জাতীয় গ্রিডের দুর্বলতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ
  •  অন্ধকারে ঢাকা-চট্টগ্রাম : এক ঘণ্টায় ৫ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট উৎপাদন পতন
  •  যান্ত্রিক ত্রুটিতে বিপর্যস্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ, বিপাকে নগরজীবন ও শিল্পকারখানা

এক মুহূর্তে থমকে যায় নগরজীবন। দেশের প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু বাংলাদেশ সচিবালয়, বঙ্গভবনসহ, অফিসের ব্যস্ততা, শিল্পকারখানার উৎপাদন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং ঘরে ঘরে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় নেমে আসে অনিশ্চয়তা। জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে আকস্মিক বিপর্যয়ের কারণে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। মাত্র এক ঘণ্টার ব্যবধানে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায় ৫ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট। দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর এ আকস্মিক ধাক্কা আবারো সামনে নিয়ে এসেছে জাতীয় গ্রিডের স্থিতিশীলতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্ভরযোগ্যতা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
বিদ্যুৎ বিভাগ এক জরুরি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামের কিছু অংশে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ হয়ে যায়। জরুরি ভিত্তিতে সংযোগ পুনর্বহালের কার্যক্রম চলছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হয়েছে এবং বাকি অংশেও স্বল্প সময়ের মধ্যে সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য গ্রাহকদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
১ ঘণ্টায় উৎপাদন কমল ৫,৩৭০ মেগাওয়াট
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ১৪ হাজার ৭১৯ মেগাওয়াট; কিন্তু মাত্র এক ঘণ্টা পর, দুপুর ১টায় উৎপাদন নেমে আসে ৯ হাজার ৩৪৯ মেগাওয়াটে। অর্থাৎ এক ঘণ্টায় উৎপাদন কমে যায় পাঁচ হাজার ৩৭০ মেগাওয়াট, যা ওই সময়ের আগের উৎপাদনের প্রায় ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ।
এ আকস্মিক পতনের ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধরনের বিঘœ ঘটে। রাজধানীর মগবাজার, বনশ্রী, খিলগাঁওসহ পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা এবং চট্টগ্রামের কিছু অংশে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার খবর পাওয়া যায়। দুপুর ১২টা ৪৩ মিনিটের দিকে পরিস্থিতি প্রকট হয়ে ওঠে। সচিবালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং আশপাশের এলাকাও বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি জানিয়েছে, ভুলতা, হরিপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ, গুলশান, রামপুরা, উলন ও মতিঝিলসহ ঢাকার পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। চট্টগ্রামের একটি অংশেও এর প্রভাব পড়ে। তবে উত্তরাঞ্চলসহ দেশের অন্যান্য অঞ্চলের বেশ কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সচল ছিল।
গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বড় ধস
বিদ্যুৎ বিভাগের এক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে বড় কয়লা ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আকস্মিক বন্ধ হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে। বিশেষ করে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের পতন দেখা যায়। দুপুর ১২টায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন ছিল চার হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট। দুপুর ১টায় তা নেমে আসে এক হাজার ৭৩৪ মেগাওয়াটে। ফলে এক ঘণ্টায় উৎপাদন কমে যায় দুই হাজার ৬৪৮ মেগাওয়াট, যা প্রায় ৬০ দশমিক ৪ শতাংশ।
অন্য দিকে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। দুপুর ১২টায় এসব কেন্দ্র থেকে চার হাজার ৮৬৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলেও দুপুর ১টায় তা কমে দাঁড়ায় দুই হাজার ৯৪৭ মেগাওয়াটে। অর্থাৎ উৎপাদন কমে যায় এক হাজার ৯১৬ মেগাওয়াট বা প্রায় ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশ।
শুধু গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেই উৎপাদন কমে যায় চার হাজার ৫৬৪ মেগাওয়াট। বাকি উৎপাদন ঘাটতির সাথে অন্যান্য উৎসের উৎপাদন হ্রাসের সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রাপ্ত তথ্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে কোন কোন বিদ্যুৎকেন্দ্র ঠিক কী কারণে বন্ধ হয়েছিল, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
