দেশে নতুন রাজনৈতিক ও আইনি বিভাজন তৈরি হয়েছে : মাহমুদুর রহমান
জাতীয় প্রেস ক্লাবে এবি পার্টির মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন মাহমুদুর রহমান : নয়া দিগন্ত।

নিজস্ব প্রতিবেদক

Advertisement

দেশের অভ্যন্তরে বিভাজন চলার সুযোগে সীমান্তের ওপার থেকে ভারতীয় আধিপত্যবাদ দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে বলে মন্তব্য করেছেন দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ ছিল সবাইকে নিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে জুলাই সনদ চূড়ান্ত ও স্বাক্ষর করা; কিন্তু সেই কাজ শেষ না করেই নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়ায় দেশে নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি বিভাজন তৈরি হয়েছে।
গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের আব্দুস সালাম হলে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) আয়োজনে ‘বছর পেরিয়ে জুলাই সনদ : গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ অংশীদারদের সাথে মতবিনিময়’ শীর্ষক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন- আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম এবং দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক ও অন্তবর্তী সরকারের সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুসহ অন্যরা।
মাহমুদুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পলিটিক্যাল ম্যাচিউরিটি (রাজনৈতিক পরিপক্বতা) থাকলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আগে তিনি কখনো নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিতেন না। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রায়োরিটিতে ভুল ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ ছিল প্রথমে সবাইকে নিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে জুলাই সনদ শেষ ও সই করা। 
জুলাই বিপ্লবীদের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকে সবচেয়ে বন্ধুপ্রতিম সরকার হিসেবে অভিহিত করে মাহমুদুর রহমান বলেন, রাজনৈতিক অনভিজ্ঞতার কারণে তরুণরা প্রতিদিন বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে রাজপথে আন্দোলন ও প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ঘেরাও করেছিল। এতে সরকার পরিচালনা দুর্বল ও কঠিন হয়ে পড়ে। বন্ধুপ্রতিম সরকারকে সহযোগিতা না করে প্রতিনিয়ত আন্দোলনে যুক্ত থাকায় তরুণদের নিজস্ব শক্তির অপচয় হয়েছে।
জুলাই সনদ নিয়ে তিনি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের মূল কাজ চূড়ান্ত না করে এবং সর্বসম্মতিক্রমে জুলাই সনদ স্বাক্ষর না করেই ড. ইউনূস নির্বাচনের আশ্বাস দিয়ে আসেন। বিভিন্ন আপত্তি বা ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সংবলিত একটি রূপরেখা দেয়ার ফলে দেশে নতুন করে রাজনৈতিক ও আইনি বিভাজন তৈরি হয়েছে।
জুলাইয়ের ঘটনাকে বিপ্লব হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাইয়ের গণজাগরণকে কেবল একটি আন্দোলন বা অভ্যুত্থান বললে এর প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ পায় না। এটি মূলত জুলাই বিপ্লব। রাজনৈতিক ও আইনি দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, কোনো ঘটনাকে বিপ্লব হিসেবে গ্রহণ করার অর্থ পুরনো শাসনব্যবস্থা ও প্রচলিত সংবিধানের অবসান; কিন্তু সরকার বিপ্লবের এই মৌলিক চেতনা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়ে পুরনো ব্যবস্থার ওপর ভর করে চলছে।’
তিনি আরো বলেন, বিপ্লবের ঐতিহাসিক সাফল্যের পর কে আসল ‘মাস্টারমাইন্ড’ বা কার কতখানি অবদান, তা নিয়ে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে অহেতুক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। অথচ দেশের ভেতরে যখন এই বিভাজন চলছে, তখন সীমান্তের ওপার থেকে ভারতীয় আধিপত্যবাদ বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করছে। তাই অহেতুক প্রতিযোগিতা ভুলে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা জরুরি।
অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি প্রধান দুর্বলতা তুলে ধরে মাহমুদুর রহমান বলেন, প্রথমত, সেনাবাহিনীর সাথে সরকারের সুসম্পর্ক ও সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল। দ্বিতীয়ত, যাদের হাত ধরে সরকার ক্ষমতায় এসেছিল, সেই জেন-জি বা তরুণরাই প্রতিদিন রাজপথে আন্দোলন ও প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ঘেরাও করে সরকারের স্বাভাবিক পরিচালনা কঠিন করে তুলেছিল। তৃতীয়ত, দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপিও সরকারকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করেনি; বরং দ্রুত ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য তারা অধৈর্য হয়ে উঠেছিল।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্যাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তাজুল ইসলাম বলেন, ১৭ বছরে প্রবীণরা ও দেশের রাজনৈতিক দলগুলো মিলে যে স্বৈরাচার শাসকের পতন ঘটাতে পারেনি, তরুণরা এক মহাকাব্যিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে দিল্লি পর্যন্ত তাড়িয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তরুণদের তৈরি করা স্বপ্নের পথরেখা ও জুলাই সনদই তাদের কাছে রেডলাইন। কেউ এই রেডলাইন ভঙ্গ করার চেষ্টা করবেন না।
ব্যারিস্টার তাজুল ইসলাম বলেন, ‘এই বাচ্চারা ফার্মের মুরগি নয়। তারা আবাবিল পাখির মতো প্রতাপশালী স্বৈরশাসককে দিল্লি পর্যন্ত তাড়িয়েছে। যে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আমরা প্রবীণরা এবং বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল মিলে ১৭ বছরে রাস্তার সামনে থেকে দু’টি বালির ট্রাকও সরাতে পারিনি, তরুণরা ২০২৪ সালে এক মহাকাব্যিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাকে তাড়িয়ে বাংলাদেশকে মুক্তি দিয়েছে।’
জুলাই সনদ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দু-একজন নেতার বক্তৃতায় শুনেছি, জুলাই সনদের কথা বললে নাকি তাদের গায়ে আগুন ধরে যায়। কার উসিলায় সিন্নি খেলেন, মোল্লাটাকে চিনলেন না- এমনটা হওয়া উচিত নয়। কারা আপনাদের মুক্ত করল, কারা আপনাদের ক্ষমতায় নিয়ে এলো, তা ভুলে গেলে চলবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘তরুণরা যে স্বপ্নের পথরেখা ও জুলাই সনদ তৈরি করেছে, সেটিই তাদের রেডলাইন। শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই ফসল ঘরে তুলতে হবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ, অফিস-আদালত ও পেশাগত অঙ্গনে সক্রিয় থাকবেন।’
জুলাই সনদের সাংবিধানিক ভিত্তি তুলে ধরে ব্যারিস্টার তাজুল ইসলাম বলেন, আন্দোলনের সময় তরুণরা পোস্টারে লিখেছিল, ‘রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চলছে, সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।’ শহীদ আবু সাঈদের আত্মত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে তরুণরা রাষ্ট্র পরিচালনার যে মানচিত্র এঁকেছে, তা অস্বীকার করা অজ্ঞতার নামান্তর। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদকে প্রচলিত আইন বা সংবিধানের সাধারণ মাপকাঠিতে বিচার করা যাবে না। এটি জনগণের অর্জিত সর্বোচ্চ আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। আগামী সংবিধানও এই সনদের ভিত্তিতে রচিত হতে হবে।’
আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য নতুন করে সনদ তৈরি করতে হবে। সেই সনদে চার কোটি মানুষের স্বাক্ষর গ্রহণের উদ্যোগ নিতে হবে। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জনগণকেই প্রকৃত অংশীজন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞতার জন্য ড. ইউনূস সরকারকে উপহাস করে এনজিওগ্রাম সরকার বলা হতো মন্তব্য করে তিনি বলেন, অব্যবস্থাপনা ও অযোগ্যতার জন্য বর্তমান সরকারকে অনেকে ‘লন্ডনী-গো’ সরকার বলছে।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, মাহমুদুর রহমান অনেক আগেই বলেছিলেন, ফ্যাসিবাদ রুখতে হলে গণ-অভ্যুত্থান প্রয়োজন, পাশাপাশি প্রয়োজন সাংস্কৃতিক বিপ্লব। সৈনিকদের এক যুদ্ধের পর আরেক যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে হয়। আমাদেরও সেই প্রস্তুতি নিতে হবে। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েও সব সমস্যার সমাধান হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচনেও সঙ্কটের সমাধান হয়নি; বরং সঙ্কট আরো ঘনীভূত হচ্ছে। সীমান্তের ওপার থেকে ফ্যাসিবাদী শক্তি উল্লসিত হচ্ছে।
সভায় এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান স্বাগত বক্তব্য দেন। সভাটি সঞ্চালনা করেন এবি যুব পার্টির সদস্যসচিব হাদীউজ্জামান খোকন। এ ছাড়া জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেয়া বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি, জুলাইযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা বক্তব্য দেন।