
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) উন্নয়নকাজের বড় অংশ যাচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে। ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর পর্যন্ত দুই হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার কার্যাদেশের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ পেয়েছে মাত্র ২৫টি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের উল্লেখযোগ্য অংশের মালিক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত। এমনকি গুমের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করা সাবেক র্যাব কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) কিসমত হায়াতের প্রতিষ্ঠান কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিংও ডিএনসিসির একাধিক কাজ পেয়েছে। গুলশান-২ এলাকায় ট্রাফিক সিগন্যাল সংস্কার ও পরিচালনার ৬২ লাখ টাকার কাজও রয়েছে এর মধ্যে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন উন্নয়নকাজে বড় অঙ্কের কার্যাদেশ পেয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন ঠিকাদারি কাজ, পশুর হাট ইজারা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কমিশন নিয়ে কাজগুলো পাইয়ে দিয়েছেন।
সূত্র মতে, ২০১৩ সালের ৪ ডিসেম্বর গুম হওয়া সাতজনের মধ্যে ছিলেন বর্তমানে বিএনপির সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলির ভাই সাজেদুল ইসলাম সুমন। গুমের ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা গুম কমিশনে দেয়া লিখিত সাক্ষ্যে স্বীকার করেছিলেন তৎকালীন র্যাব কর্মকর্তা কিসমত হায়াত। তার দাবি, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল হাসানের নির্দেশে এসব ঘটনা ঘটেছিল। মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্তাধীন রয়েছে। সেই কিসমত হায়াতের প্রতিষ্ঠান কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিংকে গুলশান-২ এলাকার ট্রাফিক সিগন্যাল সংস্কার ও পরিচালনার জন্য ৬২ লাখ টাকার কার্যাদেশ দিয়েছে ডিএনসিসি। এর আগে প্রতিষ্ঠানটি ট্রাফিক প্রকৌশল বিভাগের দুই কোটি চার লাখ টাকার আরেকটি কাজও পেয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রতিষ্ঠানটিকে ৩৯ লাখ টাকার আরেকটি কাজ দেয়া হয়।
কিসমত হায়াতের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে।
এ দিকে ট্রাফিক সিগন্যালের দরপত্রে শর্ত পরিবর্তন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জানা গেছে, ডিএনসিসির ১০টি ইন্টারসেকশনের ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নের কাজ পেয়েছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেড। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সহ-ঠিকাদার হিসেবে কাজটি বাস্তবায়ন করছে বিআইটি টেকনোলজি। এ কাজের দরপত্র প্রক্রিয়ায় কয়েক দফা দরপত্র আহ্বান, অভিজ্ঞতার শর্ত পরিবর্তন এবং একটি রোড কাটার মেশিনের অনুপস্থিতির কারণে ডকইয়ার্ডের দরপত্র বাতিলের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দ্বিতীয় দফার দরপত্রে কাজের অভিজ্ঞতার ন্যূনতম আর্থিক সীমা সাত কোটি ৫০ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে চার কোটি ২৫ লাখ টাকা করা হয়। একই সাথে দরপত্র জমার সময় এক সপ্তাহ বাড়ানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের অভিযোগ, পছন্দের ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে এ পরিবর্তন আনা হয়েছিল।
ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের দরপত্রে নিজস্ব মালামালের তালিকায় একটি রোড কাটার মেশিন অন্তর্ভুক্ত না থাকায় প্রতিষ্ঠানটিকে শর্ত পূরণকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। এ কারণে দরপত্র বাতিলের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়। তৃতীয় দফায় দরপত্র আহ্বানের পর ডকইয়ার্ড কাজ পায়। বর্তমানে তাদের সহ-ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে বিআইটি টেকনোলজি। ডিএনসিসির কয়েকজন প্রকৌশলীর দাবি, বিআইটি টেকনোলজির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুল হাসান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকেই কমব্যাক্ট ড্রিম ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাথে যৌথভাবে কাজ করছেন।
মাহমুদুল হাসান এ প্রতিবেদককে বলেন, আমরা ১০টি সিগন্যালের দরপত্রে অংশগ্রহণ করে কাজটি পাইনি। এখন সহ-ঠিকাদার হিসেবে একটি অংশের কাজ বাস্তবায়ন করছি। তবে গুলশান-২-এর ট্রাফিক সিগন্যাল সংস্কার ও পরিচালনার কাজটি কমব্যাক্ট নিজেই করছে।
এ দিকে ২৮টি ইন্টারসেকশনের কাজও পেয়েছে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, ডিএনসিসির ২৮টি ইন্টারসেকশনে ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নের জন্য পাঁচটি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে মাইশা কনস্ট্রাকশন, আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার, ইয়াসিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোংসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে।
মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ছয়টি ইন্টারসেকশনের কাজ পেয়েছে ৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকায়। আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড চারটি ইন্টারসেকশনের কাজ পেয়েছে পাঁচ কোটি ৯৭ লাখ টাকায়। মাইশা কনস্ট্রাকশন ও ইয়াসিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার যৌথভাবে পাঁচটি ইন্টারসেকশনের কাজ পেয়েছে সাত কোটি ৬৬ লাখ টাকায়। আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও এম এস ইফাদ এন্টারপ্রাইজ যৌথভাবে পাঁচটি ইন্টারসেকশনের কাজ পেয়েছে আট কোটি ৪০ লাখ টাকায়। আর এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং ও আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার যৌথভাবে আটটি ইন্টারসেকশনের কাজ পেয়েছে ১০ কোটি ৬৪ লাখ টাকায়।
