মৃত্যুফাঁদ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে মানা হয় না সেফটি প্রটোকল
  •  বিধি না মেনে প্রায়ই অরক্ষিতভাবে চলে ভারী ক্রেন
  •  বিচারহীনতাই ঠিকাদারদের অবহেলার কারণ : আদিল খান

‘ভাই, আমাকে একটু বাঁচান, হাসপাতালে নেয়ার ব্যবস্থা করুন; আমি আপনার পা ছাড়ব না!’ রক্তে ভেসে যাওয়া এক যুবক রাজপথে এক পথচারীর কাছে এভাবেই আকুতি জানাচ্ছিলেন। পাশে পড়ে ছিল তার থেঁতলে যাওয়া একজোড়া পা, শরীর ছিল ক্ষতবিক্ষত। 
গত ১৮ অক্টোবর সকালে রাজধানীর ব্যস্ত হাতিরঝিল এলাকায় ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে ব্যবহৃত একটি ভারী ক্রেন পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে মোটরসাইকেল আরোহী এ বি এম আহসান উল্লাহ আরিফকে (৩৭) পিষে দেয়। আশপাশের মানুষ তখন তাকে উদ্ধার না করে মোবাইলে ছবি ও ভিডিও তুলতে ব্যস্ত ছিলেন। বাঁচার আকুতিতে আরিফ এক পথচারীর পা জড়িয়ে ধরেন, তার ফোন চেয়ে নিয়ে নিজের ভাইকে ঘটনা জানান। 
পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও দুই সন্তানের বাবা আরিফকে মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। তাকে ৪০ ব্যাগেরও বেশি রক্ত দেয়া হয়। অস্ত্রোপচার করে একটি পা কেটে ফেলতে হয়। আইসিইউতে টানা পাঁচ দিনের লড়াইয়ের পর ২৩ অক্টোবর রাতে তিনি মারা যান। 
ঘটনার পর হাতিরঝিল থানায় মামলা হয়। ক্রেনচালক মেহেদী হাসান সানি (৩২) ও রাইমানকে (২০) গ্রেফতার করা হয়। তবে পুলিশ জব্দ করা ক্রেনটি আবার ঠিকাদারি কোম্পানির জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছে বলে জানা যায়। স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনার পর আজ পর্যন্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিহতের পরিবারের সাথে যোগাযোগের সামান্য সৌজন্যও দেখায়নি। 
এই মৃত্যু কেবল একটি সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা নয়। অনুসন্ধানে অফিসিয়াল নথি, ফরেনসিক প্রমাণপত্র, পুলিশের মামলার ডকেট ও প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্যে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে গাফিলতির ছবি উঠে এসেছে। এসব তথ্যে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা বিধিমালার প্রকাশ্য লঙ্ঘন এবং বিদেশী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলার চিত্রও মিলেছে। 
নথি অনুযায়ী, আরিফ রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলে থাকাবস্থায় পেছন থেকে ভারী ক্রেনের ধাক্কায় আহত হন। কার্ডিও রেসপিরেটরি অ্যারেস্ট, সেপ্টিক ও হাইপোভলিউমিক শক এবং ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হওয়া তীব্র কিডনি বিকলতার (একেআই) পাশাপাশি ডান পায়ের ঊরুর মধ্যাংশ কেটে ফেলায় তার মৃত্যু হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার ডান পায়ের হাড় কয়েক টুকরো হয়ে গিয়েছিল। বাঁ পায়ের মাংস ছিঁড়ে আলাদা হয়ে যায়। শরীরের নিম্নাংশে মারাত্মক থেঁতলে যাওয়ার আঘাত ছিল। 
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, আরিফকে ধাক্কা দেয়ার পর ক্রেনটি থামানো হয়নি। উল্টো সেটি তার শরীরের ওপর তুলে দেয়া হয় এবং কিছুক্ষণ চেপে রেখে পার হয়ে যায়। 
নির্মাণ নিরাপত্তা বিধি ও সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী, জনবহুল সড়কে ক্রেন বা ভারী যন্ত্রপাতি চলাচলের সময় সাধারণ যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা বাধ্যতামূলক। ক্রেনের স্বয়ংক্রিয় লোডার ঘোরার সাড়ে ৭ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে মানুষ বা যানবাহনের প্রবেশ ঠেকাতে চার দিকে অন্তত চারজন ‘ওয়াচম্যান’ বা সঙ্কেত প্রদানকারী থাকার কথা। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথাও বিধিমালায় আছে। 
অনুসন্ধানে জানা যায়, সেদিন কোনো ট্রাফিক শাটডাউন বা ওয়াচম্যান ছাড়াই চলমান সড়কে অরক্ষিতভাবে ভারী ক্রেনটি নামানো হয়েছিল। একটি মেগা প্রকল্পে জনবহুল সড়কে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারের নিরাপত্তা-প্রটোকল থাকলেও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজে তা মানা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। 
