
কাওসার আজম
একসময় যে জমিতে ধান, পাট কিংবা শুধু মৌসুমি সবজির চাষ হতো- সেই জমিতেই এখন চাষ হচ্ছে অফসিজনের সবজিসহ নানা ফসল। অনাবাদি নালা বা পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি পুকুরপাড়ে ফল ও সবজির সমন্বিত আবাদ হচ্ছে। কোথাও মাচায় ঝুলছে অফসিজনের তরমুজ, কোথাও বস্তায় আদা, আবার কোথাও চাষ হচ্ছে ক্যাপসিকাম, ব্রকলি, গ্রীষ্মকালীন মরিচ ও টমেটো। রাজধানী ঢাকার চার পাশের কৃষিতে এভাবেই আসছে পরিবর্তন। দ্রুত নগরায়ন ও শিল্পায়নের চাপে কৃষিজমি কমে এলেও সীমিত জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বাজারের চাহিদাভিত্তিক উৎপাদনের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছেন কৃষক ও তরুণ উদ্যোক্তারা। এ সম্ভাবনাকে আরো এগিয়ে নিতে কাজ করছে ‘ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’। এর লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু সবজির আমদানি নির্ভরতা কমানো, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং মানসম্মত কৃষিপণ্যের রফতানি সম্প্রসারণ।
ঢাকার ধামরাইয়ের ললিতনগর গ্রামের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা এস এ লালন মাছ চাষের পাশাপাশি পুকুরপাড়ে কলা, পেঁপে, আদা, চালকুমড়া ও অন্যান্য সবজি আবাদ করছেন। অন্য দিকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের কৃষক রমজান আলী পুকুরের চার পাশে মাচা তৈরি করে চাষ করছেন ‘তৃপ্তি’ ও ‘কালাচাঁন’ জাতের তরমুজ। হলুদ ও কালো রঙের এ তরমুজ দেখতে তার ক্ষেতে ভিড় করছেন আশপাশের কৃষক ও সাধারণ মানুষ। তাদের উদ্যোগ দেখাচ্ছে, পরিকল্পিত ও বাণিজ্যিক কৃষি গড়ে তুলতে পারলে একই জমি থেকে একাধিক উৎসে আয় করা সম্ভব।
ঢাকা বিভাগের আটটি জেলা- ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জের কৃষিতে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সম্ভাবনা। কোথাও নদীর চর, কোথাও হাওর ও নিচু জমি, কোথাও পাহাড়ি টিলা, আবার কোথাও নগর-সংলগ্ন সমতল ভূমি। এ বৈচিত্র্য বিবেচনায় নিয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের প্রকল্পে ফসল নির্বাচন, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষক প্রশিক্ষণ এবং কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণে বিভিন্ন কার্যক্রম নেয়া হয়েছে।
আমদানি নির্ভরতা কমাতে নতুন ফসল
দেশে উৎপাদন বাড়িয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সবজির আমদানি নির্ভরতা কমানো ঢাকা অঞ্চলের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য। এজন্য আদা, গাজর, গ্রীষ্মকালীন মরিচ ও টমেটোর আবাদ সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ও উচ্চমূল্যের ফসল হিসেবে অফসিজন তরমুজ, ক্যাপসিকাম, ব্রকলি, পটল, কচু ও কালিজিরার চাষ বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২২১ বিঘা জমিতে গ্রীষ্মকালীন মরিচের প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হয়েছে। গাজর ও গ্রীষ্মকালীন মরিচের আবাদ সম্প্রসারণে উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক চাষপদ্ধতি এবং কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ কাজে লাগানো হচ্ছে।
রফতানিযোগ্য আলু উৎপাদনেও গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্যে মুন্সীগঞ্জে উন্নতমানের আলুর প্রদর্শনী বাস্তবায়নের উদ্যোগ রয়েছে। সবজির গুণগত মান বজায় রাখতে জৈব বালাইনাশক পদ্ধতির ব্যবহার সম্প্রসারণের কার্যক্রমও নেয়া হয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে উৎপাদনের পরিমাণের পাশাপাশি নিরাপদ উৎপাদন, কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের মাত্রা এবং পণ্যের মান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ূম মজুমদার জানান, কৃষিমন্ত্রী, কৃষিসচিব ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালকের পরামর্শে প্রকল্পের কার্যক্রম সাজানো হয়েছে, যাতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সবজির আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্যের রফতানি বাড়ানো যায়।
