আসন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে বিএনপি সম্ভাবনা দেখছে জামায়াত
আসন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে বিএনপি সম্ভাবনা দেখছে জামায়াত।

 রাফিক সরকার, ঠাকুরগাঁও  

Advertisement

আগামীকাল বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঠাকুরগাঁও-১ (সদর-রুহিয়া-ভুল্লি উপজেলা) আসনের উপনির্বাচন। বিগত সংসদ নির্বাচনের চেয়েও আসন্ন উপনির্বাচন অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও উৎসবমুখর হবে বলে ধারণা করছেন অনেকে। ভোটাররা যেমন অপেক্ষায় আছে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে। তেমনিভাবে প্রার্থীরাও ভোটারদের মন জয় করতে ছুটে গিয়েছেন তাদের দ্বারে দ্বারে। দিয়েছেন নানা প্রতিশ্রুতি, দেখিয়েছেন নতুন ঠাকুরগাঁও গড়ে তোলার স্বপ্ন। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে নির্বাচনী এ দৌড়ে রয়েছেন বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ কংগ্রেসসহ পাঁচটি রাজনৈতিক দলের পাঁচজন প্রার্থী। এখন পর্যন্ত সব প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে থাকলেও মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মাঝে। ঠাকুরগাঁও সদর, ভুল্লি ও রুহিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসন, যার মধ্যে রয়েছে ২২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা। ভোটার সংখ্যা পাঁচ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। 
দেলাওয়ার হোসেন, জামায়াত : এবার আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকলেও ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার সুযোগও নেই বিএনপির। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে শক্ত অবস্থানে আছে জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন। জামায়াতের তরুণ প্রার্থী মো: দেলাওয়ার হোসেন যেন রীতিমতো বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সলকে ভোটের মাঠে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন বর্তমানে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য। সেই সাথে পালন করছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারির দায়িত্ব। শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি থাকাকালে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে গ্রেফতার করে। টানা ৫৭ দিন রিমান্ডে রেখে তার ওপর চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। যা দেশবাসীর হৃদয়ে নাড়া দেয়। তখন থেকেই জীবন্ত শহীদ খ্যাত দেলাওয়ার একজন মজলুম নেতা হিসাবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। 
আসন্ন উপনির্বাাচনে বিএনপি এককভাবে নির্বাচন করলেও জামায়াত ১১ দলীয় ঐক্যের সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করছে এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনে দেলাওয়ার হোসেনকে ১১ দলীয় প্রার্থী হিসাবে মনোনীত করেছে। এরপর থেকেই পাল্টে যেতে থাকে ঠাকুরগাঁওয়ের ভোটের সমীকরণ। প্রথমবারের মতো এ আসনে বিজয় নিশ্চিত করতে একাট্টা হয়ে মাঠে নেমে পড়েছেন জামায়াতসহ ১১ দলের নেতাকর্মী-সমর্থকরা। যেকোনো মূল্যে দেলাওয়ার হোসেনকে বিজয়ী করতে তারা যেন বদ্ধপরিকর। মিছিল মিটিং সভা সমাবেশ উঠান বৈঠক পথসভা আর গণসংযোগে দিনরাত একাকার করছেন তারা। শহর গ্রাম, হাট বাজার মাঠে-ঘাটে নিরলস প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন দাঁড়িপাল্লার পক্ষে। পরিশ্রমের ফল হিসেবে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়াও পাচ্ছেন তারা। এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ভোটের ফলাফল অনুকূলে আসবে বলেও দৃঢ় বিশ^াস জামায়াতের নেতাকর্মীদের। বিশেষ করে তরুণ, সংখ্যালঘু এবং নারী ভোটাররা যেভাবে জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে তাতে পাল্টে যেতে পারে অতীতের ভোটের হিসাব নিকাশ।  