এ ঘটনাই প্রথম নয়। মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে রাজধানীতে সাধারণ মানুষের জীবন দিন দিন সস্তা হয়ে উঠছে। ২০২৪ সালে মগবাজারে মতিউর রহমান নামে এক হকারের ওপর স্টিলের ফ্রেম পড়ে। ২০২৩ সালে মহাখালীতে লোহার রড পড়ে ১২ বছর বয়সী এক শিশু প্রাণ হারায়। ২০২৪ সালে আশুলিয়ায় আঙ্গুর মিয়া নামে একজন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যান। ২০২২ সালে তেজগাঁওয়ে হাসান নামে একজন দু’টি গার্ডারের মাঝে চাপা পড়েন। ২০২৩ সালে বনানীতে ড্রাম ট্রাকের ধাক্কায় নুরুল আমিন নামে এক ব্যক্তি প্রাণ হারান। ২০২৪ সালে তেজকুনিপাড়ায় ক্রেন থেকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের কাজের কনটেইনার পড়ে চাপা পড়ে মারা যান শামীম মিয়া। ২০২২ সালে গাজীপুর-উত্তরা বিআরটি প্রকল্পে ক্রেন থেকে ফ্লাইওভারের গার্ডার খসে পড়ে একই পরিবারের পাঁচজন গাড়ির ভেতরেই পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান। 
প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন ও সাময়িক আলোচনা হলেও কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি বা লাইসেন্স বাতিলের নজির তৈরি হয়নি। ফলে দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রচলিত আইন ও নিরাপত্তা-প্রটোকল তোয়াক্কা না করেই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ চালিয়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ সেতু বিভাগের অধীনে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পে নিয়োজিত আছে দু’টি চীনা ঠিকাদারি যৌথ প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ‘স্যংডং হাই-স্পিড করপোরেশন লিমিটেড’-এর শেয়ার ৮২ শতাংশ এবং ‘সাইনোহাইড্রো জেভি’র ১৮ শতাংশ; অর্থাৎ এক প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠান দিয়ে কাজ করাচ্ছে। 
তাদের কাজের পদ্ধতিতে গুরুতর দুর্বলতা ও গাফিলতির কথা উঠে এসেছে। বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রধান শি শিয়াংগুইসহ বিদেশী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তারা স্থানীয় পর্যায়ে কঠোর প্রশাসনিক বা আইনি জবাবদিহির মুখে পড়েন না বললেই চলে। সেতু বিভাগ বা প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীরাও নিয়মিত সেফটি প্রটোকল অডিট বা কড়া মনিটরিং নিশ্চিত করছেন না বলে অভিযোগ। 
আরিফের পরিবার কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ দাবি করেনি। তারা বলেছে, কোনো অর্থই তাদের সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে পারবে না। তাদের মূল লক্ষ্য, বিদেশী কোম্পানিগুলো যেন নিরাপত্তা-প্রটোকল মানতে বাধ্য হয়। পরিবারের ভাষ্য, উন্নয়ন অবশ্যই দরকার, কিন্তু তা যেন কোনো নিরপরাধ মানুষের তাজা রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে না হয়। বর্তমানে নিহতের পরিবার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রধানসহ দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে এবং জনসচেতনতা তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে। 
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অবকাঠামো উন্নয়ন দেশের জন্য প্রয়োজনীয়, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে সেই উন্নয়ন কখনো প্রশংসনীয় হতে পারে না। মেগা প্রকল্পে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা-প্রটোকল কঠোরভাবে প্রয়োগ, অবহেলাকারী দেশী-বিদেশী ঠিকাদারদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও সঠিক মনিটরিং নিশ্চিত না করা গেলে রাজধানীর সড়কগুলো সাধারণ মানুষের জন্য ‘মৃত্যুফাঁদ’ হয়েই থাকবে। এসব দুর্ঘটনার পরও সেতু বিভাগের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। 
