উগ্র ডানপন্থার প্রবল প্রভাবের মধ্যে ভোটগ্রহণ
জেরুসালেমে একটি ভোটকেন্দ্রে স্ত্রী সারার পাশে নিজের ভোট দিচ্ছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু : ইন্টারনেট।

আলজাজিরা
গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে গতকাল মঙ্গলবার সাধারণ নির্বাচনে ভোট সম্পন্ন করেছে ইসরাইল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর সংঘটিত বড় ধরনের হামলার পর গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা ব্যাপক সামরিক অভিযান এবং এর সমান্তরালে লেবানন, ইয়েমেন, সিরিয়া, কাতার ও ইরানের সীমানা ছাড়িয়ে চলা সংঘাতের জেরে দেশটিতে এ প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।
দেশের ইতিহাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু উগ্র জাতীয়তাবাদী এবং অতি-অর্থোডক্স ইহুদি রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সাথে নিয়ে গড়ে ওঠা পূর্বের চরম ডানপন্থী সরকার ব্যবস্থার ধারা টিকিয়ে রাখতে আবারো নির্বাচনী ময়দানে নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াইয়ে নেমেছেন। গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং দীর্ঘমেয়াদি দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি থাকা নেতানিয়াহু এমন একটি বিরোধী জোটের মোকাবেলা করছেন, যারা নিজেদের ডানপন্থী রাজনীতির বিকল্প হিসেবে জাহির করলেও ইসরাইলের কাঠামোগত নীতির ক্ষেত্রে মূলত একই মনোভাব পোষণ করে। নির্বাচনী প্রচারণার পুরো সময় জুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতির জবাবদিহিতা, অতি-অর্থোডক্সদের সামরিক বাহিনীর বাধ্যতামূলক সেবা সংক্রান্ত বিতর্ক এবং রাজনীতি থেকে আরব প্রতিনিধিত্বের দলগুলোকে কোণঠাসা করার প্রচেষ্টা জোরালোভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
এ রাজনৈতিক মেরুকরণের ফলে ফিলিস্তিনিদের জীবনযাত্রায় কোনো ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তনের সামান্যতম সুযোগও হারিয়ে গেছে। দীর্ঘ এক বছরের যুদ্ধবিরতির আড়ালের কথা বলা হলেও গাজায় প্রায় প্রতিদিন প্রাণঘাতী আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে এবং অন্য দিকে দখলকৃত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারী উগ্রপন্থীদের তাণ্ডব ও সামরিক অভিযান বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রখ্যাত ইসরাইলি সমাজবিজ্ঞানী ইহুদা শেনহাভ-শাহরবানি আলজাজিরাকে দেয়া এক মূল্যায়নে বলেন, ইসরাইলের পুরো রাজনৈতিক কাঠামো মূলত ইহুদি শ্রেষ্ঠত্ববাদী একটি বর্ণবাদী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি আরও যোগ করেন, যারা নিজেদের নেতানিয়াহুর বিকল্প দাবি করছেন, তাদের কেউই আদর্শগতভাবে বামপন্থী নন। আমরা যে চরম বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, তা কেবল বর্তমান নেতৃত্বের একক সৃষ্টি নয়; বরং এটি ইহুদি আধিপত্যকে কেন্দ্রে রেখে গড়ে ওঠা মূলধারার জায়নবাদী চিন্তাধারার অনিবার্য পরিণতি। এ ভিত্তিমূলকে অস্বীকার করার কোনো পথ নেই।
ভোটগ্রহণের প্রাক্কালে ঘুস বিতরণের 
পরিকল্পনা : গ্রেফতার ৩
ইসরাইলের দক্ষিণাঞ্চলে বেদুইন সম্প্রদায়ের তিন বাসিন্দাকে আটক করেছে দেশটির আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। স্থানীয় একটি আরব রাজনৈতিক দল রাআমের পক্ষে ভোটারদের প্রভাবিত করতে নগদ অর্থ বিতরণের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। টাইমস অব ইসরাইলের প্রতিবেদনে প্রকাশ, গভীর রাতে চালানো বিশেষ অভিযানে সন্দেহভাজন এ ব্যক্তিদের আটক করা হয়। পরবর্তীতে তাদের বাসভবনে তল্লাশি চালিয়ে নগদ অর্থে ভরা বেশ কয়েকটি খাম এবং অপরাধমূলক নানা আলামত জব্দ করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃত তিনজনকে রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে তোলার কথা রয়েছে। এ দিকে, গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় দেশটিতে নির্ধারিত ভোটগ্রহণ শুরু হয়, যা একটানা রাত দশটা পর্যন্ত চলার কথা ছিল। ১২০ আসনের নেসেট বা সংসদ সদস্য নির্বাচনের এ লড়াইয়ে প্রায় ৭৩ লাখ নিবন্ধিত ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য কোনো দল বা জোটকে অন্তত ৬১টি আসনে জয় নিশ্চিত করতে হবে।
নির্বাচনে আরব ভোটারদের রেকর্ড উপস্থিতি
ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটের এবারের নির্বাচনে আরব সম্প্রদায়ের ভোটারদের অস্বাভাবিক উপস্থিতি দেখা গেছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে নিজ দলের সমর্থকদের দ্রুত ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গতকাল স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় দেশটিতে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছিল, যা রাত ১০টা পর্যন্ত চলার কথা ছিল। টাইমস অব ইসরাইলের প্রতিবেদনেও নিশ্চিত করা হয়েছে যে, পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার ভোটকেন্দ্রে আরব ভোটারদের ভিড় বেশ লক্ষণীয় ছিল।
নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগের পর যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার দল লিকুদের কর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “তারা (আরবরা) আমাদের হাত থেকে নির্বাচন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।” সম্প্রতি আরব দল রামের তিন সদস্যের অর্থ বিতরণের অভিযোগে আটকের প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর ও অপরাধমূলক। তারা মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছে। আপনাদের সতর্ক করে দিচ্ছি।” এ সময় তিনি নেগেভ অঞ্চলে ইহুদিদের তুলনায় আরব ভোটারদের উপস্থিতি বেশি উল্লেখ করে বলেন, “সমুদ্র সৈকত বা কোনো বারবিকিউ পার্টিতে সময় না কাটিয়ে সবাই ভোটকেন্দ্রে আসুন এবং লিকুদকে ভোট দিন।” ইসরাইলের নির্বাচন পদ্ধতি পিআর (আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) ভিত্তিক হওয়ায় ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীকে নয়, বরং সরাসরি দলকেই ভোট দেন। যে দল যত বেশি ভোট পায়, পার্লামেন্টে তাদের আসন সংখ্যাও সে অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। ফলে আরব ভোটারদের এই উচ্চ হার আরব দলগুলোকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে এবং নেতানিয়াহুর শঙ্কার মূল কারণ এটিই।
এ দিকে, বর্তমান উগ্র জাতীয়তাবাদী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গিভিরের ওপর চরম ক্ষোভ থেকেই এবার দলে দলে ভোটকেন্দ্রে ছুটে যাচ্ছেন ইসরাইলি আরব বেদুইনরা। উল্লেখ্য, ইসরাইলের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ শতাংশই ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত আরব, যার মধ্যে বেদুইন ও দ্রুজ সম্প্রদায়ের মানুষেরাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলের রাহাত শহরের বাসিন্দারা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বেন গিভিরের কার্যকলাপে ক্ষুব্ধ হয়েই তারা এবার ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।

Advertisement