হানিফসহ চার আসামির মামলার রায় বৃহস্পতিবার
  •  জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  •  মানবতাবিরোধী অপরাধ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। এ মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফসহ চার আসামি রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ায় হত্যাকাণ্ড, আন্দোলন দমনে উসকানি এবং অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ এনেছে রাষ্ট্রপক্ষ। গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায়ের দিন ধার্য করেন।
হানিফ ছাড়া অন্য আসামিরা হলেন কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী এবং কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। ট্রাইব্যুনালের নথি অনুযায়ী, চার আসামিই পলাতক। মামলায় মোট তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে আন্দোলন দমনে উসকানি, নির্দেশনা ও সহায়তার মাধ্যমে আসামিরা মানবতাবিরোধী অপরাধে যুক্ত ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার অভিযোগও রয়েছে। মামলার প্রথম অভিযোগে হানিফের বক্তব্য ও রাজনৈতিক ভূমিকার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।  অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাথে বিভিন্ন সময়ে উপস্থিত থেকে তার বক্তব্যকে সমর্থন করেন হানিফ। এ ছাড়া ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি আলোচনা সভায় দেয়া তার বক্তব্যের বিষয়টিও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, এসব বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে উসকানি দেয়া হয়। আন্দোলনকারীদের বিভিন্নভাবে চিহ্নিত করে তাদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর পরিবেশ তৈরিতে এসব বক্তব্য ভূমিকা রেখেছিল বলে দাবি করেছে প্রসিকিউশন।
অভিযোগপত্রে আরো বলা হয়েছে, তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের অবস্থান থেকে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা ও কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করা হয়েছিল। প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের হত্যা এবং গুরুতর আহত করার ঘটনাগুলোর সাথে এই প্রক্রিয়ার যোগসূত্র রয়েছে বলে অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষের। তবে বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে সংঘটিত অপরাধের সম্পর্ক কতটা প্রমাণিত হয়েছে, তা নির্ধারণ করবেন ট্রাইব্যুনাল।
মামলার দ্বিতীয় অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ২০২৪ সালের ২৭ জুলাইয়ের একটি বৈঠক। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ওই বৈঠকে সদর উদ্দিন খান, আসগর আলী ও আতাউর রহমান আতা উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, হানিফের নির্দেশনা ও নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় স্থানীয় নেতারা আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশনা দেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে আখ্যায়িত করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগে উসকানি দেয়া হয়। তাদের ওপর গুলিবর্ষণ, হত্যা এবং অন্যান্য নির্যাতনের সাথে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও আনা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, বৈঠকে দেয়া বক্তব্য ও নির্দেশনার পর কুষ্টিয়ায় আন্দোলনকারীদের ওপর সহিংসতা ঘটে। এ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগপত্রে বিবরণ রয়েছে। কুষ্টিয়া শহরে একাধিক প্রাণহানি এবং বহু মানুষের আহত হওয়ার ঘটনাকে এই অভিযোগের সাথে যুক্ত করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
অভিযোগপত্রে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, আবদুল্লাহ আল মুবিন, উপমা, বাবলু সবজী ও ইউসুফ শেখের নাম এসেছে। তাদের হত্যাকাণ্ডের বিবরণ মামলার অভিযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনা। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ওই দিন বেলা দেড়টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। কুষ্টিয়া শহরের হাসপাতাল মোড়, মজমপুরমুখী সড়ক এবং আশপাশের বিভিন্ন স্থানের ঘটনার বিবরণ এতে এসেছে। রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় কয়েকজন নিহত হন। তাদের মধ্যে শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশার মানুষ ছিলেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। সেই নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন স্থানে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে বলে দাবি করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। হানিফ, সদর উদ্দিন খান, আসগর আলী ও আতাউর রহমান আতার বিরুদ্ধে এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা ও সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য, ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং আন্দোলন দমনের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংঘটিত হয়েছিল। তবে প্রতিটি আসামির ব্যক্তিগত ভূমিকা, নির্দেশনা দেয়ার বিষয়টি এবং হত্যাকাণ্ডের সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতা কতটা প্রমাণিত হয়েছে, তা ট্রাইব্যুনালের রায়ে নির্ধারিত হবে।
মামলার তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ। ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল ও আমলে নেয়া হয়। ২ নভেম্বর আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের সূচনা বক্তব্য ও সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর। মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ মোট ১৯ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন।
এ ছাড়া ৩৬ সিরিজের নথিপত্র এবং পাঁচটি বস্তুগত আলামত প্রদর্শনের তথ্য রয়েছে মামলার সারসংক্ষেপে। প্রথম দফায় যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ ছিল। তবে পরে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে আরো সাক্ষ্য ও নথিপত্র উপস্থাপন করা হয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপক্ষের ১৩ ও ১৯ নম্বর সাক্ষীর জবানবন্দী পুনরায় গ্রহণ করা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়া শেষ হয় ৮ সেপ্টেম্বর। এরপর নতুন সাক্ষ্য ও নথিপত্রের ওপর উভয় পক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। ৫ অক্টোবর পুনরায় যুক্তিতর্কের তারিখ নির্ধারিত ছিল। ৭ অক্টোবর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। এরপর গতকাল মঙ্গলবার ট্রাইব্যুনাল ২৯ অক্টোবর রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।
এই মামলার রায়ে ট্রাইব্যুনালকে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগের বিচারিক মূল্যায়ন করতে হবে। সাক্ষ্য, নথিপত্র ও যুক্তিতর্ক পর্যালোচনা করে নির্ধারণ করতে হবে, কোন অভিযোগ কতটা প্রমাণিত হয়েছে। একই সাথে প্রত্যেক আসামির ভূমিকা ও দায় আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ, একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া অন্য আসামির দায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে না।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড এবং আন্দোলন দমনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের কথিত ভূমিকা এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিক। দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে মামলাটি এখন রায়ের পর্যায়ে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে জানা যাবে, রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে চার আসামির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিচারিক পরিণতি কী হয়।

Advertisement