ভূপ্রকৃতির বৈচিত্র্যে কৃষির বহুমুখীকরণ
ঢাকা অঞ্চলের কৃষির বড় শক্তি এর ভৌগোলিক বৈচিত্র্য। জমির ধরন, পানি প্রাপ্যতা, আবহাওয়া ও বাজারের চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় উপযোগী ফসল উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। কিশোরগঞ্জ ও মুন্সিগঞ্জের নিচু ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকায় ভাসমান বেড, ধাপ ও সেমি-ধাপ পদ্ধতিতে সবজি চাষের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। টাঙ্গাইল ও গাজীপুরের পাহাড়ি ও টিলাভূমিতে লেবুজাতীয় ফল, একক ও মিশ্র ফলবাগান এবং আদা চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ রয়েছে। পদ্মা ও মেঘনার চরাঞ্চলে তরমুজ, মরিচ, সরিষা, বাদাম, মিষ্টিআলু ও ডালজাতীয় ফসলের আবাদ বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য দিকে নগর-সংলগ্ন সমতল এলাকায় উচ্চমূল্যের সবজি ও রফতানিযোগ্য ফসলের বাণিজ্যিক উৎপাদনে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন সবজি ও ফলের আবাদ এবং একই জমিতে আন্তঃফসল ও সাথি ফসল চাষের মাধ্যমে জমির ব্যবহার বাড়ানো সম্ভব। এতে কৃষকের আয়ের উৎস বাড়ার পাশাপাশি সারা বছর জমি উৎপাদনের আওতায় রাখার সুযোগ তৈরি হয়।
পুকুরপাড়ে সমন্বিত কৃষি
ধামরাইয়ের ললিতনগর গ্রামের এস এ লালন মাছ ও সবজির সমন্বিত খামার গড়ে তুলেছেন। এক সময় গ্রামটির বিস্তীর্ণ জমিতে ফসলের আবাদ হলেও নগরায়ন ও ইটভাটার বিস্তারে কৃষিজমি চাপের মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে পড়াশোনা শেষে গ্রামে ফিরে কৃষিকাজে যুক্ত হন তিনি।
তার খামারে মাছ চাষের পাশাপাশি পুকুরপাড়ে কলা, পেঁপে, আদা, চালকুমড়া ও বিভিন্ন লতাজাতীয় সবজি উৎপাদন করা হচ্ছে। ছায়াযুক্ত জায়গায় বস্তায় আদা চাষের মতো পদ্ধতি কাজে লাগিয়ে সীমিত জমিকেও উৎপাদনের আওতায় এনেছেন তিনি। এতে পুকুরের পানি ও পাড়ের জমি ব্যবহার করে একাধিক উৎস থেকে আয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মাচায় অফসিজনের তরমুজ চাষে এবার ব্যাপক সফলতা এসেছে এই তরুণ উদ্যোক্তার।
লালনের মতে, ইটভাটার কারণে কৃষিজমি নষ্ট হওয়া কৃষির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তরুণরা কৃষিতে এগিয়ে না এলে এ খাতকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। কৃষিকে শুধু প্রচলিত পেশা হিসেবে না দেখে বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তা থেকেই তিনি খামার শুরু করেন।
তার উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রামের অনেক তরুণ কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন। ১৭ লাখ টাকা পুঁজি দিয়ে শুরু লালনের এখন বাৎসরিক আয় কোটি টাকার উপরে।
এ দিকে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নের গৌরবরদী গ্রামের কৃষক রমজান আলী প্রায় সাত বিঘা জমিতে ‘তৃপ্তি’ ও ‘কালাচাঁন’ জাতের তরমুজ চাষ করেছেন। পুকুরের চার পাশে তৈরি মাচায় ঝুলছে হলুদ ও কালো রঙের তরমুজ। মাছ চাষের পাশাপাশি পুকুরপাড়ে করলা ও লাউ উৎপাদন করছেন তিনি। তার ক্ষেত দেখতে এসে অনেক কৃষক নতুন পদ্ধতিতে তরমুজ চাষের কৌশল সম্পর্কে জানতে চাইছেন।
কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা রমজান ২০০৯ সালে কৃষিকাজে যুক্ত হন। ২০১৪ সালে মালচিং পদ্ধতিতে চাষ শুরু করার পর বিভিন্ন সবজি ও ফল উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শের পাশাপাশি ইউটিউব থেকেও আধুনিক চাষাবাদের কৌশল শিখেছেন তিনি। তার উৎপাদিত তরমুজ যাত্রাবাড়ী ও গাউছিয়া এলাকার কাঁচাবাজার এবং ফলের আড়তে বিক্রি হয়।
প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণে অগ্রগতি, যান্ত্রিকীকরণে ঘাটতি
উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রকল্পে জৈব কৃষি, ট্রাইকো-কম্পোস্ট ও ভার্মি-কম্পোস্টের পাশাপাশি পানি সাশ্রয়ী ড্রিপ ইরিগেশন এবং পলিফিল্ম প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ রয়েছে। এসব প্রযুক্তির যথাযথ প্রয়োগ উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ, পানির ব্যবহার কমানো এবং ফসলের গুণগত মান বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে।
প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯ হাজার ৪০০টি প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে ৬৮১ ব্যাচ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। ক্ষুদ্র, প্রান্তিক ও ভূমিহীন কৃষকদের সম্পৃক্ত করতে এক হাজার ৭৭০টি কৃষক গ্রুপ গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি এক লাখ দুই হাজার কৃষককে বিভিন্ন কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণের আওতায় আনা এবং ৭৫০ জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীকে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে কৃষির যান্ত্রিকীকরণে এখনো ঘাটতি রয়েছে। মাড়াই যন্ত্র, স্প্রেয়ার, ফিতাপাইপ, লো-লিফট পাম্প ও আলু তোলার যন্ত্র কৃষকদের সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দরপত্র প্রক্রিয়া শুরু করা সম্ভব না হওয়ায় যন্ত্র বিতরণ করা যায়নি। প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ কার্যক্রম শুরু করার আশা রয়েছে।
রফতানির জন্য প্যাকিং শেড ও রিফার ভ্যান
উৎপাদনের পর সংগ্রহ, বাছাই, প্যাকিং, সংরক্ষণ ও পরিবহনের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে কৃষিপণ্যের মান নষ্ট হতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রেও এটি বড় বাধা। এ কারণে প্রকল্পে কৃষিপণ্যের ভ্যালু চেইন শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জে চারটি আন্তর্জাতিক মানের প্যাকিং শেড এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রিফার ভ্যানের সংস্থান রাখা হয়েছে। এসব সুবিধা কার্যকর হলে ফল ও সবজি বাছাই, প্যাকিং ও পরিবহনে উন্নত ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে। এতে পণ্যের অপচয় কমানো এবং রফতানির উপযোগী মান বজায় রাখা সহজ হতে পারে।
তবে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি নিরাপদ উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, রফতানিকারকদের সাথে বাজারসংযোগ এবং সংরক্ষণ ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে হলে উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মান বজায় রাখতে হবে।
প্রকল্প পরিচালক ড. মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ূম মজুমদারের মতে, ঢাকা অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য কাজে লাগিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যমান ১৯৫ শতাংশ শস্য নিবিড়তা আরো চার থেকে পাঁচ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব।
তবে এ লক্ষ্য অর্জনে কৃষিজমি রক্ষা, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণ, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা মোকাবেলা, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং বাজারব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। একই সাথে কৃষিযন্ত্র ও আধুনিক প্রযুক্তি কৃষকের নাগালে আনা এবং রফতানির মানদণ্ড অনুযায়ী পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে রাজধানীর চার পাশের কৃষি আমদানি নির্ভরতা কমানো, কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং দেশের কৃষিপণ্য রফতানি সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রাজধানীতে সবজি চাহিদার বড় অংশই এখন ঢাকার আশপাশের জেলাগুলো পূরণ করছে। দাম ভাল পাওয়ায় আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদে যুক্ত হয়ে নতুন নতুন কৃষি উদ্যোক্তা গড়ে উঠছে।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








