
নিজস্ব প্রতিবেদক
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটি ফ্যাসিস্টদের একটি ক্লাব। তারা যখনই বিভিন্ন কায়দায় সন্ত্রাস করে ক্ষমতায় গিয়েছে, তখনই তারা বেপরোয়া হত্যা ও সন্ত্রাস চালিয়ে গদি পাকাপোক্ত করতে চেয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর আইডিইবি ভবনের মাল্টিপারপাস হলে জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানীর পল্টনে আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠার তাণ্ডবে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সাথে মতবিনিময় ও আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিমের সঞ্চালনায় আলোচনা ও মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি, সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি ও মাওলানা আবদুল হালিম, অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের; কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। আরো বক্তৃতা করেন, ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠার তাণ্ডবে শহীদ হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের গর্বিত পিতা মো: তাজুল ইসলাম, শহীদ মুজাহিদুল ইসলামের গর্বিত মামা, বিশিষ্ট সংবাদকর্মী মিজান আহম্মেদ, শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের মা শামছুন্নাহার রুমি, শহীদ হাবিবুর রহমান মৃধার সন্তান রুবেল মৃধা, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন এমপি, হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, জয়নুল আবেদীন এমপি এবং ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম। দোয়া পরিচালনা করেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এমপি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ ৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণ করে ৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত এ জাতির ওপর সমানতালে সন্ত্রাস, লুটপাট, তাণ্ডব, চাঁদাবাজি ও মা-বোনের ইজ্জত নষ্ট করার ঘটনা ঘটিয়েছে। এই অপকর্মগুলো সেসময় তারা করেছে। স্বাধীন দেশে ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে তারা খুন করেছে। ৩৫-৩৭ হাজার মানুষকে হত্যা করা হলেও তাদের কাউকে বিচারের মুখোমুখি কিংবা আদালতে তোলা হয়নি। রক্ষী বাহিনী দিয়ে তাদের নির্মমভাবে খুন করা হয়েছিল। তারা নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে বাকশাল ও নিজেদের রায় রক্ষী বাহিনী গঠন করেছিল। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে ৯৬ সালে ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু রক্তের নেশা তার কাছে থেকে যায়নি। তিনি বলেছিলেন, আমার দলের একটি লাশ পড়লে ১০টি লাশ ফেলতে হবে। শাসক হয়ে জনগণকে খুন করার সরাসরি নির্দেশ দেয়ার ধৃষ্টতা! ফ্যাসিস্টের যে ঐতিহ্য তিনি ধারণ করেন, সে কারণে তিনি এটি করেছিলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০০১ সালে জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে চার দলীয় জোট ক্ষমতায় আসে এবং ২০০৬ সালের শেষ দিন ২৮ অক্টোবর আওয়ামী লীগ একই ঘটনা ঘটিয়েছে। লগি-বৈঠা হাতে নিয়ে রাজধানীতে হাজির হতে নির্দেশ দিয়েছিলেন হাসিনা। মানুষ পিটিয়ে হত্যা করার জন্য রাজধানীতে লগি-বৈঠা আনতে বলা হয়েছিল। হত্যাকাণ্ডে বামপন্থী দোসররা আওয়ামী লীগের সাথে ছিল। আমাদের সহকর্মীকে হত্যা করে লাশের ওপর নৃত্য করেছে বাপ্পাদিত্য বসু। এমনকি তারা আমাদের ভাইদের লাশগুলো চুরি করতে চেয়েছিল। প্রতিরোধের মুখে তারা ব্যর্থ হয়েছিল। কী নিদারুণ বিভীষিকাময় মুহূর্ত ছিল!
