সরকার চাইলে ‘ক্রসফায়ারে’ প্রস্তুত পুলিশ!
সরকার চাইলে ‘ক্রসফায়ারে’ প্রস্তুত পুলিশ!।
  • আইজিপির বক্তব্যের প্রতিবাদ টিআইবি, অধিকার ও জামায়াতের
  • বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিপ্রায় অস্বীকার পুলিশ সদর দফতরের

অপরাধ দমনে সরকার অনুমোদন দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ‘ক্রসফায়ার’ করবে- পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো: আলী হোসেন ফকিরের এমন বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি ও আইনের শাসন নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), মানবাধিকার সংগঠন অধিকার ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা বক্তব্য প্রত্যাহার এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে। অন্য দিকে পুলিশ সদর দফতর বলেছে, আইজিপি আইন প্রয়োগে কঠোরতা বোঝাতে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন; বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেয়ার উদ্দেশ্যে তিনি কথাটি বলেননি।
বিশ্লেষকদের কাছে এ বিতর্কের তাৎপর্য শুধু একটি শব্দের ব্যবহার কিংবা বক্তব্যের ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, মাদক ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি এবং অতীতের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার বক্তব্য আইন প্রয়োগের সীমা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।
আইজিপির বক্তব্য ঘিরে বিতর্ক
গতকাল সোমবার রাজধানীর চকবাজারের ওয়াটার ওয়ার্করস রোডে শাহজাহান ইমাম টাওয়ারে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা ‘কমিউনিটি ইসলামিক’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইজিপি বলেন, ‘যেখানে ক্রসফায়ার প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাও করে, আমরা সেটাই করব।’
পুলিশের দায়িত্ব পালন ও বল প্রয়োগ নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, পুলিশ বল প্রয়োগ করলে এক পক্ষ তাদের ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে আখ্যা দেয়, আবার শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় নীরব থাকলে বলা হয় ‘দুর্বল পুলিশ’। দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশকে প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও ক্ষমতা দেয়ার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, মানুষের সুখে-শান্তিতে বসবাস নিশ্চিত করতে পুলিশের বিকল্প নেই।
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা তুলে ধরে আইজিপি বলেন, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত পুলিশের প্রয়োজন রয়েছে। এ জন্য আইন ও সংবিধান অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কে দেশে আসবেন, কখন আসবেন- তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেখার বিষয় নয়। পুলিশের দায়িত্ব হলো আইন ও সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া। কেউ দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে বলেও জানান তিনি।
মাদক নিয়ন্ত্রণ ও পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা
বিগত সরকারের ১৭ বছরের শাসনামলে পাড়া-মহল্লায় মাদকের বিস্তার ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন আইজিপি। তার দাবি, তৎকালীন  সরকারি দলের শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিতেন এবং পুলিশের কিছু সদস্যও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
বর্তমানে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে বলে জানান তিনি। পুলিশের অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে আইজিপি বলেন, অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ায় গত দুই মাসে ২৭ জন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কারাগারে পাঠানো, বরখাস্তসহ কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনে ভীতি ও স্থবিরতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই পরিস্থিতি কাটিয়ে পুলিশ এখন দিন-রাত কাজ করছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সুখী, সমৃদ্ধ ও স্বস্তিদায়ক বাংলাদেশ গড়তে বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন বলে দাবি করেন তিনি। একই সাথে মানবাধিকার লঙ্ঘন কিংবা অপ্রয়োজনীয় বল প্রয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেন আইজিপি।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত তথ্য যাচাই করে মতামত দেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকৃত ঘটনা যাচাই না করে পুলিশের বিরুদ্ধে মন্তব্য করা উচিত নয়। কিছু ক্ষেত্রে স্বার্থসিদ্ধি বা অবৈধ লেনদেনের সুযোগ না পেয়ে পুলিশকে অকার্যকর হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
টিআইবি : বিপজ্জনক বার্তা
আইজিপির বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে টিআইবি বলেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থতা ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা মোকাবেলার পরিবর্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকে অপরাধ দমনের গ্রহণযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার বিপজ্জনক বার্তা দেয় এ বক্তব্য।
সংস্থাটি সরকারের কাছে আইজিপির বক্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা গ্রহণ, প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া এবং বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। পাশাপাশি তার প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি। জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবিও তুলেছে সংস্থাটি।
