ছদ্মনামে পলিসি খোলা পুরোপুরি নিষিদ্ধ

সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

Advertisement

বীমা পলিসি কিনে কালো টাকা সাদা করার দিন শেষ! বেনামে বা ছদ্মনামে পলিসি খোলা পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। পাঁচ বছর বা তার কম মেয়াদি পলিসিকে ধরা হবে উচ্চ ঝুঁঁকির।  প্রতিটি বীমা কোম্পানিকে গ্রাহক যাচাই, লেনদেন পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন দাখিলে কঠোর হতে বলা হয়েছে।
শুধু তাই নয়,  বীমা পলিসি কিনতে গেলে এখন থেকে গ্রাহকের পরিচয়, পেশা ও টাকার উৎস আরও খুঁটিয়ে দেখবে কোম্পানি। পরিচয় যাচাই করা না গেলে পলিসিই ইস্যু করা যাবে না। প্রধান কার্যালয় থেকে শাখা ও এজেন্সি পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিয়েছে বিএফআইইউ। প্রতিটি বীমা কোম্পানিকে গঠন করতে হবে কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিট, যার প্রধানের পদ ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীর পরবর্তী দুই ধাপের নিচে হতে পারবে না। নির্দেশনা না মানলে ঝুঁঁকিতে পড়বে কোম্পানির পরিপালন অবস্থান। 
দেশের বীমাখাতের ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিস্তারিত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ১৯ সেপ্টেম্বর অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কার্যালয় পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বীমা খাতে অনিয়ম ও  দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে। ‘অনিয়ন্ত্রণ, বিশৃঙ্খলা ও দুর্নীতি এত গভীরে এটা কঠিন কাজ। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থে কঠিন কাজটিই করতে হবে।’
এরপরই অর্থমন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে দেশের বীমাখাতের অনিয়ম রোধে ব্যবস্থা নেয়ার বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশনা দেয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছেন। 
বিএফআইইউর নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিটি কোম্পানির নিজস্ব মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কার্যে অর্থায়ন প্রতিরোধ নীতিমালা থাকতে হবে। তা অনুমোদন করবে পরিচালনা পর্ষদ বা সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী কমিটি। ঝুঁঁকি ও বাস্তবতার নিরিখে নীতিমালা নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে প্রতি বছর কর্মকর্তা, কর্মচারী ও এজেন্টদের উদ্দেশে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে স্পষ্ট অঙ্গীকার ঘোষণা করতে হবে।
প্রধান কার্যালয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় পরিপালন ইউনিটের প্রধান হবেন একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, যিনি প্রধান মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তা (সিএএমএলসিও) নামে পরিচিত হবেন। তার পদ ব্যবস্থাপনা পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীর পরবর্তী দুই ধাপের নিচে হতে পারবে না। তাকে অন্য কোনো দায়িত্ব দিতে হলে আগে নিশ্চিত করতে হবে, এতে যেন মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রম ব্যাহত না হয়। সিএএমএলসিও বদল হলে বিএফআইইউর পোর্টালে অবিলম্বে তা জানাতে হবে। ইউনিটে অন্তত একজন অবলিখনের অভিজ্ঞ সদস্য রাখা বাধ্যতামূলক।
শাখা, এজেন্সি ও ইউনিট পর্যায়েও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা থাকবেন। শাখা বা ইউনিটের জন্য ন্যূনতম তিন বছরের অভিজ্ঞ ঊর্ধŸতন কর্মকর্তা মনোনীত করতে হবে। এজেন্টের ক্ষেত্রেও একজন ঊর্ধŸতন কর্মকর্তা দায়িত্ব পাবেন। তারা ছয় মাস পরপর সভা করে কার্যবিবরণী কেন্দ্রীয় ইউনিটে পাঠাবেন।
গ্রাহক যাচাই ও ঝুঁঁকি নির্ধারণ
সার্কুলারে স্পষ্ট বলা হয়েছে, বেনামে বা ছদ্মনামে কোনো পলিসি খোলা বা পরিচালনা করা যাবে না। জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের তালিকাভুক্ত বা বাংলাদেশ সরকারের নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো ব্যক্তি বা সত্তার নামেও পলিসি দেয়া যাবে না। এখানে ‘গ্রাহক’ বলতে শুধু পলিসিধারী নন, পলিসির প্রকৃত সুবিধাভোগী এবং এজেন্ট, ব্রোকার, আইনজীবী ও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের মতো মধ্যস্থতাকারীকেও বোঝানো হয়েছে।
