
বিশেষ সংবাদদাতা
দেশে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কৃষি উৎপাদনে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সদ্য প্রকাশিত এপ্রিল-জুন ২০২৬ প্রান্তিকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, আগের অর্থবছরের তুলনায় আমন ধান, ভুট্টা, সয়াবিন, পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, আলু ও কয়েকটি ফলের উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। কোনো কোনো ফসলের আবাদি জমি কমলেও উৎপাদন বেড়েছে। আবার আলু, গম ও কয়েকটি সবজির উৎপাদন কমেছে।
একই সাথে কৃষিশ্রমিকের মজুরিতে মাসভিত্তিক ওঠানামা এবং নারী-পুরুষের মজুরির বড় ব্যবধানও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। বিশেষ করে মে মাসে কৃষিশ্রমিকের মজুরি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পর জুনে তা কমেছে।
বিবিএসের কৃষি উইং প্রকাশিত ‘কোয়ার্টারলি রিপোর্ট অন ক্রপ স্ট্যাটিসটিকস অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচারাল লেবার ওয়েজ (এপ্রিল-জুন ২০২৬)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
আমন ও ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে আমন ধানের উৎপাদন ছিল এক কোটি ৬৫ লাখ ১৪ হাজার ৪৫০ মেট্রিকটন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৭৩ লাখ ৫৮ হাজার ৯৮০ মেট্রিকটনে; অর্থাৎ এক বছরে আমনের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ১১ শতাংশ। এ সময়ে আমন আবাদি জমির পরিমাণও এক কোটি ৩৮ লাখ ৬৭ হাজার ৩৪২ একর থেকে বেড়ে এক কোটি ৪১ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৪ একর হয়েছে।
ভুট্টার উৎপাদনেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শীতকালীন ভুট্টার উৎপাদন ছিল ৪৮ লাখ ৭২ হাজার ৯৩৯ মেট্রিকটন। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ৫০ লাখ ৪৮ হাজার ৩৪৭ মেট্রিকটনে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আবাদি জমির পরিমাণও ১১ লাখ ১৮ হাজার ৬৪৮ একর থেকে বেড়ে ১১ লাখ ৫৩ হাজার ৪২৯ একর হয়েছে।
অন্য দিকে গমের উৎপাদন কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ১০ লাখ ৪১ হাজার ৯৭ মেট্রিকটন গম উৎপাদিত হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১০ লাখ ২৮ হাজার ৭৮১ মেট্রিকটনে দাঁড়িয়েছে; অর্থাৎ উৎপাদন কমেছে প্রায় ১ দশমিক ১৮ শতাংশ। গমের আবাদি জমিও কমেছে।
সয়াবিন, পেঁয়াজ ও রসুনে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি
তেলবীজের মধ্যে সয়াবিন উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আগের অর্থবছরে সয়াবিন উৎপাদন ছিল এক লাখ আট হাজার ৪৮১ মেট্রিকটন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে এক লাখ ৩৬ হাজার ১৮৩ মেট্রিকটনে দাঁড়িয়েছে। এক বছরে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ। সয়াবিনের আবাদি জমিও এক লাখ ৪২ হাজার ৭৮০ একর থেকে বেড়ে এক লাখ ৭১ হাজার ১০১ একর হয়েছে।
পেঁয়াজ উৎপাদনেও বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছিল ৩২ লাখ ২১ হাজার ৪৩১ মেট্রিকটন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৮ লাখ ১৯ হাজার ৫৩০ মেট্রিকটনে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ১৮ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে পেঁয়াজের আবাদি জমি পাঁচ লাখ ৩৫ হাজার ৫৯৯ একর থেকে বেড়ে পাঁচ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮৭ একর হয়েছে।
