আজ রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর
আজ রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর।

আবু সালেহ আকন 

Advertisement

আজ রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর। ২০০৬ সালের এই দিনে রাজধানীর পল্টনে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসররা লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে মানুষ হত্যার পৈশাচিক তাণ্ডবে মেতেছিল। আওয়ামী নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের ডাকা অবরোধ কর্মসূচিকে ঘিরে সংঘর্ষে সেদিন প্রাণ হারান ১৩ জন। রাজধানীতেই নিহত হন জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের ছয়জন এবং ছাত্রমৈত্রীর একজন কর্মী। আহত হন কমপক্ষে এক হাজার মানুষ। 
ঘটনার দুই দশক পেরিয়ে গেলেও কোনো বিচার হয়নি। লগি-বৈঠা দিয়ে পেটানোর সেই দৃশ্য আজও অনেকের মনে আতঙ্ক জাগায়। নিহতদের লাশের ওপর উল্লাসের দৃশ্য দেখে বিশ্বজুড়ে মানুষ হতবাক হয়েছিল। ঘটনার পর পল্টন ও শাহবাগ থানায় মোট পাঁচটি মামলা হয়। পল্টন থানার দু’টি পাল্টাপাল্টি মামলার একটি ২০০৯ সালে প্রত্যাহার করা হয়। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন ক্ষমতাসীন ১৪ দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে করা অন্য মামলাগুলোও ধাপে ধাপে তুলে নেয়া হয়। এসব মামলায় পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৪ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা আসামি ছিলেন। মামলাগুলো পুনর্জীবিত করার জন্য আইনিপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন। 
সেদিন প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে রাস্তায় মহড়া দিতে দেখা যায় অস্ত্রধারীদের। জামায়াত-শিবিরের নিহত ছয়জন হলেন- মোজাহিদুল ইসলাম, জসিম উদ্দিন (১), জসিম উদ্দিন (২), গোলাম কিবরিয়া শিপন, ফয়সাল ও হাবিবুর রহমান। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের উপস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষের সামনে তাদের পিটিয়ে হত্যা করা হয়। আহত জামায়াতের আরেক কর্মী সাইফুল্লাহ মো: মাসুম ঘটনার দুই দিন পর হাসপাতালে মারা যান। একই সময় পল্টন মোড়ে নিহত হন ছাত্রমৈত্রীর খিলগাঁও থানার সাধারণ সম্পাদক রাসেল খান। পল্টন ও আশপাশের এলাকায় আহত হন কমপক্ষে এক হাজার মানুষ। 
ওই সময় পর্যন্ত বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ক্ষমতায় থাকলেও পুলিশের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে মাঠে ১৪ দলের পক্ষে কাজ করতে দেখা যায়। তাদের অনেকে এখনো চাকরিতে আছেন। অভিযোগ আছে, তাদের কেউ কেউ এখনো আওয়ামী লীগের পক্ষে গোপনে কাজ করছেন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর কিছু কর্মকর্তার শাস্তি হলেও অনেকে এখনো বহাল তবিয়তে আছেন। 
এ ঘটনায় জামায়াতের পক্ষ থেকে পল্টন থানায় মামলা করেন পল্টন থানা জামায়াতের তৎকালীন আমির এ টি এম সিরাজুল হক। মামলা নম্বর ৬১, তারিখ ২৯ অক্টোবর ২০০৬। এ মামলায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল, তোফায়েল আহমেদ, মোহাম্মদ নাসিম, আবদুর রাজ্জাক, জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু ও ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেননসহ ৪০ জনকে এজাহারনামীয় আসামি করা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামি ছিলেন সহস্রাধিক। 
আহত মাসুম মারা যাওয়ার পর ৩ নভেম্বর আরেকটি সম্পূরক এজাহার দাখিল করা হয়। এতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির নানকসহ ২৩ জনকে এজাহারনামীয় এবং দুই শতাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। অভিযোগটি দাখিল করেন মাসুমের ভাই মো: শামসুল আলম মাহবুব। 
