প্রসিকিউটরের মন্তব্য কেন্দ্র করে উত্তপ্ত ট্রাইব্যুনাল
  •  জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  •  মানবতাবিরোধী অপরাধ

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক সেনাকর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার সময় প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীমের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। জেরার একপর্যায়ে তিনি ট্রাইব্যুনালকে উদ্দেশ করে রোল ৫৩ প্রয়োগের কথা বলেন। জবাবে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আমার মনে হয়, রোল ৫৩ অ্যাপলাই করার সময় এখনো আসেনি।’  আসামি পক্ষ কিভাবে জেরা করবেন তা এই রোলে বলা আছে। 
গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো: রফিকুল ইসলামকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী মো: সাহিদুর রহমান। এ সময় জিয়াউল আহসানের আরেক আইনজীবী নাজনীন নাহারের বক্তব্যকে  কেন্দ্র করে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের মধ্যে একাধিকবার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম ট্রাইব্যুনালকে ‘সালিশের চেয়েও নিচে নেমে গেছে’ বলেও মন্তব্য করেন। এ দিন প্রসিকিউটর টিমে আরো ছিলেন মো: মিজানুল ইসলাম, শাইখ মাহদী, মো: মামুনুর রশীদ, আবদুস সাত্তার, এস এম তাসমিরুল ইসলাম। 
সোমবারের জেরায় ভারতে পলাতক শেখ হাসিনার শাসনামলে অপরাধীদের দায়মুক্তি, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নির্দেশনা, র‌্যাবের বিভিন্ন উইংয়ের কার্যক্রম এবং জিয়াউল আহসানের সাথে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিকীর যোগাযোগের বিষয়টি উঠে আসে। জেরার শুরুতে তদন্ত কর্মকর্তা স্বীকার করেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে তিনি পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন। ওই সময়ে অপরাধীদের দায়মুক্তি দেয়ার বিষয়ে কোনো আইন বা প্রজ্ঞাপন প্রণীত হয়নি। তার ভাষায়, দায়মুক্তি ছিল অলিখিত।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতা, জবাবদিহিতার অভাব এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে সরকারের অনুকূলে সিদ্ধান্ত দেয়ার সংস্কৃতি চালু ছিল। তার তদন্তে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ, অনুমোদন ও অবগতিতে জিয়াউল আহসানসহ এক শ্রেণীর কর্মকর্তার পরিকল্পনা, অংশগ্রহণ, নির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে গুম, অপহরণ, নির্যাতন এবং হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। এসব অপরাধের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন জিয়াউল আহসান।
তবে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বিচারকদের নির্দেশনা দেয়া হতো, এমন কোনো সাক্ষ্য বা ডিজিটাল এভিডেন্স তার কাছে নেই বলে স্বীকার করেন তদন্ত কর্মকর্তা। এ বিষয়ে কোনো বিচারকের সাথে কথাও বলেননি তিনি। মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করেই এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন বলে জানান। একইভাবে জিয়াউল আহসানকে গুম, খুন, অপহরণ ও আটকের বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল, এমন কোনো লিখিত দলিল বা ডিজিটাল সাক্ষ্যও তার কাছে নেই। তবে সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া ও জিয়াউল আহসানের সহকর্মী ইমরুল কায়েসের সাক্ষ্য তার বক্তব্যের পক্ষে রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে তৎকালীন সেনাপ্রধান কিংবা র‌্যাব সদর দফতরে গোপনে কোনো লিখিত অভিযোগ করা হয়েছিল কি না, জানতে চান আসামি পক্ষের আইনজীবী। জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, তার তদন্তে এমন কোনো অভিযোগের তথ্য আসেনি। তবে ওই সময়ে এ ধরনের অভিযোগ করার মতো পরিস্থিতি ছিল না।