রসুনের উৎপাদনও বেড়েছে। আগের অর্থবছরের পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার ৬৮২ মেট্রিকটন থেকে তা বেড়ে ছয় লাখ পাঁচ হাজার ৪৪৬ মেট্রিকটনে দাঁড়িয়েছে। শীতকালীন মরিচের উৎপাদন পাঁচ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৭ মেট্রিকটন থেকে বেড়ে ছয় লাখ ১৬ হাজার ৩৪০ মেট্রিকটন হয়েছে।
কৃষি উৎপাদনে এসব প্রবৃদ্ধি দেশের খাদ্য ও কৃষিপণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতির জন্য ইতিবাচক। বিশেষ করে পেঁয়াজ, রসুন ও সয়াবিনের উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে আমদানিনির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে উৎপাদন বাড়লেই বাজারে দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। সংরক্ষণব্যবস্থা, বাজারজাতকরণ, আমদানি নীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব নির্ভর করবে।
আলু ও কয়েকটি সবজির উৎপাদন কমেছে
প্রতিবেদনে আলুর উৎপাদনে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে আলু উৎপাদন হয়েছিল এক কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার ৬১৫ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে এক কোটি ১২ লাখ ৭২ হাজার ১৪ মেট্রিকটনে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন কমেছে প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ। এ সময়ে আলুর আবাদি জমির পরিমাণও ১২ লাখ ২২ হাজার ৯২৮ একর থেকে কমে ১১ লাখ ৪৯ হাজার ৪৯ একর হয়েছে।
অন্য দিকে বেগুনের উৎপাদন চার লাখ ৯৬ হাজার ৯১৮ মেট্রিকটন থেকে বেড়ে পাঁচ লাখ ৬৬ হাজার ৭৫২ মেট্রিকটন হয়েছে। টমেটোর উৎপাদন পাঁচ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৩ মেট্রিকটন থেকে বেড়ে পাঁচ লাখ ৬৫ হাজার ১৮ মেট্রিকটনে দাঁড়িয়েছে। শিমের উৎপাদনও দুই লাখ ৩৩ হাজার ৯০৬ মেট্রিকটন থেকে বেড়ে দুই লাখ ৪৯ হাজার ৬৮১ মেট্রিকটন হয়েছে।
ফল উৎপাদনেও কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। পাকা কলার উৎপাদন আট লাখ ৬২ হাজার ৬৯২ মেট্রিকটন থেকে বেড়ে ৯ লাখ ৮৬ হাজার ৭১৭ মেট্রিকটন হয়েছে। তরমুজের উৎপাদন ১৯ লাখ ৮১ হাজার ২৩১ মেট্রিকটন থেকে বেড়ে ২০ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬৬ মেট্রিকটনে দাঁড়িয়েছে। পেঁপে ও লিচুর উৎপাদনও বেড়েছে।
তবে এসব পরিসংখ্যানের পাশাপাশি ফসলভিত্তিক উৎপাদনশীলতা, উৎপাদন ব্যয় ও কৃষকের প্রকৃত মুনাফার বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
মে মাসে কৃষিশ্রমিকের মজুরি সর্বোচ্চ
বিবিএসের প্রতিবেদনে কৃষিশ্রমিকের মজুরির মাসভিত্তিক তথ্যও প্রকাশ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০২৬ সালের মার্চে খাদ্য ছাড়া একজন পুরুষ কৃষিশ্রমিকের দৈনিক গড় মজুরি ছিল ৬২৮ টাকা। এপ্রিলে তা বেড়ে ৬৮৬ টাকা এবং মে মাসে ৭২০ টাকায় উন্নীত হয়। তবে জুনে তা কমে ৬৪৮ টাকায় দাঁড়ায়।
নারী কৃষিশ্রমিকের ক্ষেত্রে একই সময়ে খাদ্য ছাড়া দৈনিক গড় মজুরি ছিল মার্চে ৪৬১ টাকা, এপ্রিলে ৪৯৩ টাকা, মে মাসে ৫১০ টাকা এবং জুনে ৪৭৮ টাকা; অর্থাৎ জুনে পুরুষ কৃষিশ্রমিকের দৈনিক মজুরি মে মাসের তুলনায় ৭২ টাকা বা ১০ শতাংশ কমেছে। নারীদের ক্ষেত্রে কমেছে ৩২ টাকা বা প্রায় ৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুন মাসে খাদ্য ছাড়া পুরুষ কৃষিশ্রমিকের দৈনিক গড় মজুরি ছিল ৬৪৮ টাকা, আর নারীশ্রমিকের ক্ষেত্রে ৪৭৮ টাকা। দুই শ্রেণীর শ্রমিকের মজুরির ব্যবধান ১৭০ টাকা। শতাংশের হিসাবে পুরুষ শ্রমিকের মজুরি নারীদের তুলনায় প্রায় ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি।