জামায়াত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন অত্র প্রতিবেদককে দেয়া একান্ত সাক্ষাতে বলেন, একটি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজব্যবস্থা গড়ে তোলা আমার মূল লক্ষ্য। যেখানে সৃষ্টি করা হবে কর্মসংস্থান। থাকবে না সন্ত্রাস, মাদক, সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, চাঁদাবজি, দখলদারিত্ব। এমনকি থাকবে না কোনো ধর্মীয় বিভেদ। সব নাগরিক তাদের ন্যায্য অধিকার পাবে। সব ধর্মের মানুষ মিলে মিশে সমাজে একসাথে বসবাস করবে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সম্মানিত ভোটাররা আমাকে আগামী নির্বাচনে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলে, আমি আমার ওই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করব।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বিগত ৫৫ বছরে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে অনেকেই এমপি নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রীও হয়েছেন। কিন্তু তারা এমপি-মন্ত্রী হয়ে কেবল নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেছেন। জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ঠাকুরগাঁওয়ের যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বিগত এমপি-মন্ত্রীরা কোনো পদক্ষেপ নেননি। এখানে অসংখ্য শিক্ষিত বেকার রয়েছেন, যারা সামান্য সহায়তা পেলেই স্বাবলম্বী হতে পারেন। কিন্তু তাদের নিয়ে অতীতের কোনো এমপি-মন্ত্রীর পরিকল্পনা ছিল না। বেকারত্ব নিরসনে ঠাকুরগাঁওয়ে ইপিজেড গড়ে তোলা হবে। ঠাকুরগাঁওয়ের বন্ধ বিমানবন্দর চালু করে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ঠাকুরগাঁওকে ইকোনমিক জোন হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু করা হবে। রুহিয়া ও ভুল্লি উপজেলায় প্রতিষ্ঠা করা হবে মা ও শিশু হাসপাতাল। এসব প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সব পদে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হবে। সরকারি কোনো নিয়োগে দলীয়করণ করা হবে না।
মির্জা ফয়সল আমীন, বিএনপি : এ আসনে বিএনপির প্রার্থী রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছোট ভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন। যিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার সাবেক মেয়র। বড় ভাই মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির নিয়ন্ত্রণ এখন তার হাতেই। নির্বাচনে দলের একক সমর্থন পাওয়ায় এবং কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকায় বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন তিনি। তবে গুঞ্জন রয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের, যে জন্য তাকে কড়া মাশুল দিতে হতে পারে। পিতা ও বড় ভাইয়ের পরিচিতি এবং ক্ষমতাসীন দলের উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি কাজে লাগিয়ে আসন্ন উপনির্বাচনে জয়ের মুকুট পরতে চান মির্জা ফয়সল আমীন। বিগত ১৭ বছরে আওয়ামী লীগের আমলে তার বড় ভাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে শতাধিক রাজনৈতিক মামলা হলেও কোনো মামলা হয়নি মির্জা ফয়সল আমীনের নামে। ২০১৫ সালে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার মেয়র। স্বাচ্ছন্দেই ছিলেন এলাকায়, চালিয়ে গেছেন রাজনীতি ও নিজের ব্যবসায় বাণিজ্য।
তিনি বলেন, আমাদের দল বিএনপি ক্ষমতায় রয়েছে, আমার বড় ভাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্ত্রী থাকাকালে যেসব উন্নয়ন কাজ শুরু করেছেন, তা আমি সম্পন্ন করতে চাই। তা ছাড়া আমাদের পরিবার ঠাকুরগাঁওবাসীর জন্য যুগ যুগ ধরে কাজ করে আসছে, জনগণ আমাদেরকে তাদের পরীক্ষিত বন্ধু মনে করেন। সব বিবেচনা করে ভোটাররা আমাকে নির্বাচিত করবে বলে বিশ^াস করি।
এ দিকে বিএনপি জামায়াত ছাড়াও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ডা. মো: খাদেমুুল ইসলাম, খেলাফত আন্দোলনের আব্দুল আলীম নিজামী, বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক নির্বাচনে লড়ছেন। চালিয়ে যাচ্ছেন সীমিত পরিসরে নির্র্বাচনী প্রচারণা। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ডা. মো: খাদেমুুল ইসলামের সমর্থনে স্বল্পসংখ্যক নেতাকর্মীকে নির্বাচনের মাঠে দেখা গেলেও খেলাফত আন্দোলন ও বাংলাদেশ কংগ্রেসের পক্ষে উল্লেখযোগ্য কোনো নেতাকর্মী প্রচারণায় মাঠে নেই। সব মিলিয়ে এই তিন প্রার্থীরই জামানত বাজেয়াপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
সব ঠিক থাকলে নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২৯ অক্টোবর সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত তিনটি উপজেলার ১৮৫টি কেন্দ্রে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এ আসনে মোট ভোটার পাঁচ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন।
উল্লেখ্য, এর আগে চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরবর্তীতে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ী আসনটি শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন।