মোবাইলে কল ড্রপে গ্রাহক ভোগান্তি চরমে

মনিরুল ইসলাম রোহান

Advertisement

মোবাইল ফোনের কল ড্রপ বা হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া কিংবা কথা বলতে বলতে হঠাৎ অপর প্রান্তের কথা শুনতে না পাওয়ার সমস্যা গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের। ইন্টারনেট ব্যবহার করে ভিডিও কল, অনলাইন মিটিং কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কাজের সময় দেখা দিচ্ছে সংযোগের সমস্যা। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের নি¤œমানের এমন সেবার অভিজ্ঞতায় চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন গ্রাহকরা। অথচ প্রতিনিয়ত মোবাইল সেবার জন্য অর্থ ব্যয় করেও প্রত্যাশিত মান পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ অনেকের। এদিকে কল ড্রপে আর্থিক ক্ষতিপূরণের নিয়ম থাকলেও সেটার বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত পাঁচ বছরে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির কাছে মোবাইল অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে কল ড্রপ সংক্রান্ত ৬৬ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে, যার মধ্যে কেবল সর্বশেষ অর্থবছরেই ১১ হাজারের বেশি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। 
৫ বছরে ৬৬ হাজারের বেশি অভিযোগ
মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবার মান নিয়ে বিটিআরসিতে গ্রাহকদের অভিযোগের বড় অংশই নেটওয়ার্কের দুর্বলতা, কলড্রপ ও ইন্টারনেটের ধীরগতিসংক্রান্ত। গত সাড়ে পাঁচ বছরে গ্রামীণ ফোন, রবি, এয়ারটেল ও টেলিটক- দেশের এই চার মোবাইল অপারেটরের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিষয়ে ৬৬ হাজার ৭০৫টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ৬৫ হাজার ৮৫৬টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে বলে বিটিআরসি সূত্র জানিয়েছে। গত ১৯ আগস্ট বিটিআরসির এক গণশুনানিতে অভিযোগের মধ্যে সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ যেমন রয়েছে, তেমনি ডাটার গতি, রিচার্জ, প্যাকেজ পরিবর্তন ও ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস নিয়েও অভিযোগ করেন গ্রাহকরা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিটিআরসিতে বিভিন্ন বিষয়ে মোট ১১ হাজার ৪২৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে সেবার মান নিয়ে অভিযোগ ছিল তিন হাজার ৫২৯টি। এ ছাড়া ডাটার গতি নিয়ে ৯২৬টি, বিবিধ বিষয়ে এক হাজার ৩৩১টি, ভ্যাস নিয়ে ৮১১টি, লাইসেন্সসংক্রান্ত ৭৯৮টি, রিচার্জ নিয়ে ৪৬৭টি, প্যাকেজ মাইগ্রেশন নিয়ে ৬৪৭টি এবং ডাটাসংক্রান্ত ৪৮১টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়।
সেবা আছে, মান কতটা?
মোবাইল অপারেটরদের সেবার পরিধি বাড়লেও গ্রাহক পর্যায়ে সেবার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। প্রশ্ন উঠেছে, গ্রাহকরা নিয়মিত কল ড্রপের অভিযোগ জানালেও সেবার মান কতটা নিশ্চিত হচ্ছে আর অপারেটরদের নেটওয়ার্কের প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি কতটা কার্যকর? নেটওয়ার্কের দুর্বলতা, নির্দিষ্ট এলাকায় অতিরিক্ত ব্যবহারকারীর চাপ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা কিংবা কারিগরি ত্রুটির কারণে কলড্রপ হওয়ার তথ্য উঠে এলেও সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট অপারেটরদের পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রাহকরা নিয়মিত সেবার মূল্য পরিশোধ করার পরও প্রত্যাশিত মান না পেলে তাদের অভিযোগের প্রতিকার কিভাবে নিশ্চিত হবে কিংবা সেবার মান নির্ধারিত মানদণ্ডের নিচে নেমে গেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর- সেখানেও রয়েছে বড় প্রশ্ন। যদিও মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবার মান পর্যবেক্ষণ, গ্রাহকস্বার্থ রক্ষা এবং প্রযোজ্য বিধিবিধান বাস্তবায়নে বিটিআরসির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গ্রাহকদের প্রত্যাশা, কলড্রপের হার ও সেবার মান নিয়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করা হোক। পাশাপাশি অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নেটওয়ার্ক পরীক্ষা, অপারেটরভিত্তিক সেবার মান মূল্যায়ন এবং ত্রুটি শনাক্ত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হোক। 