জেরায় র‌্যাবের বিভিন্ন উইংয়ের কার্যক্রম সম্পর্কেও তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জানতে চান সাহিদুর রহমান। তদন্ত কর্মকর্তা জানান, র‌্যাবের অর্গানোগ্রাম রয়েছে। তবে তার তদন্তকালীন সময়ে ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের পরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) এবং পরিচালক (অপারেশনস) কে ছিলেন তা তার স্মরণ নেই। র‌্যাব সদর দফতরে পরিচালকের (অপারেশনস) দফতরে গেলেও তার নাম-ঠিকানা তদন্ত ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করেননি।
র‌্যাবের অপারেশন উইং কী কাজ করে, সে বিষয়ে তিনি তদন্ত করেননি বলেও জানান। তবে অপারেশন ও ইন্টেলিজেন্স উইং একসাথে অভিযান পরিচালনা করে বলে জানান তিনি। মামলায় বর্ণিত অভিযানগুলোতে এই দুই উইংয়ের কোন কোন সদস্য অংশ নিয়েছিলেন, তাদের নাম বলতে পারেননি। র‌্যাব-১, র‌্যাব-৩ ও র‌্যাব-৮-এ ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের কোন কোন সদস্য সংযুক্ত ছিলেন, সে তথ্যও তার জানা নেই।
জেরার গুরুত্বপূর্ণ অংশজুড়ে ছিল জিয়াউল আহসানের সাথে তারেক আহমেদ সিদ্দিকীর যোগাযোগের বিষয়টি। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, জিয়াউল আহসান তারেক সিদ্দিকীর সাথে যোগাযোগ করতেন, এমন তথ্য তিনি বিভিন্ন সূত্র থেকে পেয়েছেন এবং তা তদন্ত ডায়েরিতে নোট করেছেন।
এ সময় আইনজীবী সাহিদুর রহমান জানতে চান, কোন তারিখে ওই তথ্য ডায়েরিতে লেখা হয়েছিল। নোট দেখানোর অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে ট্রাইব্যুনাল নিজেই তা দেখুক। কারণ, এই প্রশ্নের উত্তরের ওপর তাদের আরো প্রশ্ন রয়েছে। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে নোট দেখানোর বিষয়ে আপত্তি জানানো হয়।
এ পর্যায়ে নাজনীন নাহার বলেন, এটি একটি মিথ্যা মামলা। তদন্ত কর্মকর্তা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে ‘স্মরণ নেই’ ও ‘মনে নেই’ বলছেন। এতে প্রসিকিউশন পক্ষ আপত্তি জানালে ক্ষুব্ধ হয়ে সাহিদুর রহমান জেরা বন্ধ করে চুপ করে বসে থাকেন। তখন নাজনীন নাহার ট্রাইব্যুনালকে বলেন, জেরা ক্লোজ হবে না।
ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে জিয়াউল আহসানও বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা কোনো তথ্য ডায়েরিতে লিখে থাকলে তার তারিখ উল্লেখ থাকার কথা। তিনি সেই তারিখ জানতে চাচ্ছেন। এ সময় নাজনীন নাহার বলেন, ‘আমি জানি, এই আদালতে কী হবে।’ এরপরই প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম রোল ৫৩ প্রয়োগের কথা বলেন। জবাবে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘আমার মনে হয়, রোল ৫৩ অ্যাপলাই করার সময় এখনো আসেনি।’
এ দিকে জেরা চলাকালে আদালতকক্ষের পরিবেশ নিয়েও উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। নাজনীন নাহারের সাথে বাক্যবিনিময়ের একপর্যায়ে উঠে দাঁড়িয়ে প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার বলেন, ‘আপনার অনেক কথা সহ্য করছি। আপনি যা খুশি তাই বলছেন।’ নাজনীন নাহার তখন প্রশ্ন করেন, তিনি আঙুল উঁচিয়ে কথা বলছেন কেন।
এরপরই প্রসিকিউটর বলেন, ‘এটা (ট্রাইব্যুনাল) সালিশ হয়ে গেছে। এটা সালিশের চেয়েও নিচে নেমে গেছে।’ ট্রাইব্যুনাল তাকে বলেন, ‘আপনি কি চান আইনগত ব্যবস্থা নিই?’ জবাবে প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমি চাই কোর্টের পরিবেশ ফিরে আসুক।’
পরে এ বিষয়ে গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম বলেন, একজন ডিফেন্স কাউন্সিল রাগ করে জেরা করবেন না বলছিলেন। আরেকজন তাকে অনুরোধ করছিলেন। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল এজলাসে বসে ছিলেন, আসামি কথা বলছিলেন এবং আইনজীবীরাও কথা বলছিলেন। তার অভিযোগ, ট্রাইব্যুনাল আদালতের শৃঙ্খলা ও ডেকোরাম রক্ষা করতে পারছিলেন না।
ট্রাইব্যুনালের শেষ পর্যায়ে আইনজীবী নাজনীনকে উদ্দেশ্য করে বিচারক বলেন, নাজনীন কিন্তু আজ খুব পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

Advertisement