টিআইবির অবস্থানের তাৎপর্য হলো, আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্যকে কেবল ব্যক্তিগত অভিমত হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত। কারণ এ ধরনের বক্তব্য বাহিনীর সদস্যদের কাছে বল প্রয়োগের সীমা ও গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে প্রাতিষ্ঠানিক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অধিকারের প্রতিবাদ : হত্যাকাণ্ডে উৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারও আইজিপির বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে এমন মন্তব্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের এ ধরনের কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতে পারে।
অধিকার বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছে, আইন প্রয়োগের নামে বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে হত্যা করার পক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে কোনো বার্তা দেয়া গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত, গ্রেফতার, প্রমাণ উপস্থাপন ও আদালতের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনতে হবে- আইনের শাসনের মৌলিক দাবি এটাই।
জামায়াত : চাকরিবিধি ও সংবিধানের পরিপন্থী
আইজিপির বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গতকাল এক বিবৃতিতে বলেন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। পুলিশ নাগরিকদের সেবক, শাসক নয়।
তিনি অভিযোগ করেন, আইজিপির বক্তব্য তার চাকরিবিধির পরিপন্থী এবং সংবিধান ও আইনের শাসনের সাথে সাংঘর্ষিক। বিগত সরকারের আমলে বিনা বিচারে হত্যা, গুম ও ‘ক্রসফায়ার’-এর অভিযোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান আইজিপির বক্তব্য সেই ধরনের কর্মকাণ্ডের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।
জুবায়ের বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে এ ধরনের বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য ও অনভিপ্রেত। এতে দেশে ভয়ের সংস্কৃতিতে ফিরে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। তার ভাষায়, রাষ্ট্রকে নতুন সঙ্কটে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত বিভিন্ন বক্তব্যে স্পষ্ট হচ্ছে। তবে তার এ রাজনৈতিক মূল্যায়ন একটি দলীয় বিবৃতির বক্তব্য; এর পক্ষে স্বতন্ত্র প্রমাণ বা বিস্তারিত তথ্য বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, চাঁদাবাজি বন্ধ ও মাদক নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে জামায়াতের এ নেতা বলেন, নাগরিকদের জীবনযাত্রা নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে পুলিশকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
পুলিশ সদর দফতরের ব্যাখ্যা
বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দফতর গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও শিরোনাম সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আইজিপি মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টিকারী অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
সদর দফতরের দাবি, আইন প্রয়োগে কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে তিনি ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে উল্লেখ করেছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তি দেয়ার উদ্দেশ্যে তিনি শব্দটি ব্যবহার করেননি।
একই অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সম্পর্কে আইজিপির মন্তব্য নিয়েও বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়। সদর দফতরের ভাষ্য, সাংবাদিকদের সম্পর্কে তিনি ঢালাও মন্তব্য করতে চাননি; বিষয়টি অসাবধানতাবশত হয়েছে।
তবে পুলিশ সদর দফতরের ব্যাখ্যা বক্তব্যটির তাৎপর্য নিয়ে বিতর্কের অবসান ঘটাবে কিনা তা নির্ভর করবে বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। আইন প্রয়োগে কঠোরতার অঙ্গীকার এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অনুমোদনের মধ্যে যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, সেটি স্পষ্ট করা রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিচারবহির্ভূত হত্যার প্রশ্নে আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্ক
আইজিপির বক্তব্যকে ঘিরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন- সরকারের অনুমোদন কি কোনো ব্যক্তিকে বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে হত্যার বৈধতা দিতে পারে? বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইনের আলোকে এর উত্তর নেতিবাচক। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সুরক্ষিত করা হয়েছে। ৩৫ অনুচ্ছেদে ফৌজদারি বিচারসংক্রান্ত মৌলিক সুরক্ষাও রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধী গ্রেফতার, অপরাধ প্রতিরোধ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনসম্মতভাবে বল প্রয়োগ করতে পারে। তবে বল প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা, আনুপাতিকতা ও পরিস্থিতির বৈধতা গুরুত্বপূর্ণ। তাৎক্ষণিক প্রাণঘাতী হামলা প্রতিহত করার মতো পরিস্থিতি এবং কোনো অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা এক বিষয় নয়। ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে কিনা, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবে কী ঘটেছে, বল প্রয়োগের পরিস্থিতি কী ছিল এবং ঘটনার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হয়েছে কি না।
সরকারের নির্দেশ বা অনুমোদন আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পারে না। ফলে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পুলিশ সদর দফতর বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিপ্রায় অস্বীকার করলেও ভবিষ্যতে পুলিশ কিভাবে বল প্রয়োগ করবে, তার আইনি সীমা স্পষ্ট করা জরুরি।
অপরাধ দমনে কঠোরতা বনাম আইনের শাসন