চাহিদা ও উৎপাদনের ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার  বেলা ১১টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৬০১ মেগাওয়াট। ওই সময় উৎপাদন হয় ১৪ হাজার ৩০৩ মেগাওয়াট। ফলে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ঘাটতি ছিল ২৯৮ মেগাওয়াট।
এ ঘাটতির সাথে পরবর্তী গ্রিড বিপর্যয়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। তবে বিপর্যয়ের পর উৎপাদন দ্রুত কমে যাওয়া এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর চাপের মাত্রা স্পষ্ট করেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। উৎপাদন কমে গেলে এবং সঞ্চালন ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিলে গ্রিডের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে দ্রুত ত্রুটি শনাক্ত করা, বিদ্যুৎকেন্দ্র পুনরায় চালু করা এবং সঞ্চালন লাইন নিরাপদভাবে সচল করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পুনরুদ্ধারে কাজ করছে প্রকৌশলীরা
বিপর্যয়ের পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রকৌশলীরা কাজ শুরু করেন। জাতীয় লোড ডেসপ্যাচ সেন্টারের (এনএলডিসি) নিয়ন্ত্রণে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনর্বহালের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। পিডিবির এক কর্মকর্তা গতকাল নয়া দিগন্তকে জানান, বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু করার প্রক্রিয়া চলছে এবং উৎপাদন ধীরে ধীরে বাড়ানো হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, গতকাল রাত ১০টার মধ্যে পরিস্থিতি একটি সহনীয় পর্যায়ে পৌঁছাবে। তিনি আরো জানান, বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট ইতোমধ্যে উৎপাদনে ফিরেছে। বিবিয়ানা-৩ ও আরএনপিএল ইউনিট-১-এর উৎপাদন পুনরুদ্ধারের কার্যক্রমও চলছে। প্রায় ৩৫৩ থেকে ৩৫৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে এবং ৪১২ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট চালুর প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এ দিকে বিদ্যুৎ বিভাগের জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে অধিকাংশ এলাকায় সংযোগ পুনর্বহালের কথা জানানো হয়েছে। তবে বাকি এলাকাগুলোতে সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী হালনাগাদ তথ্য প্রয়োজন।
বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ এখনো অজানা
বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারের কাজ চললেও বিপর্যয়ের সুনির্দিষ্ট কারিগরি কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। বিদ্যুৎ বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে যান্ত্রিক ত্রুটির কথা বলা হলেও জাতীয় গ্রিডের কোন অংশে এবং কী ধরনের ত্রুটির কারণে এত বড় উৎপাদন পতন ঘটেছে, তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি বিষয়টি তদন্ত করে দেখবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে তদন্তের ফল প্রকাশের আগে বিপর্যয়ের নির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন হবে না।
গ্রিডে ত্রুটি দেখা দিলে বিদ্যুৎকেন্দ্র, সঞ্চালন লাইন এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। তাই এ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে ত্রুটির উৎস, সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধের উপায় চিহ্নিত করা জরুরি।
অতীতের অভিজ্ঞতা, নতুন করে সতর্কবার্তা
বাংলাদেশে জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের ঘটনা নতুন নয়। ২০২২ সালের ৪ অক্টোবর দুপুরে পূর্বাঞ্চলীয় গ্রিডে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ফলে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহসহ দেশের বিস্তীর্ণ এলাকা বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন অঞ্চলে তিন থেকে আট ঘণ্টার মধ্যে ধাপে ধাপে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। এর আগেও ২০১৪ সালের ১ নভেম্বর জাতীয় গ্রিড বিপর্যয়ের কারণে সারা দেশে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ ছিল।
বার বার এমন ঘটনা ঘটার অভিজ্ঞতা বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা, জরুরি প্রতিক্রিয়া এবং ত্রুটি শনাক্তকরণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিরাপদে সঞ্চালন ও বিতরণের সক্ষমতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

Advertisement