ব্যাংকার আরিফুর রহমান একযুগেরও বেশি এয়ারটেল ও গ্রামীণ ফোনের দু’টি সিম ব্যবহার করেন। তিনি অভিযোগের সুরে বলেন, কী আর বলব, দুটো সিম ব্যবহার করি কিন্তু নেটওয়ার্ক বিড়ম্বনায় মাঝে মধ্যে বিরক্ত লাগে। এত বেশি কল ড্রপ হয় যে হোয়াটসঅ্যাপেতো কথা বলা দুষ্কর হয়ে পড়েছে। প্রতি পাঁচ সেকেন্ড পর কথা শোনা যায়। আবার কয়েক মিনিট পর অটো নীরব হয়ে যায়, অপরপ্রান্ত থেকে কথা শোনা যায় না, কখনো কখনো আমার কথাও অপরপ্রান্ত থেকে শুনতে পায় না। এদিকে অফলাইনে খরচতো আগের থেকে বেড়েছে। 
একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক নাজমুল হাসান। তিনি গ্রামীণ ফোন, রবি ও এয়ারটেল- এই তিনটি অপারেটরের সিম ব্যবহার করেন দেড় যুগেরও বেশি। নাজমুল হাসানের মতে, ইন্টারনেট ব্যবহারে কোনো কোম্পানির অবস্থা ভালো না। তিনটা কোম্পানির নেট ঘুরে ফিরে ব্যবহার করি কিন্তু অনলাইনে কথা বলতে গেলে সংযোগ সমস্যা দেখা দেয়। তিনি জানান, আগের তুলনায় ইন্টারনেট ব্যবহারে প্যাকেজভেদে দাম এক শ’ থেকে দেড় শ’ বা তারও বেশি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু সেবার মান বাড়েনি বরং আরো কমেছে। কলড্রপের কারণে অনলাইনে কথা বলতে বিরক্ত লাগে। আবার অফলাইনে কথা বললে চার্জ আগের তুলনায় অনেক বেশি কাটে। 
কল ড্রপে আর্থিক ক্ষতিপূরণের কী অবস্থা
দেশের মোবাইল ফোন গ্রাহকদের কলড্রপ হলে সংশ্লিষ্ট অপারেটরকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা বলে ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল,  মোবাইল গ্রাহকগণ অননেটে (একই মোবাইল অপারেটর) কলের ক্ষেত্রে দৈনিক প্রথম ও দ্বিতীয় কলড্রপের জন্য ৩০ সেকেন্ড করে এবং দ্বিতীয় থেকে সপ্তম কলড্রপের জন্য ৪০ সেকেন্ড করে ক্ষতিপূরণ পাবেন। কিন্তু তার বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। এদিকে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে কল ড্রপ, নেটওয়ার্ক শক্তিশালীকরণ ও সেবার মান উন্নয়ন এবং প্যাকেজের মূল্য নিয়ে গ্রাহকের উদ্বেগ দূর করতে গ্রামীণফোনসহ টেলিফোন অপারেটরদের প্রতি ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম কঠোর বার্তা দেন। অপারেটরদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গ্রাহকদের প্রত্যাশা ও স্বার্থের প্রতিও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী, নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করাই সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
বিশেষজ্ঞ মত
এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট আইটি বিশেষজ্ঞ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির অধ্যাপক ড. ফজলুল করিম পাটোয়ারী নয়া দিগন্তকে বলেন, নেটওয়ার্ক দুর্বলতাসহ নানা কারণে কলড্রপ হয়ে থাকে। তবে এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কলড্রপের কারণে গ্রাহকরা নানামুখী ক্ষতির মুখে পড়ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রাহকদের এই ক্ষতিটা কিভাবে দেখা হচ্ছে।  যেমন কল ড্রপ হলে গ্রাহকদের সময় অপচয় হচ্ছে, আর্থিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। এরচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে কল ড্রপের কারণে কথা শেষ করতে না পারায় কখনো কখনো অপরপ্রান্তের ওই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে আবার কানেক্ট করতে ব্যর্থ হওয়া। এটির কারণে অনেকের সাথে ব্যক্তিগতভাবে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়, কখনো কখনো ব্যবসায়িকভাবেও মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে কলড্রপের কারণে ধাপে ধাপে ক্ষতিপূরণ দেয়া হতো। যদিও সেটা পর্যাপ্ত ছিল না। তারপরও কিছুদিন দেয়ার পর সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। 
ড. পাটোয়ারী মনে করেন, গ্রাহককে ক্ষতিপূরণ দেয়ার বদলে অপারেটরগুলোকে একদিকে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে যা পর্যাপ্ত তা চালু করার জন্য সরকারের তরফ থেকে বাধ্য করা উচিত। অন্যদিকে সেবার মান উন্নয়নে অপারেটরগুলোকে সরকার চাপ প্রয়োগ করে বাধ্য করতে পারে।