গ্রাহক পরিচিতি (কেওয়াইসি) সংগ্রহে অভিন্ন ফরম নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যক্তি ও অব্যক্তিক সম্পদের পলিসির জন্য এবং লাইফ ও নন-লাইফ বীমার জন্য আলাদা ফরম রয়েছে। পরিচয় যাচাইয়ে ৩০ মার্চ ২০২৬ তারিখের সার্কুলার-২৯-এ বর্ণিত ইলেকট্রনিক কেওয়াইসি (ই-কেওয়াইসি) নির্দেশনার প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে।
নির্দেশনার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ ঝুঁঁকি শ্রেণীবিন্যাস। পাঁচ বছর বা তার কম মেয়াদি বীমা পলিসিকে উচ্চ ঝুঁঁকিসম্পন্ন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। উচ্চ ঝুঁঁকির গ্রাহকের কেওয়াইসি তথ্য প্রতি বছর এবং নিম্ন ঝুঁঁকির গ্রাহকের তথ্য প্রতি পাঁচ বছর অন্তর হালনাগাদ করতে হবে। এর বাইরে গ্রাহকের তথ্যে পরিবর্তন জানা মাত্র তা হালনাগাদ করতে হবে।
গ্রাহকের পরিচয় যাচাই করা না গেলে বা তথ্য নির্ভরযোগ্য না হলে কোম্পানি পলিসি ইস্যু করতে পারবে না। বিদ্যমান পলিসি বন্ধ করতে হলে সিএএমএলসিওর অনুমোদন নিয়ে কারণ ব্যাখ্যা করে গ্রাহককে নোটিশ দিতে হবে। প্রয়োজনে সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদনও দাখিল করতে হবে।
প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জারি করা সার্কুলারে বলা হয়েছে, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি (পিইপি), দেশের প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধান বা উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তার ক্ষেত্রে অধিকতর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা (ইডিডি) নিতে হবে। তাদের পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। এ ধরনের গ্রাহকের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন বা চালু রাখতে সিএএমএলসিওর অনুমোদন লাগবে। যেসব দেশে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধের আন্তর্জাতিক মান পূরণ হয়নি, সেখানকার ব্যক্তি বা সত্তার সাথে লেনদেনেও ইডিডি নিতে হবে।
নগদ ও সন্দেহজনক লেনদেন
কোনো গ্রাহকের সাথে ব্যাংকিং বা মোবাইল আর্থিক সেবা ব্যবহার না করে একদিনে ১০ লাখ টাকা বা তার বেশি নগদ লেনদেন হলে বিএফআইইউকে নগদ লেনদেন প্রতিবেদন (সিটিআর) দিতে হবে। তা পরবর্তী মাসের সাত কর্মদিবসের মধ্যে গোএএমএল ওয়েব বা নির্ধারিত ফরমে জমা দিতে হবে। তথ্য অন্তত পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে।
এ ছাড়াও কোনো কর্মকর্তা সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করলে তা লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ পরিপালন কর্মকর্তাকে জানাতে হবে। তিনি বিশ্লেষণ করে কেন্দ্রীয় ইউনিটে পাঠাবেন, আর সেখান থেকে বিএফআইইউতে সন্দেহজনক লেনদেন প্রতিবেদন (এসটিআর) যাবে। গ্রাহকের পরিচিতি যাচাই করতে গিয়ে তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে যাচাই না করেই প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ
বলা হয়েছে, জাতিসঙ্ঘের তালিকাভুক্ত বা সরকার নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো ব্যক্তি বা সত্তার নামে, কিংবা তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন কারও নামে পলিসি শনাক্ত হলে তা স্থগিত করতে হবে। পরবর্তী কর্মদিবসের মধ্যে বিস্তারিত তথ্য বিএফআইইউকে জানাতে হবে। পরে ভুল শনাক্তকরণ প্রমাণিত হলে সে তথ্যও সংরক্ষণ করতে হবে।
স্বনির্ধারণ, প্রশিক্ষণ ও নথি সংরক্ষণ
প্রতিটি শাখা, এজেন্সি বা ইউনিটকে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর চক্রে নির্ধারিত চেকলিস্টে নিজেদের মূল্যায়ন করতে হবে। এ প্রতিবেদন ৩১ জানুয়ারির মধ্যে কেন্দ্রীয় ইউনিট ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগে পাঠাতে হবে। কেন্দ্রীয় ইউনিট বছরের কার্যক্রমের বার্ষিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিএফআইইউকে দেবে।
নির্দেশনা বলা হয়েছে, নতুন নিয়োগের আগে কর্মকর্তা, কর্মচারী, এজেন্ট ও অফশোর মধ্যস্থতাকারীদের যাচাই-বাছাই করতে হবে। কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। গ্রাহকদের সচেতন করতে শাখায় দৃশ্যমান স্থানে পোস্টার বা ব্যানার টাঙাতে হবে। পলিসি সংক্রান্ত সব নথি, কেওয়াইসি তথ্য ও প্রশিক্ষণের রেকর্ড পলিসি বন্ধ বা দাবি পরিশোধের পর অন্তত পাঁচ বছর সংরক্ষণ করতে হবে।