
আলমগীর কবির
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যার ১৪ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু আজো অজানা, কারা তাদের হত্যা করেছে। দীর্ঘ তদন্তেও মেলেনি চূড়ান্ত উত্তর। এবার মামলাটি নতুন মোড় নেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে প্রায় ৩০০টি সিডিতে থাকা ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত।
তদন্তের অগ্রগতি জানাতে গিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল আদালতে এসব তথ্য তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্যে উঠে এসেছে দুই ব্যক্তির সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা, ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের অগ্রগতি এবং নতুন করে তদন্তের দিক পরিবর্তনের বিষয়। অন্য দিকে বাদিপক্ষের আইনজীবী শিশির মনিরের প্রত্যাশা, এবার যেন আর সময়ক্ষেপণ না হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্তে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ আদালতে তুলে ধরে মামলাটির একটি পরিণতি নিশ্চিত করা হোক।
তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে সাবেক সেনাকর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব:) জিয়াউল আহসান এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি উঠে এসেছে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা প্রাথমিক তদন্তে এই দুই ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামও এ বিষয়ে একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন বলে আদালতে জানানো হয়। তবে বিষয়টি এখনো তদন্ত ও যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। কারো নাম তদন্ত প্রতিবেদনে আসা মানেই তিনি অপরাধী, এমন নয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য গ্রহণযোগ্য তথ্য-প্রমাণ প্রয়োজন। সেই প্রমাণ খুঁজতেই এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ডিজিটাল আলামত।
প্রায় ৩০০ সিডিতে কী আছে?
মামলার তদন্তে নতুন করে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে প্রায় ৩০০টি সিডি। অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, এসব সিডিতে বিভিন্ন ধরনের তথ্য, কথোপকথন, ভিডিও, অডিও এবং অন্যান্য ডিজিটাল উপাত্ত থাকতে পারে। এগুলো পর্যালোচনা করে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পর্কিত তথ্য আলাদা করতে হবে। তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে শিশির মনিরও একই তথ্য তুলে ধরেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ৩০০টি সিডির মধ্যে ৯০টি পর্যালোচনা করা হয়েছে। বাকি ২১০টি সিডি পর্যালোচনা এখনো শেষ হয়নি। অর্থাৎ, তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ এখনো বাকি। এই তথ্য-উপাত্তে হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পর্কিত কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায় কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। সিডিগুলোতে কী রয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ প্রকাশিত হয়নি।
অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যে উঠে এসেছে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এনটিএমসির সাবেক পরিচালক জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন ডিজিটাল আলামত জব্দ করেছিল বলে ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটর জানিয়েছিলেন। এসব আলামতের মধ্যে জিওলোকেশন-সংক্রান্ত তথ্য, এসএমএস এবং কল ডিটেইল রেকর্ডের (সিডিআর) মুদ্রিত কপি থাকার কথা বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে জিয়াউল আহসানের এক সহকারী র্যাব সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল বলেও বক্তব্যে উল্লেখ রয়েছে। তবে জব্দ করা আলামতের সব তথ্য এখনো সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তকারী সংস্থার হাতে পৌঁছেছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন, পিবিআইয়ের তদন্তকারী দল সংশ্লিষ্ট প্রসিকিউটর ও আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করে আলামত চেয়েছে। এ জন্য চিঠিও দেয়া হয়েছে। কিন্তু আদালতে উপস্থাপিত অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন পর্যন্ত চাওয়া তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায়নি। ফলে নতুন সূত্রের কথা সামনে এলেও সেগুলোর ভিত্তিতে তদন্ত কতটা এগোবে, তা নির্ভর করছে আলামত হস্তান্তর ও পর্যালোচনার ওপর।
গতকাল মঙ্গলবার বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শেষ করতে টাস্কফোর্সকে আরো ছয় মাস সময় দিয়েছেন আদালত। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো তদন্তের সময় বাড়ানো হলো। পরবর্তী আদেশের জন্য ২০২৭ সালের ২৯ এপ্রিল দিন ধার্য করা হয়েছে। ওই দিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আদালতে উপস্থিত হয়ে তদন্তের অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে।
এবারের নির্দেশনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আদালতে উপস্থিত হয়ে তদন্তের অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে তদন্তের স্বার্থে তাদের বক্তব্য ইন-ক্যামেরা পদ্ধতিতে শোনার বিষয়টিও আদালতে আলোচনায় এসেছে। অর্থাৎ, শুধু লিখিত প্রতিবেদন নয়, তদন্তে কী পাওয়া গেছে, তা সরাসরি জানারও সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
৯০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ, ২৪ জনের জবানবন্দী