তিনি বলেন, আমাদের আফসোস! তখনো চারদলীয় সরকার ছিল। তারপরও মাগরিবের আগ পর্যন্ত তারা এ তাণ্ডব চালানোর সুযোগ পেল কিভাবে? এখানে কার দুর্বলতা ছিল? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামনে নির্মম হত্যাকাণ্ড হলো, তারা কাউকে হাত ধরে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল না কেন? তাহলে এখানে কোনো বৃহৎ ষড়যন্ত্র ও নোংরা খেলা ছিল? এটা জাতির বিরাট প্রশ্ন। এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মামলা হলো। আওয়ামী লীগ পেছনের দরজা দিয়ে বোঝাপড়া করে এক-এগারোর সরকারের হাত ধরে ক্ষমতায় এসে মামলার নথিপত্রসহ সব আলামত গায়েব করে ফেলে। মামলা প্রত্যাহার করে নেয়।
৪০ বছর পর জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে মিথ্যা মামলা দিয়ে হত্যা করার ফল আওয়ামী লীগকে ভোগ করতে হবে বলেও সতর্ক করেন জামায়াতের আমির। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ যথাযথ অপরাধী, তারা এখান থেকে পার পাবে না, ইনশাআল্লাহ। আমরা এ বিচারের শেষ দেখে ছাড়ব। তিনি আরো বলেন, সেদিন বাংলাদেশ পথ হারিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যাসিবাদে প্রবেশ করেছিল, যা এখন অব্যাহত আছে। আমরা সকল ফ্যাসিবাদকে বলে দিই, আওয়ামী লীগ কখনো স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে পারেনি। সবসময় লাঞ্ছিত হয়ে, ধিকৃত হয়ে বিদায় নিয়েছে। সেই রাস্তা এখনো যদি কেউ অবলম্বন করতে চান, তাদের পরিণতি নিশ্চয়ই ভিন্ন হবে না, একই পরিণতি হবে। আমরা এ সমস্ত নিকৃষ্ট খুনির ন্যায়বিচার চাই, আমরা চাপিয়ে দেয়া কোনো বিচার চাই না। অন্যায়ভাবে ফাঁসিও চাই না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোনো ফ্যাসিবাদের হাতে বাংলাদেশকে ইজারা দেবো না। বাংলাদেশকে পাহারা দিয়ে রাখব। জামায়াতের নেতৃবৃন্দ ও শহীদরা জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন, আল্লাহর জন্য, মানবতার জন্য আমরা সবসময় প্রস্তুত। কোনো অন্যায়ের কাছে আমরা মাথানত করব না। ফাঁসির কাষ্ঠে যাওয়ার সময় নেতৃবৃন্দের পা ও বুক কাঁপেনি, কারণ তারা নিশ্চিত ছিলেন, তাদের ওপর জুলুম করা হয়েছে, তারা শহীদ হবেন, আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ফ্যাসিবাদকে কেউ কেউ আসকারা দিচ্ছেন। আমরা তাদের কোনো রাজনৈতিক দল মনে করি না। রাজনীতি সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার, বৈষম্য দূর করার জন্য। আর এসব বৈশিষ্ট্য আওয়ামী লীগের মধ্যে নেই। এজন্য বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের মধ্যে যারা ভালো মানুষ, তারা তাদের পছন্দের আপন ঠিকানা খুঁজে নেবে। কিন্তু ফ্যাসিবাদ বাংলাদেশে ফিরে আসবে- এই কল্পনা কেউ করবেন না, স্বপ্ন দেখবেন না, জুজুর ভয় আমাদের দেখাবেন না। তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশে রাজনীতি করবেন, তাদের মানবিক রাজনীতি করতে হবে। পাশবিক ও সন্ত্রাসবাদের রাজনীতি করতে দেয়া হবে না। সাড়ে ১৫ বছর ও জুলাইতে যাদের খুন করা হয়েছে, তাদের শহীদ হিসেবে কবুল করার জন্য দোয়া করেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা শহীদদের রক্তের কাছে ঋণী। আজীবন গভীর শ্রদ্ধার সাথে তাদের স্মরণ করব।