অন্য দিকে ছাত্রমৈত্রীর রাসেল খান নিহত হওয়ার ঘটনায় পল্টন থানায় আলাদা মামলা হয়। এতে জামায়াতের তৎকালীন আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ মোট ১০ জনকে আসামি করা হয়। বাদি ছিলেন তৎকালীন ঢাকা মহানগর ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক কামরুল আহসান। মামলা নম্বর ৬২(১০)২০০৬। এ মামলায় ৬১ নম্বর মামলার বাদি সিরাজুল হককেও আসামি করা হয়। এ ঘটনায় পল্টন থানায় আরো তিনটি এবং শাহবাগ থানায় একটি মামলা হয়। ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চারদলীয় জোট ক্ষমতায় থাকলেও মামলা নেয়ার ক্ষেত্রেও থানা-পুলিশ আওয়ামী লীগের প্রতি পক্ষপাত করেছে বলে অভিযোগ আছে। 
পল্টন থানার ৬১ নম্বর মামলায় ২০০৭ সালের ১০ এপ্রিল ৪৬ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। অভিযোগপত্র নম্বর ১৪৪। দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৮, ১৪৯, ৩২৩, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭, ৩০২, ১০৯ ও ১১৪ ধারায় এ অভিযোগ আনা হয়। 
যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়া হয়, তারা হলেন- আবদুল জলিল, মোহাম্মদ নাসিম, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, সাহারা খাতুন, হাজী সেলিম, ডা: এইচ বি এম ইকবাল, আবদুস সালাম ওরফে সেলিম, সবুজ, আলী, মনা, রতন, আবুল, বাবু ওরফে নাজির আহম্মদ, জাকির ওরফে জাকির হোসেন, শফিকুল ইসলাম, সালাউদ্দিন খোকন, সুলতান মিয়া, আবুল কাশেম, আলমগীর ওরফে গোলাম মোহাম্মদ আলমগীর, নওসের আলী, আবদুল লতিফ ওরফে ক্ষ্যাপা, মো: জাকির হোসেন, শাহরিয়ার ওরফে সোহেল শাহরিয়ার, শাহাবুদ্দিন কিরণ, জাহাঙ্গীর হায়দার চৌধুরী, আশরাফ হোসেন, টিটু, ওমর ফারুক, শেখ হাসিনা, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সিদ্দিক নাজমুল আলম, রাসেল, মজিবুর রহমান মাইজ্জা, বেলায়েত হোসেন, আবু সাঈদ, বশির আহম্মদ, কিরণ ওরফে আবদুল মালেক, সোহেল শাহরিয়ার ওরফে শর্টগান সোহেল, জাহাঙ্গীর আলম, মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী, মোস্তাকিম বিল্লাহ, মুকুল, রায় মোহন শীল ও সুমন। 
২০০৭ সালের ২৪ এপ্রিল আদালত এই অভিযোগপত্র গ্রহণ করে এবং আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। পরে পরোয়ানা স্থগিত করা হয়। ১৪ দলীয় জোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়। 
কামরুল আহসানের করা মামলায় নিজামীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয়া হয়। ২০০৯ সালের ৫ মে মামলাটি প্রত্যাহারের আবেদন করা হলেও তা প্রত্যাহার হয়নি। পরে উচ্চ আদালতে মামলাটি বাতিলের (কোয়াশমেন্ট) আবেদন করা হলে আদালত মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রাখেন। 
২৮ অক্টোবরের মামলা প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট আবদুর রাজ্জাক নয়া দিগন্তকে বলেন, ঘটনার পর তদন্ত কর্মকর্তা শেখ হাসিনা, হাসানুল হক ইনু ও আবদুল জলিলসহ ৪৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। ২০০৭ সালে আদালত তা গ্রহণ করে আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। কিন্তু একই দিন বিকেলে মামলাটি আবার তদন্তের জন্য পাঠিয়ে পরোয়ানা স্থগিত করা হয়। এরপর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়। 
তিনি আরো বলেন, জসিম উদ্দিন ও মুজাহিদসহ ছয়জন নিহত হলেও এই হত্যা মামলার কোনো বিচার হয়নি। মামলা প্রত্যাহারের পর থেকে সার্টিফায়েড কপির জন্য বারবার আবেদন করা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো নথি পাওয়া যায়নি। এটি একটি ফৌজদারি হত্যা মামলা। তাই এটি আবার আইনিপ্রক্রিয়ায় ফিরিয়ে আনতে তাদের আইনজীবী দল চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।