মাদক কারবারি, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জনস্বার্থের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যর্থতা থাকলে তা মোকাবেলা করতে হবে। কিন্তু বিচারবহির্ভূত হত্যার আশঙ্কা সৃষ্টি করে অপরাধ দমনের বার্তা দিলে তা দীর্ঘ মেয়াদে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ানোর বদলে কমিয়ে দিতে পারে।
বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে আপত্তি জানানোর অর্থ অপরাধীদের প্রতি সহানুভূতি দেখানো নয়। বরং অপরাধীকে শনাক্ত করা, নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংগ্রহ, সাক্ষীদের সুরক্ষা, দ্রুত তদন্ত, কার্যকর প্রসিকিউশন ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করাই অপরাধ দমনের টেকসই পদ্ধতি। কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী কিনা, তা নির্ধারণের দায়িত্ব আদালতের। আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর কাজ হচ্ছে অপরাধ তদন্ত করে প্রমাণসহ তাকে বিচারের মুখোমুখি করা।
অন্য দিকে পুলিশের ওপর রাজনৈতিক চাপ, জনবল ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, দুর্নীতি, অপরাধীদের রাজনৈতিক আশ্রয় এবং তদন্তের দুর্বলতা থাকলে শুধু কঠোর বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়। এসব সমস্যা মোকাবেলায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, পেশাগত দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অতীতের অভিজ্ঞতা ও জনআস্থার পরীক্ষা
বাংলাদেশে অতীতে ‘ক্রসফায়ার’ বা বন্দুকযুদ্ধের নামে মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এসব ঘটনার স্বাধীন তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছে। গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের আস্থার প্রশ্নকেও সামনে এনেছে।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পুলিশ বাহিনীর পুনর্গঠন ও জনআস্থা পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয়তা আরো গুরুত্ব পেয়েছে। এ অবস্থায় পুলিশের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন বক্তব্য প্রত্যাশিত, যা আইনানুগ দায়িত্ব পালন, নাগরিকের অধিকার রক্ষা এবং বাহিনীর পেশাগত নিরপেক্ষতার বিষয়ে সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা দেয়।
আইজিপি পুলিশকে প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালনের পরিবেশ দেয়ার যে দাবি জানিয়েছেন, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। পুলিশকে কার্যকরভাবে কাজ করতে দিতে হবে, তবে সেই ক্ষমতা হতে হবে আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ এবং স্বাধীন তদারকির আওতাভুক্ত। ক্ষমতায়ন ও জবাবদিহি পরস্পরের বিকল্প নয় বরং কার্যকর পুলিশিংয়ের জন্য দু’টিই প্রয়োজন।
এখন সরকারের করণীয় কী
এ বিতর্কে সরকারের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। প্রথমত. আইজিপির বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করা। দ্বিতীয়ত. পুলিশ সদস্যদের জন্য বল প্রয়োগ ও প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের আইনগত সীমা সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশনা নিশ্চিত করা। তৃতীয়ত. বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ উঠলে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের ব্যবস্থা করা। চতুর্থত. পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি শক্তিশালী করা।
একই সাথে টিআইবি, অধিকার ও অন্যান্য নাগরিক সংগঠনের উদ্বেগকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাদের দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ, প্রযোজ্য আইন, প্রশাসনিক বিধি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যাখ্যা বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। তবে বক্তব্য প্রত্যাহার বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশ্নটি যেন রাজনৈতিক বিবেচনার বদলে আইন ও প্রতিষ্ঠিত প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আইজিপির নির্ধারণের এখতিয়ার নেই
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু হেনা রাজ্জাকী বলেন, দেশে ক্রসফায়ারের প্রয়োজন হবে কি না সেটা আইজিপির নির্ধারণ করার এখতিয়ার নেই। এটা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। দ্বিতীয়ত পুলিশ জানে তার কাজ কী, তার সীমা কতটুকু, কী কী কাজ করতে পারবে এ নির্দেশনা পুলিশ ম্যানুয়ালে বলা আছে। এর অতিরিক্ত কিছু বলতে হলে সরকার বলবে। তৃতীয়ত যদি ক্রসফায়ারের প্রয়োজন হয়, যদি সরকার অ্যালাউ করে, এটা ভাবাটাই ভুল। রাষ্ট্রের প্রয়োজন ভাববার এখতিয়ার সরকারের। কী প্রয়োজন, কী প্রয়োজন না সেটা ভাববে সরকার। আপনি শুধু এক্সিকিউট করবেন। চতুর্থত রাষ্ট্র যদি আপনাকে ক্রসফায়ার করতেও বলে তাও পারবেন না কারণ আপনার চাকরি বিধিতে আছে বেআইনি আদেশ মানতে আপনি বাধ্য নন। পঞ্চমত যদি সরকার ক্রসফায়ার অ্যালাউ করে, সরকার কোনোদিন লিখিত অর্ডার দিয়ে অ্যালাউ করবে না। আগের সরকার অ্যালাউ করেছে কিভাবে, বলেছে ক্রসফায়ার কর, প্রশ্ন উঠেছে ক্রসফায়ার করব কেন? বলা হয়েছে ক্রসফায়ার দিলে আমি ক্ষমতায় থাকতে পারব, ফের প্রশ্ন উঠেছে, আপনি ক্ষমতায় থাকলে আমাদের লাভ কী, বলা হয়েছে তোমাদের লাভ তোমরা কামায় নিবা। অর্থাৎ ভাইসভার্সা। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যদি কোনো কর্নার থেকে কেউ সরকারকে অস্থির করতে চায়, স্যাবোটাজ করতে চায়, তাতে অতি উৎসাহী হয়ে প্রশাসন দু’চারটা ক্রসফায়ার করে ফেলে, অটোমেটিকলি সাধারণ মানুষ ধরে নেবে আগের সরকারের মেজাজের মত ফিরে গেছে এই সরকার। অর্থাৎ এটা সরকারের জন্য সতর্কবার্তা, সরকারকে অস্থিতিশীল করার যড়যন্ত্র হতে পারে। আইজিপি তার সীমার বাইরে ক্রসফায়ার নিয়ে যে কথাগুলো বলেছেন সরকারের উচিত এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া।  

Advertisement