্রভাব সমান নয়। মূলত প্রাথমিক পর্যায়ের কাজগুলোই বেশি চাপে পড়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ের চাকরিতে বেশি প্রভাব
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআইয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে কর্মজীবনের শুরুর দিকের চাকরিগুলোতে। যেসব পদে মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের যোগ্যতা থাকলেই কাজ করা যায়, সেসব পদের চাকরির বিজ্ঞপ্তি কমেছে প্রায় ২৪ শতাংশ। বিপরীতে, স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের উপযোগী চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি। একইভাবে এআইয়ের সাথে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়- এমন পেশাজীবীদের চাহিদাও মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ভাষ্য, দক্ষিণ এশিয়ার তরুণ কর্মীরা শ্রমবাজারের এমন একটি স্তরে অবস্থান করছেন, যেখানে এআই সবচেয়ে সহজে মানুষের কাজের বিকল্প হয়ে উঠতে পারে। ফলে তারাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
কল সেন্টার কিংবা প্রাথমিক হিসাবরক্ষণের মতো কাজ ছিল মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পাস তরুণদের শ্রমবাজারে প্রবেশের অন্যতম প্রধান সুযোগ। কিন্তু এই প্রবেশপথই যদি সঙ্কুচিত হয়ে আসে, তাহলে তরুণেরা কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন কোথায়? বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার তরুণেরা ঠিক সেই জায়গাতেই অবস্থান করছেন, যেখানে এআইয়ের কাজ প্রতিস্থাপনের সক্ষমতা সবচেয়ে বেশি।
ঝুঁকির পাশাপাশি সম্ভাবনাও রয়েছে
তবে এআইকে শুধু কর্মসংস্থানের হুমকি হিসেবে দেখছে না বিশ্বব্যাংক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এআই-সংশ্লিষ্ট কাজের প্রায় ৭০ শতাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ এআইয়ের সাথে সমন্বয় করে কাজ করতে পারেন; সেখানে এআই সরাসরি মানুষের বিকল্প হয়ে ওঠে না। উন্নয়নশীল অঞ্চলগুলোর মধ্যে এ হার সর্বোচ্চ। বিশ্বব্যাংক একে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে।
অর্থাৎ, এআইয়ের কারণে কিছু পেশায় চাকরির সুযোগ কমলেও অন্য অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কাজের দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন এবং প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়াই হবে কর্মীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি
প্রতিবেদনে এআই নিয়ে বাংলাদেশের জন্য আলাদা কোনো পরিসংখ্যান দেয়া হয়নি। তবে দেশটির শ্রমবাজার ও মানবসম্পদ উন্নয়নের সাথে সম্পর্কিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনো প্রায় দুই দশক বাকি। অন্য দিকে দক্ষিণ এশিয়ায় মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে। এ অঞ্চলের আনুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে বছরে মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ হারে, যেখানে অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতিতে এ বৃদ্ধির গড় হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
শিক্ষা ও দক্ষতার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার বয়সী প্রতি ১০ শিশুর মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়জন বিদ্যালয়ের বাইরে থাকে অথবা ১০ বছর বয়সেও সহজে পড়তে পারে না। এ ছাড়া নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৩৫ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়ানো, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি সম্প্রসারণ এবং কর্মক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি কর্মজীবনের মধ্যবর্তী ও শেষ পর্যায়ে নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
কর্মসংস্থান বাড়াতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, শুল্ক ও কাস্টমসসংক্রান্ত জটিলতা কমানো এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার সুপারিশও করা হয়েছে। বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি।
সংস্কার হলে বাড়তে পারে মাথাপিছু আয়
বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানবসম্পদের উন্নয়ন এবং শ্রমশক্তিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর মধ্যম মাত্রার সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ৪ শতাংশ বাড়তে পারে। আর নারী-পুরুষের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের ব্যবধান পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হলে এ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বেড়ে ১৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের জন্য আলাদা কোনো ‘এআই কৌশল’ প্রস্তাব করেনি। বরং এআইয়ের সম্ভাবনা কাজে লাগানো এবং কর্মসংস্থানের ঝুঁকি মোকাবেলায় বৃহত্তর অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা, কারিগরি ও কর্মক্ষেত্রভিত্তিক প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ সরবরাহের উন্নতি, ব্যবসায়িক জটিলতা হ্রাস এবং নারী উদ্যোক্তাদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করা।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট, এআইয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশের প্রধান কাজ শুধু প্রযুক্তি গ্রহণ নয়; বরং এমন মানবসম্পদ তৈরি করা, যারা প্রযুক্তির সাথে প্রতিযোগিতা করার পরিবর্তে প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারবেন। কর্মজীবনের শুরুতেই তরুণদের জন্য দক্ষতা অর্জন ও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা না গেলে এআইয়ের প্রসার শ্রমবাজারে বিদ্যমান বৈষম্য আরো বাড়িয়ে দিতে পারে।