জামায়াত আমির বলেন, মানুষ ফ্যাসিবাদের পরিবর্তন চায়। পরিবর্তনের পক্ষে গণভোটে রায় দিয়েছিল। সংবিধান ঘষামাজার জন্য রায় দেয়নি। গণভোটে রায় দিয়েছে রাজনীতির আমূল পরিবর্তনের জন্য। যে রাজনীতি হবে দেশ ও জনগণের কল্যাণের। কাউকে ফ্যাসিবাদী হওয়ার কোনো সুযোগ দেবে না। আফসোস, সরকার সেটি ভুলে গেছে। ভুলে গিয়ে লাভ হবে না। ফিরে আসুন। সংবিধান সংস্কারে গণপরিষদ গঠন করে সংবিধান সংস্কার করুন। যদি না করেন, পরিষ্কার বার্তা- অন্যায়ের কাছে মাথানত করিনি, এখনো করব না। জনগণ ও ন্যায়-ইনসাফের জন্য, মানবিক বাংলাদেশ গড়ার জন্য এবং সকল হত্যাকাণ্ডের খুনিদের বিচারের আওতায় আনার জন্য। এ টি এম আজহারুল ইসলাম এমপি বলেন, পল্টন মোড়ে ছয়জন ভাইকে প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত মানুষের সামনে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করাই শুধু নয়, মৃত্যু হয়েছে কি না, এজন্য লাশের ওপর নর্তন-কুর্দন- এরকম ইতিহাস আমার জানা নেই। তারা মানুষ নামের কলঙ্ক। তারা মানুষ নয়, অমানুষ। তারা ছিল লগি-বৈঠাধারী আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, সন্ত্রাসী দল। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সবসময় সন্ত্রাসের মাধ্যমে ভয়ভীতি সৃষ্টি করে জনগণের রায় তাদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা করেছে। আওয়ামী লীগের ইতিহাস হত্যার ইতিহাস। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে জাতির জন্য একটি অভিশাপ। এ অভিশাপ যত দিন বাংলাদেশে থাকবে, তত দিন জনগণ গণতন্ত্রের মুখ দেখতে পাবে না।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আধিপত্যবাদীর সেবাদাস আওয়ামী লীগ পরিকল্পিতভাবে চারদলীয় জোটের ক্ষমতা হস্তান্তরের দিনে লগি-বৈঠা দিয়ে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালিয়ে দেশকে অগণতান্ত্রিক পথে নিয়ে যায়। যার ফলে আমাদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন, মানবিক ও দুর্নীতিমুক্ত, ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে পারিনি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের চরিত্র হচ্ছে গণতন্ত্রকে হত্যা করা। ক্ষমতার বাইরে থেকে গণতন্ত্রের কথা বলে, আর ক্ষমতায় গিয়েই গণতন্ত্রকে হত্যা করে। শেখ হাসিনার বাবাও ক্ষমতায় গিয়ে অল্পদিনের মধ্যে ৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি টুঁটি চেপে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছেন। তার সন্তান শেখ হাসিনাও লগি-বৈঠার উত্তরসূরি হয়ে নৃশংসতা ও নিষ্ঠুরতার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রকে হত্যা করেন। শাপলা গণহত্যা, পিলখানা হত্যাকাণ্ড এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ফাঁসি দিয়ে হত্যা করেছে। যেহেতু তিনি গণতন্ত্রকে হত্যা করেছেন, এজন্য তাকেও ক্ষমতা থেকে অস্বাভাবিকভাবে চলে যেতে হয়েছে।
বিএনপিকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, আপনারা চব্বিশের জুলাইয়ের বিপ্লবের আকাক্সক্ষার স্টেকহোল্ডার হিসেবে কথা দিয়েছিলেন। সেই কথা থেকে দ্বিচারিতা করে, গাদ্দারি করে, মুখ ফিরিয়ে আবার সেই ফ্যাসিবাদের পথে হাঁটতে শুরু করেছেন। এজন্য আপনাদেরও সেই পরিণতি বরণ করতে হবে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