মাইশা কনস্ট্রাকশনের সাথে কাফরুল থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোহাম্মদ পারভেজের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ আব্দুল হাইয়ের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোংয়ের মালিক এইচ এম হেলাল, যিনি আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সাবেক কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানের ছোট ভাই।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী ঘরানার ২৫ প্রতিষ্ঠান ১,৯১০ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। ডিএনসিসির কার্যাদেশের তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সময়ে ১৯৩টি প্রতিষ্ঠান কাজ পেয়েছে। এর মধ্যে ১০৪টি প্রতিষ্ঠান একটি করে কাজ করেছে। বাকি ৮৯টি প্রতিষ্ঠান একাধিক কাজ পেয়েছে। ২৫টি প্রতিষ্ঠান ২৪০টি দরপত্রের বিপরীতে এক হাজার ৯১০ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে, যা মোট কাজের মূল্যের প্রায় ৭০ শতাংশ। এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং লিমিটেড ২৪টি দরপত্রে ১৮৭ কোটি ২৫ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। মাইশা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড ১৩টি দরপত্রে ১৫৫ কোটি ৭২ লাখ টাকার কাজ করেছে। আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড পেয়েছে ১২৮ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ।
আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও এম এস আলিফ ট্রেডার্স যৌথভাবে ১৪টি দরপত্রে ১৩৮ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। এম এস আলিফ ট্রেডার্স এককভাবে ১৯টি দরপত্রে ৩৬ কোটি টাকার কাজ করেছে। জনি এন্টারপ্রাইজ চারটি দরপত্রে ৯৯ কোটি ৮৬ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে। এ ছাড়া সোহেল ইঞ্জিনিয়ারিং আটটি দরপত্রে ১০৬ কোটি টাকা, জামান কনস্ট্রাকশন ১১টি দরপত্রে ৯৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা এবং এমআর এন্টারপ্রাইজ পাঁচটি দরপত্রে ৮৪ কোটি ১১ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে।
মাইশা কনস্ট্রাকশন, এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোং, আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচার, এম এস আলিফ ট্রেডার্স ও জনি এন্টারপ্রাইজ সম্মিলিতভাবে ৮০৫ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে। এসব ঠিকাদারের বিরুদ্ধে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ৬০ কোটি টাকার কাজ পেয়েছে ফরিদের প্রতিষ্ঠান। ডিএনসিসির চারটি অঞ্চলের ১৪টি ওয়ার্ডে রাস্তা ঝাড়ু দেয়া ও নালা পরিষ্কারের ৬০ কোটি ৫৮ লাখ টাকার কাজ পেয়েছে ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির মালিক ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ফরিদ আহমেদ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ফরিদ আহমেদ মাল্টি ইন্টারন্যাশনাল নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঠিকাদারি কাজ করতেন। এবার নতুন নামে প্রতিষ্ঠান গঠন করে আগের প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ব্যবহার করে কাজ নেয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তিনটি দরপত্রেই প্রতিষ্ঠানটি এককভাবে অংশ নেয়।
নানা অনিয়মের বিষয়ে জানতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্ণধারদের মোবাইলে ফোন করলেও তারা রিসিভ করেন নি।
ডিএনসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা আরিফুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, ফরিদ আহমেদের মাল্টি ইন্টারন্যাশনালের নাম পরিবর্তন করে ইউটোফিয়া কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
ডিএনসিসির প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনের বিরুদ্ধে উন্নয়নকাজ, পশুর হাট ইজারা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আর্থিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বিভিন্ন খাত থেকে ৮ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন আদায়ের অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রশাসকের এপিএস প্লাবনের মাধ্যমে এসব অর্থ আদায় করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। ডিএনসিসির পল্লবী এলাকার একটি সড়ক ও নর্দমা উন্নয়নকাজে এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোংয়ের বিরুদ্ধে ১০ শতাংশ কমিশন দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। আসিফ ইনফ্রাস্ট্রাকচারের প্রায় ছয় কোটি টাকার একটি কাজের বিপরীতেও একই হারে কমিশন আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে। মোনালিসা কনস্ট্রাকশনের প্রায় ১০ কোটি টাকার কাজের বিপরীতে ১৩ শতাংশ কমিশন নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মাইশা কনস্ট্রাকশন ও এইচ এম হেলাল অ্যান্ড কোংয়ের বিভিন্ন কাজের বিপরীতে কমিশন নেয়ার অভিযোগও রয়েছে। পশুর হাটের ইজারাদারদের কাছ থেকে পাঁচ থেকে ছয় কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ডিএনসিসির বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যুক্ত ব্যক্তি ও সাব-ঠিকাদারদের কাছ থেকে ১০ কোটি টাকার বেশি কমিশন আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসায়ী নূর আলীর কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ১০ কোটি টাকা নেয়ার অভিযোগ একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ডিএনসিসির বিভিন্ন উন্নয়নকাজে একই কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক আধিপত্য এবং প্রশাসকের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সিটি করপোরেশনের দরপত্র ও কার্যাদেশ বণ্টনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রশাসকের সাথে ফোনে যোগযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
_GDN_970x90px_Bangla.gif&w=2048&q=75)








