২১ দিনের ‘রেড সিগন্যালে’ রিয়াদ ও দাম্মাম এয়ারপোট
  •  লাখ লাখ বাংলাদেশীর ঘুম হারাম, বাড়ছে বেকারের সংখ্যাও
  •  চাকরি বাঁচাতে বিমানবন্দরে আতঙ্কিত প্রবাসীরা

ইয়েমেনের হাউছিদের ছোড়া মিসাইল হামলার ঘটনায় সৌদি আরবের রিয়াদের কিং আবদুুল আজিজ এবং দাম্মাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবস্থান করা দেশী-বিদেশী নাগরিক ও ক্যাম্পে থাকা সৌদি সেনারা সৈন্য হতাহত হন। 
তবে নিহতদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে স্থানীয় নাগরিকসহ জনমনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ভয়াবহ বোমা হামলার পর থেকেই বিশ্বের সাথে এই দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরের আকাশপথে যাতায়াত সম্পূর্ণ বন্ধ  হয়ে যায়। সৌদি সরকারও পুরো পরিস্থিতি মোকাবেলার প্রাথমিক টার্গেট হিসেবে ২১ দিনের জন্য বিমানবন্দর দু’টি এবং এর আশপাশের ২০ কিলোমিটার এলাকায় ‘অঘোষিত’ রেড অ্যালার্ট জারি করেছে, যা এখনো বলবৎ রয়েছে। 
সর্বশেষ সৌদির পক্ষ থেকে হাউছিদের লক্ষ্য করে হামলা চালালে পাল্টা হামলা করছে হাউছিরাও। এতে উভয়পক্ষে হতাহতের ঘটনা ছাড়াও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। 
যুদ্ধ পরিস্থতির মধ্য সৌদি আরবে থাকা লাখ লাখ বাংলাদেশীর দিন কাটছে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। যুদ্ধের ভয়াবহতা বাড়তে থাকায় অনেক কোম্পানি বন্ধের পথে রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে বাংলাদেশীসহ বিদেশী কর্মীদের বেকার হওয়ার সংখ্যাও বাড়তে থাকবে। ইতোমধ্যে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হওয়ার প্রভাব পড়তে শুরু করছে। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি নাজুকের দিকেই যাচ্ছে বলে মনে করছেন প্রবাসী শ্রমিক, অভিবাসন বিশ্লেষকসহ সংশ্লিষ্টরা। যদিও বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস সমস্যায় থাকাদের খোঁজ রাখছে। 
এ দিকে সৌদি আরবের দু’টি বিমানবন্দেরের সাথে বাংলাদেশের আকাশপথ বন্ধ হওয়ায় বহু শ্রমিকের ভিসার মেয়াদ চলে যাচ্ছে। না যেতে পেরে তাদের দেশেই আটকে থাকতে হচ্ছে। আবার অনেকে ওই দেশ থেকে আসার পরিকল্পনায় বিমান টিকিট করেও আসতে পারছে না। যদিও বাংলাদেশ সরকার ভিসার মেয়াদ শেষের পথে এমন যাত্রীদের জেদ্দা দিয়ে বিকল্প পথে কর্মস্থলে পাঠানোর কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে বিমানবন্দর সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। 
গতকাল বুধবার বিকেল পর্যন্ত ঢাকা থেকে সৌদিগামী ১০০টি ফ্লাইটে বাতিল হয়েছে। চার দিনে এসব ফ্লাইটের সাড়ে ১৫ হাজার ৩৯৩ জন যাত্রী ঢাকায় আটকা পড়েছেন। 
গত রাত সোয়া ৭টায় বেবিচকের সহকারী পরিচালক ও মুখপাত্র কাওছার মাহমুদ ফ্লাইট বাতিলের এই সর্বশেষ তথ্য দেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন এখন পর্যন্ত সরাসরি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে ৪১টি এবং ট্রানজিট বাতিল হয়েছে। ফলে    ১৫ হাজার ৩৯৩ জন গন্তব্যে যেতে পারেননি। 
তিনি জানান, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে ফ্লাইট বাতিলের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে সৌদি আরবের দাম্মাম ও রিয়াদে থাকা বেশ কয়েকজন বাংলাদেশীর সাথে কথা হয় নয়া দিগন্তের এ প্রতিবেদকের। 
তাদের দেয়া ভাষ্যে যে তথ্য পাওয়া গেছে তা খুবই ভয়াবহ এবং জটিল। এই অবস্থায় তাদের একমাত্র আল্লাহ তায়ালাকে ডাকা ছাড়া আর কিছু করার নেই। 
দাম্মাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছেন প্রবাসী বাংলাদেশীরা। তাদেরই একজন (সৌদির আইনে পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না) নয়া দিগন্তকে সৌদির দু’টি বিমানবন্দরে হামলার পর সার্বিক বর্ণনা দিয়ে বলেন, আমরা অনেকটা নিরাপদ এলাকাতেই আছি। তবে কখন কী হয় তা তো বলতে পারছি না। এই দেশে একটি টিভি চ্যানেল আছে। নাম হলো গ্রেট নিউজ। ওই চ্যানেলে দেখলাম সৌদি সরকার রিয়াদ এবং দাম্মাম বিমামবন্দরে হামলার পর ২১ দিনের রেড অ্যালার্ট জারি করে কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। খবরে বলেছে, ২১ দিনের মধ্য ভালো কোনো সংবাদ পেলে বিমানবন্দর খুলে দেবে।  এখন এই দু’টি বিমানবন্দর ও আশপাশে ১৪৪ জারি আছে। শুধু তাই নয়, ওই খবরে এও বলেছে, বর্তমানে সৌদি আরবে  কোনো ফ্লাইট চলাচল করতে হলে আগে ইরান থেকে নাকি এনওসি নিতে হবে। এটা দুই দিন আগের রিপোর্ট। জেদ্দা, মদিনায় তো ফ্লাইট চলছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বাংলাদেশে যাদের ভিসা, টিকিটের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে বা হয়েছে তাদের আসার জন্য এই রুট চালু আছে।
তার মতে, সৌদির অবস্থা খুবই খারাপ। লাখ লাখ বাংলাদেশীসহ বিদেশীরা টিকিট কাটলেও ফ্লাইট না থাকায় এখন যেতে পারছেন না। তারা শুনেছেন রিয়াদ এবং দাম্মামে মিসাইল হামলার ঘটনায় অনেকে মারা গেছেন; কিন্তু সৌদি আইনের কারণে আসল তথ্য জানতে পারছেন না। 
যুদ্ধ শুরু হওয়ায় বিদেশীদের মধ্য সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশীরাই সমস্যার মধ্যে আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে অনেক কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। কাজ  নেই, ঘর থেকে বের হতে মানা করছে। মোবাইলে সিগন্যাল দিত না। এখন আরবিতে সিগন্যাল আসতেছে। অনেক মানুষ আতঙ্কে আছেন- কখন কোথায় ধপ কইরা বোমা মাইরা দেয়। অনেক মালিক বলতেছে তোরা এখন যে যার মতো চইল্যা যা। কারণ আগে জান বাঁচানো ফরজ। কোনো কোনো কোম্পানিতে ১০ হাজার ওয়ার্কারও আছে। এরমধ্য বাংলাদেশীই বেশি।
রিয়াদ কিং আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরের ভৈরব ও কম্পিউটার মোড় একালার একটি বাড়িতে অবস্থান করছেন অর্ধশত শ্রমিক। তাদের ওখানে কোনো টেলিভিশন নেই। ফেসবুকে তারা যুদ্ধের সব খবরাখবর জানতে পারছেন। ১০ তারিখ রিয়াদ এয়ারপোর্ট ও আশপাশে বোমা হামলা হয়েছে; কিন্তু আমার মোবাইলে সিগন্যাল আসেনি। এখন সিগন্যাল আসতেছে, বলতেছে পরিস্থতি স্বাভাবিক হবে। তবে দূতাবাস থেকে তারা এখনো কোনো মেসেজ পাননি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে যারা আছে তাদের নিজ দেশে পাঠানোর চিন্তা করছে। এখন বাসার মধ্য থাকি। বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। বোম মারলে যামু কই। ঘরে বইস্যা আছি। আল্লাহকে ডাকা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। 
এ দিকে সৌদিগামী ফ্লাইট বাতিলের সংখ্যা বাড়তে থাকায় ঢাকা থেকে নতুন কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানোর অপেক্ষায় থাকা কর্মীদের সময় কাটছে টেনশনে। সময়মতো না যেতে পারলে তারা টিকিটের দাম-সহ ভিসা কেনার লাখ লাখ টাকা লোকসানে পড়বেন। অনেকে চেষ্টা করছেন  রুট পরিবর্তন করে যেতে। তবে সেটি খুব কম বলে বিএমইটি সংশ্লিষ্টরা জানান। 
চট্টগ্রাম থেকে একজন সাংবাদিক নয়া দিগন্তকে জানান, তার আত্মীয় জেদ্দায় থাকেন। তিনি বাজারে গিয়েছিলেন পেঁয়াজ কিনতে; কিন্তু সেটির সঙ্কট থাকায় দাম কয়েকগুন বেশি দিয়ে কিনতে হয়েছে। শুধু পেঁয়াজ নয়; আকাশপথ বিচ্ছিন্ন থাকায় মালপত্র যেতে পারছে না। তৈরি হচ্ছে ক্রাইসিস। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে পরে সামলানো কঠিন হয়ে যাবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে গত মঙ্গলবার রাতে রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসের ওয়বসাইটে খুদেবার্তা পাঠানো হয়। এ বিষয়ে জবাব দেয়া হবে বললেও পরবর্তী সময়ে আর তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া মেলেনি। 
তবে হামলায় দুই বাংলাদেশী নিহত ও ২৭ জন আহত হওয়ার তথ্য দূতাবাস থেকে জানানো হয়েছে।

Advertisement