খাবারসহ মজুরিতেও নারী-পুরুষের ব্যবধান
খাবারসহ মজুরির ক্ষেত্রেও নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। জুন মাসে এক বেলা খাবারসহ পুরুষ শ্রমিকের মজুরি ছিল ৬২২ টাকা এবং নারী শ্রমিকের ৪৩৭ টাকা। দুই বেলা খাবারসহ এ হার ছিল যথাক্রমে ৬৩৯ ও ৪৬০ টাকা। তিন বেলা খাবারসহ পুরুষ শ্রমিকের মজুরি ৬৬৪ টাকা এবং নারী শ্রমিকের ৫১৫ টাকা; অর্থাৎ খাবারের সুবিধা যুক্ত হলেও নারী শ্রমিকদের মজুরি পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
এ পরিস্থিতি কৃষিতে নারীর শ্রমের স্বীকৃতি, সমমজুরি এবং কর্মপরিবেশের প্রশ্নকে সামনে এনেছে। কৃষি উৎপাদনে নারীর অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও মজুরির এই ব্যবধান তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান ও শ্রমের মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
কৃষি অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ খাত
বিবিএসের প্রতিবেদনের ভূমিকা অংশে বলা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ছিল প্রায় ১০ দশমিক ৯৪ শতাংশ। একই সময়ে কর্মসংস্থানে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৪৪ দশমিক ৬৮ শতাংশ কৃষিসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪-এর তথ্যের ভিত্তিতে এ হিসাব দেয়া হয়েছে।
কৃষি খাতের গুরুত্ব বিবেচনায় বিবিএস প্রধান ছয়টি ও অপ্রধান ১৪০টি ফসলের উৎপাদন ও আবাদি জমির পরিসংখ্যান নিয়মিত সংগ্রহ করে। প্রধান ছয়টি ফসল হলো আউশ, আমন, বোরো, গম, আলু ও পাট। এসব ফসলের উৎপাদন নিরূপণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ১০ হাজার ৩৪৮টি নমুনা ক্লাস্টার ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি ক্লাস্টারের গড় আয়তন প্রায় পাঁচ একর।
প্রধান ফসলগুলোর ক্ষেত্রে সরাসরি পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপভিত্তিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। অন্য ফসলের ক্ষেত্রে কৃষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকারভিত্তিক তথ্যের ওপর নির্ভর করা হয়।
কৃষিশ্রমিকের মজুরি নির্ধারণে প্রতিটি উপজেলা থেকে নমুনাভিত্তিতে ১০ জন কৃষিশ্রমিকের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। শ্রমিক পাওয়া না গেলে কৃষিশ্রমিক নিয়োগ করেছেন এমন কৃষকের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মজুরি আলাদাভাবে হিসাব করা হয়।
উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল নিশ্চিত করতে হবে কৃষকের জন্য
কৃষি উৎপাদনের সামগ্রিক চিত্রে ইতিবাচক প্রবণতা থাকলেও আলুর মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের উৎপাদন হ্রাস এবং কৃষিশ্রমিকের মজুরির ওঠানামা নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দিচ্ছে। বিশেষ করে উৎপাদন বাড়ার সুফল কৃষক কতটা পাচ্ছেন, উৎপাদন ব্যয় ও বাজারদরের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না এবং কৃষিশ্রমিকের মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ- এসব প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি নারী কৃষিশ্রমিকের মজুরিবৈষম্য দূর করা, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ প্রয়োজন।
কৃষি খাতের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষকের ন্যায্যমূল্য, শ্রমিকের উপযুক্ত মজুরি এবং ভোক্তার সাশ্রয়ী দামে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা গেলে কৃষির প্রবৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








