বাংলাদেশের রফতানি আয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ, তৈরি পোশাক রফতানি, জুলাই-অক্টোবর রফতানি, অক্টোবরের রেমিট্যান্স, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার, ডলারের বিনিময় হার, জ্বালানি আমদানি ব্যয়
বাংলাদেশ ব্যাংক। সংগৃহীত

দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) পণ্য রফতানি আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ শতাংশ বেড়ে ১৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এ প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি তৈরী পোশাক খাত।

Advertisement

অন্য দিকে প্রবাসী আয়ের প্রবাহে প্রবৃদ্ধি থাকলেও টানা পাঁচ মাস ধরে মাসিক রেমিট্যান্স তিন বিলিয়ন ডলারের নিচে রয়েছে। এতে বাড়তি আমদানি ব্যয়ের বিপরীতে বৈদেশিক মুদ্রার জোগান নিয়ে নতুন করে চাপ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির অর্থ পরিশোধের চাহিদা বাড়ায় ডলারের বাজারেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-অক্টোবর সময়ে দেশের মোট পণ্য রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ১৭ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই সময়ে এ আয় ছিল এর চেয়ে প্রায় ৬ শতাংশ কম। রফতানি আয়ের বড় অংশ এসেছে তৈরী পোশাক খাত থেকে। এ সময়ে নিটওয়্যার রফতানি ৭ শতাংশ বেড়ে ৭ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার এবং ওভেন পোশাক রফতানি ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৬ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

দুই খাত মিলিয়ে রফতানি আয় হয়েছে ১৩ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার, যা দেশের মোট পণ্য রফতানির প্রায় ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ। সামগ্রিক রফতানি প্রবৃদ্ধিতে এ দুই খাতের অবদান প্রায় ৮১ শতাংশ। অর্থাৎ রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলেও তা এখনো মূলত তৈরী পোশাকশিল্পনির্ভর।

পোশাকের বাইরে কয়েকটি খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। পাট ও পাটজাত পণ্যের রফতানি ২৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৩৮৩ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক ৭ শতাংশ; আয় দাঁড়িয়েছে ৪৬৪ মিলিয়ন ডলার। রাসায়নিক পণ্যের রফতানি বেড়েছে ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ, যার পরিমাণ ১৫৭ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া হোম টেক্সটাইল ও জুতা রফতানি যথাক্রমে ৭ দশমিক ৪ ও ৯ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে।

তবে সব খাতের চিত্র ইতিবাচক নয়। কৃষিপণ্য রফতানি ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ, হিমায়িত ও জীবন্ত মাছ ১০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং তুলা ও তুলাজাত পণ্যের রফতানি ১০ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে। ফলে রফতানি বহুমুখীকরণে অগ্রগতি থাকলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের দুর্বলতা স্পষ্ট।

অন্য দিকে রেমিট্যান্সের প্রবাহেও প্রবৃদ্ধি রয়েছে, তবে প্রত্যাশিত মাত্রায় বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসে প্রবাসীরা দেশে পাঠিয়েছেন ২ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের একই মাসের তুলনায় এটি ১২ দশমিক ১ শতাংশ বেশি। কিন্তু চলতি বছরের জুন থেকে টানা পাঁচ মাস মাসিক রেমিট্যান্স ৩ বিলিয়ন ডলারের নিচে রয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-৩১ অক্টোবর) দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১১ দশমিক ৪৬৫ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১০ দশমিক ১৪৯ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এ সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ৩১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১৩ শতাংশ।

রেমিট্যান্সের প্রবাহে প্রত্যাশিত গতি না থাকার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবের কথা বলছেন সংশ্লিষ্ট খাতের ব্যক্তিরা। তাদের মতে, এ সঙ্ঘাতের কারণে প্রবাসীদের কর্মসংস্থান, আয় ও দেশে অর্থ পাঠানোর সক্ষমতা প্রভাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের বড় একটি অংশ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর হওয়ায় এ অঞ্চলের অস্থিরতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও প্রভাব ফেলতে পারে।

এ দিকে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ডলারের চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানির অর্থ পরিশোধে বাড়তি বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের দরও বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল আন্তঃব্যাংক বাজারে ডলারের ভারিত গড় বিনিময় হার দাঁড়িয়েছে ১২৪ টাকা ৩০ পয়সা। আগের দিন এ হার ছিল ১২৩ টাকা ৯৯ পয়সা।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকারদের দৃষ্টিতে, রফতানি ও রেমিট্যান্স- দুই প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎসে প্রবৃদ্ধি থাকাটা স্বস্তির বিষয়। তবে আমদানি ব্যয়, বিশেষ করে জ্বালানি আমদানির চাপ বাড়লে এ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে।

সামগ্রিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে, রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সঙ্কেত দিলেও এর বড় অংশ তৈরী পোশাক খাতের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়লেও টানা পাঁচ মাস ৩ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করতে না পারা এবং আমদানি ব্যয়ের চাপ বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য নিয়ে সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। এ অবস্থায় রফতানি বহুমুখীকরণ, নতুন শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, প্রবাসী আয় পাঠানোর আনুষ্ঠানিক চ্যানেল আকর্ষণীয় করা এবং জ্বালানি আমদানির ব্যয় ব্যবস্থাপনা- সব কটিই বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।