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, নির্মাণকাজ চলাকালে কিংবা ভারী যানবাহন ও নির্মাণসামগ্রী চলাচলের সময় সার্বিক নিরাপত্তা বেষ্টনী ও ‘সেফটি মেজার’ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। কাজটি বিদেশী বা দেশী, যে কোম্পানিরই হোক, নিরাপত্তায় কোনো ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই। এই দুর্ঘটনায় বিআরটিএর ট্রাস্ট ফান্ড থেকে পাওয়া নিয়মমাফিক পাঁচ লাখ টাকার সাহায্য যথেষ্ট হতে পারে না। 
তিনি আরো বলেন, যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অবহেলায় একজন মানুষের প্রাণ গেল, সরাসরি তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। তাদের কোটি টাকার দৃষ্টান্তমূলক ক্ষতিপূরণ ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে। কড়া শাস্তির মুখোমুখি না হলে তারা কখনো সতর্ক হবে না। বারবার এমন ঘটনার মূল কারণ সুশাসনের অভাব। অপরাধী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না করা গেলে মেগা প্রকল্পগুলো সাধারণ মানুষের জন্য বারবার মৃত্যুফাঁদে পরিণত হবে। 
নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মুহাম্মদ খান নয়া দিগন্তকে বলেন, বিশ্বজুড়ে বড় নির্মাণ কোম্পানিকে কড়া আইনি বাধ্যবাধকতা ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা-প্রটোকল মেনে চলতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে মেগা প্রকল্পে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা-মান চরমভাবে দুর্বল। বারবার প্রাণহানির পরও তাদের নিরাপত্তা-প্রটোকলে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। এর প্রধান কারণ অবহেলা ও বিচারহীনতা। বড় বড় দুর্ঘটনায় একাধিক মানুষের প্রাণ গেলেও বড় ধরনের শাস্তি না হওয়ায় দেশী-বিদেশী ঠিকাদাররা ধরে নিয়েছে, নিরাপত্তার মান উপেক্ষা করেও কাজ করা যায় এবং বড় কোনো আইনি ঝামেলায় পড়তে হয় না। 
ড. আদিল মুহাম্মদ খান সরকারি দফতরকেও দায়ী করে বলেন, এসবের জন্য কেবল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নয়, তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি কর্তৃপক্ষও সমানভাবে দায়ী। বিশেষ করে সেতু বিভাগকে এই বড় ব্যর্থতার মূল দায় নিতে হবে। তদারকিতে থাকা সরকারি কর্মকর্তা ও প্রজেক্ট ম্যানেজারদের গাফিলতি চিহ্নিত করা হয় না, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হয় না। মেগা প্রকল্পে আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা-প্রটোকল ও বেষ্টনী নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো কাজ চলতে দেয়া যাবে না। মানুষের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে এই অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার অবিলম্বে অবসান ঘটাতে হবে। 
ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ নয়া দিগন্তকে বলেন, প্রকল্পে নিয়োজিত বিদেশী কোম্পানির শ্রমিক, কাজের সাইট ও পথচারীর নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সেফটি প্রটোকল অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রটোকল অনুযায়ী সাইটে কাজের সময় হেলমেট পরা, সেফটি বেল্ট ব্যবহার এবং রাতে সেফটি ফেন্সিং ও ফিতা টাঙানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব বাস্তবায়নে তদারকির জন্য কনসালট্যান্ট নিয়োজিত আছেন। সেতু বিভাগও নিয়মিত তদারকি করে। 
গত ২৮ অক্টোবরের হাতিরঝিলের ঘটনাটিকে মর্মান্তিক ও দুর্ভাগ্যজনক উল্লেখ করে সচিব বলেন, যেকোনো বড় উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনাই কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য থাকে, কারণ জীবনের ক্ষতি অপূরণীয়। হাতিরঝিলের ঘটনার তদন্ত চলছে। তদন্তে নির্মাণকাজে বা কোম্পানির কোনো গাফিলতি ও দোষ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা, মামলা ও দায়ভার নিশ্চিত করা হবে।
ক্ষতিপূরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে নির্দিষ্ট নীতিমালা এবং বিআরটিএর ব্যবস্থা রয়েছে। আনুষ্ঠানিক কোনো আবেদন পাওয়া গেলে নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। নাগরিকের নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার। সাইটে কোনো ত্রুটি বা গাফিলতি দেখা গেলে অভিযোগ জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

Advertisement