নতুন তদন্তের দায়িত্ব নেয়ার পর টাস্কফোর্স ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে মোট ৯০ জন সাক্ষীকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এ সময় ২৪ জনের জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়েছে বলে অ্যাটর্নি জেনারেল জানিয়েছেন। আদালতের নির্দেশে গঠিত এই টাস্কফোর্সে পিবিআই, সিআইডি, পুলিশ সদর দফতর ও র্যাবের সমন্বয়ে তদন্ত পরিচালনার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। তবে সাক্ষীদের পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ এবং নতুন তথ্য সংগ্রহের পরও হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত রহস্য এখনো উদ্ঘাটিত হয়নি। এবারের তদন্তে ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করা যায় কি না, সেটিই দেখার বিষয়।
মামলার তদন্ত নথিতে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণভাবে উঠে এসেছে। নথির তথ্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া নমুনায় সাগর ও রুনির ডিএনএ শনাক্ত করা হয়েছিল। পাশাপাশি দুই অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইলও পাওয়া যায়। কিন্তু ওই দুই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। বিদেশী পরীক্ষাগারে ডিএনএ বিশ্লেষণ এবং অপরাধীর সম্ভাব্য চেহারা শনাক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তবে নমুনায় একাধিক ব্যক্তির ডিএনএ মিশ্রিত থাকায় কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায়নি বলে তদন্ত নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এ ছাড়া সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ডিএনএর সাথে অজ্ঞাত নমুনার মিল খোঁজার উদ্যোগ নেয়া হলেও তদন্তের চূড়ান্ত রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি। অজ্ঞাত দুই পুরুষের পরিচয় শনাক্ত করা গেলে মামলার তদন্তে নতুন কোনো দিক উন্মোচিত হতে পারে কি না, সেই প্রশ্নও থেকে যাচ্ছে।
তদন্ত নথিতে আরো উল্লেখ রয়েছে, সাগর-রুনির ব্যবহৃত দু’টি মোবাইল ফোন এবং দু’টি ল্যাপটপ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। হত্যাকাণ্ডের সাথে সম্পর্কিত এসব ডিভাইস উদ্ধার না হওয়া তদন্তের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ডিজিটাল যোগাযোগ, ব্যক্তিগত তথ্য কিংবা ঘটনার আগে-পরে কারো সাথে যোগাযোগের সূত্র অনুসন্ধানে এসব ডিভাইসের তথ্য প্রাসঙ্গিক হতে পারত। তবে ডিভাইসগুলো উদ্ধার করা গেলে হত্যাকাণ্ডের রহস্য নিশ্চিতভাবেই সমাধান হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
১৪ বছরেও অধরা হত্যার উদ্দেশ্য
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা হয়।
প্রথমে থানা-পুলিশ তদন্ত করে। পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্তের দায়িত্ব পায়। এরপর উচ্চ আদালতের নির্দেশে তদন্তভার যায় র্যাবের কাছে। বছরের পর বছর তদন্ত চললেও হত্যার উদ্দেশ্য ও প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তদন্ত নথিতে পারিবারিক কলহ, জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধ কিংবা ব্যবসায়িক লেনদেনকে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠার মতো তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ রয়েছে। পেশাগত বিরোধের বিষয়েও সুনির্দিষ্ট প্রমাণের কথা বলা হয়নি। ফলে হত্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো অজানা।
বাদিপক্ষের আইনজীবী শিশির মনিরের বক্তব্যে দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার হতাশা স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, বছরের পর বছর পার হলেও প্রকৃত অপরাধী কে, তা এখনো জানা যায়নি। নতুন করে যেসব সূত্রের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো যথাযথভাবে যাচাই করে প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। তার প্রত্যাশা, নির্ধারিত ছয় মাসের মধ্যে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি তুলে ধরা হবে। এরপর আর সময় চাওয়ার প্রয়োজন হবে না।
শিশির মনির আরো জানিয়েছেন, মামলায় আটক থাকা কয়েকজনের জামিনের জন্য তাদের পরিবার চেষ্টা করছে। দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপ্রক্রিয়া চলতে থাকায় তাদের পরিস্থিতিও উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাগর-রুনির ছেলে মেঘের ভবিষ্যতের প্রসঙ্গও তুলে ধরেছেন এই আইনজীবী। মা-বাবাকে হারানোর পর দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে দিয়ে তার বেড়ে ওঠার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি মামলাটির একটি পরিণতি টানার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
২৯ এপ্রিল কি মিলবে নতুন উত্তর?
এখন তদন্তের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে। প্রথমত, বাকি ২১০টি সিডি পর্যালোচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে থাকা প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল আলামত ও তথ্য-উপাত্ত পিবিআইয়ের তদন্তকারী দলের হাতে পৌঁছাতে হবে। তৃতীয়ত, নতুন সূত্রগুলো যাচাই করে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে। এরপর সেই প্রমাণের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের সাথে কারো সংশ্লিষ্টতা প্রতিষ্ঠিত হয় কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে।
২০২৭ সালের ২৯ এপ্রিল আদালতে তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরার কথা রয়েছে। এই তারিখেই মামলার চূড়ান্ত রহস্য উদ্ঘাটিত হবে, এমন নিশ্চয়তা এখনো নেই। তবে আদালতে সরাসরি তদন্তের অগ্রগতি জানানোর নির্দেশ এবং ডিজিটাল আলামত পর্যালোচনার বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। সাগর-রুনির পরিবার দীর্ঘদিন ধরে যে উত্তরের অপেক্ষায় রয়েছে, তা কি এবার মিলবে?
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








